রোববার, ২৬ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯, ২৫ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

ধর্ম দর্শন

নিয়াতের প্রয়োজনীয়তা ও বিশুদ্ধতা

মুন্সি আব্দুল কাদির | প্রকাশের সময় : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ১২:০৩ এএম

নিয়াত তথা সংকল্প বা ইচ্ছা, অভিপ্রায় ইবাদাতের মূল। নিয়াত শব্দটি ইখলাসের সমার্থক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। নিয়াত ইবাদাতের প্রাণ। নিয়ত ছাড়া কোন ইবাদাত আর ইবাদাত থাকে না। কোরআনুল কারীমে হুবহু নিয়ত শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। কোরআনুল কারীমে ইখলাস শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, একান্ত নিষ্ঠাবান (মুখলিস) হয়ে আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত কর। জেনে রেখ একনিষ্ঠ (ইখলাস যুক্ত) ইবাদাত আল্লাহ তায়ালার জন্যই।- সুরা জুমার। আল্লাহ তায়ালা আরোও বলেন, এদের এ ছাড়া আর কোন কিছুরই আদেশ দেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহ তায়ালার জন্য নিজেদের দ্বীন ও ইবাদাত নিবেদিত (খালেস) করে নেবে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে। সুরা বাইয়েনাহ। হাদিসে নিয়ত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ইমাম বুখারী রাহঃ বুখারী শরীফের প্রথমে ওমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ থেকে নিয়ত সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল লাভ করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য হিজরত করে তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্যই গন্য হবে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থে কিংবা কোন নারীকে বিয়ে করার মানসে হিজরত করে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই গন্য হবে যে জন্য সে হিজরত করেছে।

নিয়তের জন্য ইখলাস প্রয়োজন আবার ইখলাসের জন্য সহিহ নিয়ত প্রয়োজন। ইসলামে প্রত্যেকটি কাজই ইবাদাত। হোক সেটা ফরজ, হোক ওয়াজিব, হোক সুন্নাত, চাই নফল হোক, চাই মুস্তাহাব হোক। কাজটি করার পূর্বে নিয়ত করা জরুরী। কোন কাজ করার পূর্বে সবরে হোক কিংবা নিরবে হোক কাজটি করার সংকল্প বা অভিপ্রায় ব্যক্ত করার নামই নিয়ত। নিয়তের স্থান হল অন্তর। নিয়ত নিজেও একটি ইবাদাত। নামাজের পূর্বে পবিত্রতা অর্জন, অযু যেমন স্বতন্ত্র ইবাদাত তেমনি ইবাদাতের পূর্বে নিয়তও একটি ইবাদাত। ইবাদাতের সৌন্দর্য অনেকাংশে নিয়তের উপর নির্ভরশীল। যার নিয়ত যত বিশুদ্ধ তার ইবাদাত তত সুন্দর।
বিশুদ্ধ নিয়তের জন্য চারটি গুন থাকা প্রয়োজন:
১- নিয়তকারীকে মুসলিম হতে হবে ।
২- নিয়তকারীকে সুস্থ বুদ্ধি সম্পন্ন হতে হবে।
৩- যে কাজ বা ইবাদাতের জন্য নিয়ত করছে সেই কাজ সম্মর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকা চাই।
৪- যে কাজ বা ইবাদাত করতে চায় তা করার সুন্নাত নিয়ম এবং উদ্দেশ্য জানা থাকা চাই।

বিশুদ্ধ নিয়তের জন্য মানুষ সওয়াবের ভাগীদার হয়ে যায়। শরীয়াহ সম্মত কোন কারণে কাজটি করতে না পারলেও সে নিয়তের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয় না। কাজটি করতে পারলে কাজের সওয়াব পায়। আবু হোরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বলেন, আমার বান্দা কোন গুনাহের কাজ করার নিয়ত করলে তা না করা পর্যন্ত তার জন্য কোন গুনাহ লিপিবদ্ধ করো না। তবে সে যদি গুনাহের কাজটি করে ফেলে, তাহলে কাজটির অনুপাতে তার গুনাহ লিখ। আর যদি আমার কারণে তা পরিত্যাগ করে তাহলে তার জন্য একটি নেকী লিপিবদ্ধ করো। সে যদি কোন নেকীর কাজ করার জন্য ইচ্ছা বা নিয়ত করে কিন্তু এখনও তা করেনি তাহলে তার জন্য একটি নেকী লিপিবদ্ধ করো। আর যদি কাজটি সে করে তাহলে তার জন্য দশগুণ থেকে (আন্তরিকতা অনুপাতে) সাতশ গুণ পর্যন্ত নেকী লিপিবদ্ধ করো। (সহীহ বুখারী)

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, বলুন প্রত্যেকেই আপন স্বভাব অনুসারে কর্ম সম্পাদন করে থাকে।- সূরা বনি ইসরাইল- ৮৪। এখানে আপন স্বভাব অর্থ নিয়ত অনুযায়ী। মানুষ তার পরিবারের জন্য সাওয়াব লাভের নিয়তে যা খরচ করে, তা সদাক্বাহ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এখন মক্কা হতে হিজরাত নেই, কিন্তু জিহাদ ও নিয়াত অবশিষ্ট রয়েছে। আবু মাসউদ রাঃ বর্ণনা করেন , রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ তার পরিবারের জন্য সওয়াবের নিয়তে যখন খরচ করে তখন তা হয় তার সদকা স্বরূপ। বুখারী। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ কে বলেন, তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় যা-ই খরচ কর না কেন, তোমাকে তার সওয়াব অবশ্যই দেওয়া হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও।- বুখারী।

কোন শাইখ বলেন, আমার মন চায়, কিছু ফকিহ তাদের অন্যান্য ব্যস্ততা ছেড়ে দিয়ে মানুষদেরকে শুধু তাদের আমলের মাকাসিদ ও উদ্দেশ্য সমূহ শিক্ষা দেওয়ার কাজ করুক এবং লোকদেরকে তাদের আমলের নিয়তের বিশুদ্ধতা শিক্ষা দেওয়ার কাজে বসে যাক। (চলবে)

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps