মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১০ কার্তিক ১৪২৮, ১৮ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

ধর্ম দর্শন

ইসলামে অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কের উদারতা

মুফতি কাজী সিকান্দার | প্রকাশের সময় : ২ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২:০১ এএম

আমরা পৃথিবীর সকল মানুষকে বিশ্বাসের দিক থেকে চার ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত আল্লাহ এবং শেষ নবীকে মানে অর্থাৎ মুসলিম। দ্বিতীয়ত যারা আল্লাহকে মানে এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ সা. কে না মেনে পূর্বের কোন নবীকে মানে যেমন, ইহুদী, খৃষ্টান ইত্যাদি। তৃতীয়ত যারা আল্লাহ ও নবী কাউকে না মেনে অন্য কোন বস্তু বা দেবতার পুঁজা করে যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি। চতুর্থত যারা কোন ধর্ম মানে না। যেমন নাস্তিক। এ মৌলিক চার প্রকারের প্রত্যেক প্রকারে অনেক দল ও গোষ্ঠী রয়েছে। এখন যারা ইসলাম ধর্ম পালন করে তাদের সাথে অন্যান্য ধর্ম, মত ও পথের অনুসারীদের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে তার মৌলিক বিধানে আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, তোমাদের সেই লোকদের সাথে ভাল ও সুবিচারমূলক আচরণ গ্রহণ করতে নিষেধ করছেন না, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘর থেকে তোমাদের বহিস্কৃত করেনি। আল্লাহ তো সুবিচারকারীদের পছন্দ করেন। তিনি তোমাদের বিরত রাখছেন শুধু এ থেকে যে, তোমরা বন্ধুত্ব করবে না তাদের সাথে, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে ও তোমাদের ঘর থেকে তোমাদের বহিস্কৃত করেছে এবং তোমাদের বহিষ্কৃতকরণে পরষ্পরের সাথে সহযোগিতা করেছে। এ লোকদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করবে তারাই জালিম (সূরা মুমতাহিনা আ/৮-৯)

এখানে আল্লাহ তাআলা দু’টি কারণের পরিপেক্ষিতে দু’টি বিধান দিয়েছেন। একটি হলো সুবিচার করা। দ্বিতীয়টি হলো বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা। মুসলিম ব্যতীত অন্য সব জাতির সাথে সুবিচার করার কথা বলেছেন। তাই নয় শুধু বরং সুবিচার করার প্রতি মুসলিমকে উৎসাহিত করেছেন এ বলে যে, ‘‘আল্লাহ তো সুবিচারকারীদের পছন্দ করেন’’। এখানে এ সুবিচার ন্যায় বিচার করার ক্ষেত্রে দু’টি শর্ত দিয়েছেন তা হলো যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে ঘর থেকে বহিষ্কৃত করেনি তাদের সাথে সুবিচার করতে। অপরদিকে যারা যুদ্ধ করেছে বা করছে এবং যারা তোমাদেরকে ঘর থেকে বহিস্কৃত করেছে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করাকে নিষেধ করেননি শুধু জুলুমও বলেছেন। তাহলে যে অমুসলিম মুসলিমদের সাথে কোন যুদ্ধে বা তাদেরকে অত্যাচার ও নিপিড়নের সাথে জড়িত নয় এবং যারা অত্যাচার করে যুদ্ধ করে তাদেরকে সাহায্য করে না এমন অমুসলিমদের সাথে ইসলামের সম্পর্ক হলো সুবিচার ন্যায়বিচারের এবং বন্ধুর। আর যারা যুদ্ধ ও যারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করছে তাদেরকে সাহায্য করেছে তাদের সাথে বন্ধুত্বহীন সম্পর্ক। এ হুকুম সকল অমুসলিমের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রজোয্য।

আহলে কিতাব
পূর্বের মৌলিক সম্পর্ক বজায় রেখেও ইসলাম মুসলমানকে আহলে কিতাবদের সাথে বিশেষ সম্পর্কের হুকুম দিচ্ছেন। আহলে কিতব হলো যে সম্প্রদায়ের উপর আল্লাহ তাআলা কিতাব নাজিল করেছেন এবং নবী এসেছেন উক্ত নবীকে তারা মেনেছেন এবং কিতাব মেনেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি তোমাদের জন্য সেই দ্বীনই সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন, আর যা আমরা তোমাদের প্রতি ওহী করে পাঠিয়েছি, আর তার পথ-নির্দেশ করেছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এ বলে যে, তোমরা সকলে এ দ্বীনকে কায়েম কর এবং এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন ও ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে যেও না। (সূরা শুরা) পূর্বেকার সকল আল্লাহ প্রদত্ব ধর্মের নির্দেশনাবলি ও ইসলাম ধর্মের নির্দেশনাবলির মৌলেকত্ব একই আল্লাহ ও নবীকে মান্য করা।

পূর্বেকার নবী ও কিতাব মান্য করা
আল্লাহ তাআলা পূর্বেকার সকল নবী ও সকল কিতাবের উপর মুসলিমদেরকে ঈমান আনার নির্দেশ দিচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি ও যা নাযিল হয়েছে আমাদের প্রতি, আর যা নাযিল হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও বংশধরদের প্রতি, আর যা হয়েছে মুসা, ঈসা ও আল্লাহর প্রেরিত নবীগণের প্রতি-আমরা তাদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করি না। আমরা তো সেই এক আল্লাহরই অনুগত। (সূরা বাকারা আ/১৩৬)

আহলে কিতাবীদের সাথে সম্পর্ক
সম্পর্কের সূত্র অনেত হতে পারে। বন্ধুত্বের সম্পর্ক, বিবাহিক সম্পর্ক, সামাজিক সম্পর্ক, লেনদেন খানার সম্পর্ক ইত্যাদি। বন্ধুত্বের সম্পর্কের আলোচনা পূর্বে হয়েছে। কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহন করবে না। আর কাকে গ্রহণ করবে।

আহলে কিতাবদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক
আহলে কিতাবের সাথে মুসলিমদের সামাজিক সম্পর্ক মজবুত ও দৃঢ় করার লক্ষ্যে ইসলাম কয়েকটি প্রদক্ষেপ নিয়েছে। যা ইসলামের উদার নীতি ও সাম্যতার উৎকর্ষতা নিরূপণ হয়। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আহলে কিতাবীদের সাতে ঝগড়া ও বিতর্ক করা থেকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আহলে কিতাবীরদ সাথে বিতর্ক করো না তবে উত্তম পন্থায়, তাদের ছাড়া যারা ওদের মধ্যে জালিম। আর বল, আমরা ঈমান এনেছি সেই জিনিসের প্রতি, যা আমাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, সে জিনিসের উপরও যা তোমাদের প্রতি নাযিল হয়েছে। আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ এক ও অভিন্ন। আর আমরা তাঁরই অনুগত আত্মসমর্পিত। (সূরা আনকাবুত) এখানে আল্লাহ তাআলা যেমন হুকুম দিচ্ছেন তর্ক না করতে তেমনিভাবে সুন্দরভাবে তর্ক করার নির্দেশও দিচ্ছেন অর্থাৎ এমন তর্ক যেন না হয় যাতে তাদের প্রতি বিদ্বেষ ছাড়ায় এবং পূর্বেকার কিতাব ও নবীকে হেয় করা হয়। এমন বির্তকে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থেকে সুন্দরভাবে তাদের ধর্ম এখন অচল ও তাদের ধর্ম এখন পরিবর্তিত হয়েছে যুক্তির নিরেখে বুঝিয়ে দেয়া যেতে পারে। এ আয়াত থেকে আহলে কিতাবীদের সাথে মুসলিমদের সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি থেকে বিরত রাখার কথা বলা হচ্ছে।

আহলে কিতাবীদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করার ক্ষেত্রে আরেকটি নির্দেশনা রয়েছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, আহলে কিতাবের খাবার তোমাদের জন্য হালাল, তোমাদের খাবারও হালাল তাদের জন্য। আর সুরক্ষিত পবিত্রা নারী মুসলমানদের ও তোমাদের পূর্বে কিতাব পাওয়া লোকদের তাও হালাল। (সূরা মায়েদা)

আহলে কিতাবের সাথে পানাহার ও তাদের জবেহকৃত পশু হালাল করে তাদের খাবার হালাল ঠিত তেমনি তোমাদের খাবার তাদের জন্য হালাল বলে এ দু’ জাতির মধ্যে দূরত্বের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে একেবারে নিকটে নিয়ে এসেছেন। এটি এতই নিকটে যে এক প্লেটে এসে দাঁড় করিয়েছেন। যে প্লেটে আপনজন শরীক হয় আহলে কিতাবের সাথে আপনজনের মতই সম্পর্ক করে দিয়েছেন ইসলাম। এর মাধ্যমে ইসলাম ও আহলে কিতাব যেন দূরত্বে না থেকে একেবারে নিকটে এসে একাত্ববাদের জয়গান গেয়ে উঠেন। তবে এসবের ক্ষেত্রে যারা জালিম তাদের থেকে দূরে অবস্থান করার নির্দেশ। যারা ইসলাম ও মুসলিম ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদের থেকে অবশ্যই দূরত্ব বজায় রেখেই চলতে হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না, তবে উত্তম পন্থায়, তাদের ছাড়া যারা ওদের মধ্যে জালিম’’। জালিমের সাথে তো বিতর্ক নয় শুধু যুদ্ধও হবে। এধরণের লোককে সর্বযুগে চিহ্ণিত করে তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। তাদের ষড়যন্ত্র থেকে ইসলাম ও মুসলিমকে হেফাজতের ফিকির করতে হবে।

আহলে কিতাবের সাথে বিয়ের সম্পর্ক
ইসলাম আহলে কিতাবদেরকে মুসলিমদের খানার টেবিলে নয় শুধু আরো গভীরের বন্ধনেও আবদ্ধ করার সুযোগ দিয়েছেন। ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতি এত উদারতা দিয়েছেন তা অন্য কোন ধর্মে নেই। মানুষের সাথে ভ্রাতৃত্ব রক্ষা এবং সুন্দরভাবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচলনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছেন। সর্বোচ্চ উদারতা দিয়েছেন, মহানুভবতা দেখিয়েছেন। আহলে কিতাবরা তাদের ধর্মের অনেক কিছুই পরিবর্তন করেছে তা সত্বেও আল্লাহ তাআলা একত্ববাদের ভিত্তিতে বলেন যে, ‘আহলি কিতাবের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল, তোমাদের খাদ্য তাদের জন্যে। আর পবিত্র চরিত্র ও সতীত্ব সম্পন্ন মুমিন স্ত্রীলোক এবং তোমাদের পূর্বে কিতাব পাওয়া পবিত্র ও সতীত্ব সম্পন্ন স্ত্রী লোকও যদি তোমরা তাদের মোহরানা আদায় করে দাও। পবিত্রতা রক্ষাকারী হিসেবে। জেনাকার হিসেবে নয় এবং বন্ধুত্বতার সুত্র গ্রহণকারী হিসেবেও নয়। (সূরা মায়িদাহ আ/৫) আহলে কিতাব বলতে বর্তমানে দু’জাতিকে বুঝানো হয়। এক, ইহুদি দ্বিতীয়ত খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। যখন ইসলাম এর অগ্রযাত্রা শুরু হয় তখনিই ইহুদী ও খ্রিস্টানদের ধর্ম বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছিল। তবুও ইসলাম তাদের সাথে বিবাহ সহ অন্যান্য সম্পর্ক গড়ে তোলার বিধান করেছেন। তাই আমরা দেখতে পাই যে রাসূল সা. ইহুদী ও খ্রিস্টান্দরে দাওয়াত গ্রহণ করতেন এবং তাদের বাড়ি গিয়ে খানা খেতেন। এবং মদিনায় যাওয়ার পর মদিনা সনদ নামে অন্যান্য গোত্র ও সম্প্রদায়ের সাথে ইহুদী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় ছিল অগ্রগণ্য। (চলবে)
লেখক : পরিচালক, ইসলাহ বাংলাদেশ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন