শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৪ মুহাররম ১৪৪৪

ধর্ম দর্শন

দিক দর্শন - শরয়ী দৃষ্টিকোণ : বিভিন্ন দিবস পালন

প্রকাশের সময় : ১৭ নভেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মুফতী পিয়ার মাহমুদ

জন্ম দিবস পালনের মত মৃত্যু দিবস পালনও এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ইংরেজি মাসের যে তারিখে লোকটি মৃত্যবরণ করেছিল প্রতি বছর সে তারিখ এলেই শুরু মরহুমের আতীœয়-সজনের দৌড়-ঝাপ। গরু-খাশি জবাই করে বিশাল ডেকোরেশন করে আয়োজন হয় পোলাও-কোরমা, বিরিয়ানী, তেহারী, র্জদা ইত্যাদির। গরীব হলে অনন্ত মোরগ-মুরগি ও পোলাও-সাদা ভাত ইত্যাদির। যেন প্রচলিত কোনো বিয়ের আয়োজন। এই ভোজসভায় নিমন্ত্রণ করা হয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষকে। অনেক সময় আবার মৃত্যুর তিন দিন, সাত দিন, চল্লিশ দিন পর আয়োজন করা হয় এ জাতীয় ভোজসভার। এতে খরচ করা হয় অকৃপণ হাতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সকল অনুষ্ঠানে কুরআন খতম, তিলাওয়াত, দুআ-দুরুদ ইত্যাদি হয়ে থাকে এবং এর বিনিময়ে টাকা-পয়সা দেয়া হয় বা খাওয়ানো হয়। কিন্তু বড় আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, কুসংস্কার আর রুসুম-রেওয়াজে নিমজ্জিত মুসলিম উম্মাহ একবারও ভেবে দেখেনা যে, এই যে এত টাক খরচ করলাম; এত ঘাম ঝরালাম, এর দ্বারা মরহুম কতটুকু উপকৃত হলো আর আমরাই বা কি উপকার পেলাম এবং এব্যাপারে আমাদের প্রাণের স্পন্দন ইসলামই বা কি বলে? এতটুকু খবর নেয়া বা রাখার সময়-সুযোগ আমাদের নেই। ইসলামের বিধান হলো নির্দিষ্ট করে, মৃত্যু দিবস, তিন দিনা, সাত দিনা, চল্লিশা ইত্যাদি আচার-অনুষ্ঠান পালন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। শরিআতে এগুলোর কোনোই ভিত্তি নেই। এ সকল আয়োজন নিছক মনগড়া ও বিজাতীয় কুসংস্কার। তাই নির্দিষ্টভাবে মৃত্যু দিবস, তিন দিনা, সাত দিনা, চল্লিশা ইত্যাদি উপলক্ষে কাউকে খাওয়ানো কিংবা কোনো আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা বিদআত ও নাজায়িয এবং এ উপলক্ষে খতম ইত্যাদির বিনিময়ে টাকা-পয়সা দেয়া-নেয়া এবং খাওয়া-খাওয়ানো সবই বিদআত ও হারাম। কারণ এ ক্ষেত্রে তিলায়াত ও দুআকারী নিজেই সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহগার হয়, সতরাং মরহুমকে সে সওয়াব পৌঁছাবে কী ভাবে? মরহুমকে ইসালে সওয়াব করতে হলে প্রথমত, তিলায়াত ও দুআকারী নিজে সওয়াব পেতে হবে, এরপর না সে সওয়াবটা অন্যের জন্যে পাঠাবে। বিনিময় গ্রহণ করার কারণে যখন সে নিজেই সওয়াব থেকে মাহরুম হচ্ছে তখন অন্যের জন্য ইসালে সওয়াবের তো প্রশ্নই আসেনা। এব্যাপারে সাহাবী জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, আমরা দাফনের পর মৃতের বাড়িতে একত্রিত হওয়া এবং খাবারের আয়োজন করাকে ‘নিয়াহাহ’ অর্থাৎ মৃতের শোকে বিলাপের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করতাম। মুসনাদে আহমাদ : হাদীস, ৬৯০৫। (যে বিলাপ করাকে হাদীস শরীফে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।) এ কথার দ্বারা হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর উদ্দেশ্য হলো, নিয়াহাহ যেভাবে নিষদ্ধি, মৃতের বাড়িতে খাবারের আয়োজন করাও সেভাবে নিষিদ্ধ। প্রসিদ্ধ ফকীহ আল্লামা শামী (রহ.) বলেন, মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে ভোজসভার আয়োজন এবং তাতে অংশগ্রহণ মাকরুহে তাহরীমী ও জঘন্য বিদআত। কারণ ভোজসভার আয়োজন শরীআতে অনুমোদিত হয়েছে আনন্দ-খুশির বেলায়; শোকের বেলায় নয়। এভাবে ইন্তিকালের প্রথম দিন, তৃতীয় দিন বা এক সপ্তাহ পর ঘটাকরে খাবারের আয়োজন করা এবং কুরআন পাঠের বিনিময়ে সেই দাওয়াত কবুল করা এবং তাতে নেককার ও কুরআন খতমকারীগণের অংশগ্রহণ লৌকিক বা সূরা আনআম, সূরা ইখালছ পাঠের জন্য উপস্থিত হওয়া মাকরুহে তাহতীমী ও জঘন্য বিদআত। একটু অগ্রসর হয়ে তিনি আরো বলেন, মইয়েতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত, যিকর ইত্যাদি করে বিনিময় গ্রহণ করা যা হাল-যামানায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত তা হওয়া এবং এ জাতীয় ওছীয়াত বাতিল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। (রদ্দুল মহতার : ৩/১৩৮-১৩৯। আরো দেখুন, বাযযাযিয়া আলা হামিশিল হিন্দিয়া : ৪/৮১।) অন্যত্র তিনি আরো বলেন, মৃতের জন্য কুরআন তিলাওয়াতকারী যদি বিনিময় নিয়ে তিলাওয়াত করে, তাহলে তার নিজেরই সওয়াব হয়না; সুতরাং মাইয়েতকে সে কি পৌঁছাবে? এরপর তিনি বলেন, মৃতের পক্ষ হতে মৃত্যুর পর ভোজসভার আয়োজনের ওছীয়ত এবং তার জন্য কুরআন তিলওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি পাঠ করে বিনিময় গ্রহণ করা বিদআত, মুনকার, বাতিল। পাঠকারীরা দুনিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠ করার কারণে গুনাহগার হবে। (রদ্দুল মহতার : ৯/৭৮) উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুফতি ফকীহুল আছর রশীদ আহমাদ লুধয়ানবী (রহ.) আহসানুল ফাতওয়াতে বলেন, মৃতের জন্য ঈসালে সওয়াব করে বিনিময় দেয়া-নেয়া উভয়টাই নাযায়িজ। সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি আরো বলেন, “উল্লেখিত কারণে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে প্রচলিত কুরআনখানি নাজায়িয; বরং এটি মাইয়েতের আযাবের কারণ হওয়ারও যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছ। এ জন্য উলামায়ে কিরাম লিখেছেন যে, প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ মৃত্যুর পর্বে এ জাতীয় অনৈসলামিক পন্থায় ঈসালে সওয়াব করতে নিষেধ করে যাবে।” (আহসানুল ফাতওয়া : ৭/২৯৬-২৯৭। আরো দেখুুন : ফাতওয়া রহীমিয়া : ২/১১৬-১১৭।) তবে নির্দিষ্ট দিন-তারিখ জরুরি মনে না করে এবং কোনো বিনিময়ের আদান-প্রদান ব্যতীত কেবলমাত্র ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন খতম, যিকর-আযকর, তাসবীহ-তাহলীল, ফকীর-মিসকিনকে খাওয়ানো, দান-খয়রাত ইত্যাদি করা জায়িয এবং এতে মৃতের কল্পনাতীত উপকার হয় এবং ঈসালে সওয়াবকারীও সীমাহীন লাভবান হয়। বরং কবরস্থ ব্যক্তিরা সর্বদা এই অপেক্ষায় থাকে, দুনিয়াতে রেখে যাওয়া তার প্রিয়ভাজনরা তার জন্য কখন ঈসালে সওয়াব করবে। ঈসালে সওয়াব করা হলে এটি তাদের নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় বস্তু হতেও প্রিয় হয়। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) সূত্রে রাসূলল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেনÑ “সমাধিস্থ প্রতিটি মৃত ব্যক্তি তার বাবা-মা, ভাই-বেরাদর ও বন্ধু-বান্ধবের পক্ষ হতে দুআ ইস্তিগফারের জন্য এভাবে অপেক্ষা করতে থাকে যেভাবে পানিতে ডুবন্ত ব্যক্তি অন্যের সাহায্য কামনা করে। যখন সে দুআপ্রাপ্ত হয় তখন এই দুআ তার নিকট দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় বস্তু হতেও প্রিয় হয় এবং আল্লাহতাআলা দুনিয়াবাসীর দুআর বদৌলতে তাকে দান করেন পাহাড়সম প্রতিদান। আর মৃতুদের জন্য জীবতদের হাদিয়া হলো, তাদের জন্য দুআ ইস্তিগফার করা। (শুআবুল ঈমান, বয়হাকী : হাদীস, ৭৫২৭) অন্য এক বর্ণনায় সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেনÑ “মানুষ যখন মারা যায় তখন তার সকল প্রকারের আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিন প্রকার আমলের সওয়াব তখনো পৌঁছতে থাকে। ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. উপকারী ইলম, ৩. নেক সন্তান। (মুসলিম : হাদিস, ১৬৩১) তিরমিযী শরীফের এক বর্ণনায় ইবনে আব্বাস (রা.) বলেনÑ এক ব্যক্তি (হযরত সাদ (রা.) রাসূলল্লাহর (সা.) খিদমতে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল ! আমার মা ইন্তিকাল করেছেন, আমি যদি তার জন্য সদকা করি তাতে কি তিনি উপকৃত হবেন এবং এর সওয়াব তিনি প্রাপ্ত হবেন? জবাবে মহানবী (সা.) ইরশাদ করলেন, হ্যাঁ, তিনি উপকৃত হবেন এবং এর সওয়াব তিনি প্রাপ্ত হবেন। একথা শুনে উক্ত সাহাবী বললেন, আমার একটি বাগান আছে। আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমার উক্ত বাগানটি আমার মায়ের জন্য সদকা করে দিলাম।” তিরমিযী : ১/৮৫। উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) বলেন “মহানবী (সা.) যখন কোন মাইয়েতের দাফনকার্য সম্পন্ন করতেন তখন সেখানে অবস্থান করতেন এবং বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ইস্তিগফার কর এবং তার জন্য অটল অবিচলতার দুআ কর। কারণ এখন তাকে সওয়াল-জওয়াব করা হবে। আবু দাউদ : ১/৭৫। উপরোক্ত হাদিসগুলোর দ্বারা একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, ঈসালে সওয়াব তথা কোনো আমলের সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য পৌঁছালে তা সে প্রাপ্ত হয় এবং এর দ্বারা সে সীমাহীন উপকৃত হয় ও তার কবরের আযাব-গযব মাফ হয়। শুধু তাই নয়, একাধিক হাদিসে একথাও আছে যে, ঈসালে সওয়াব করলে ঈসালে সওয়াবকারী নিজেও উপকৃত হয় এবং অফুরন্ত পুণ্যের অধিকারী হয়। যেমন হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছেÑ মহানবী (সা.) ইরশাদ করেনÑ “যে ব্যক্তি কোনো কবরস্থানের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে ১১ বার সূরা ইখলাছ পাঠ করে মৃতদের বখশে দেয় তাকে মৃতদের সংখ্যা পরিমাণ সওয়াব দেয়া হয়। সূরা ইয়াসিন পাঠ করে বখশে দিলেও এমন সওয়াব পাওয়া যায়।” (দারাকুতনী ও তবারানী শরীফ সূত্রে ফাতওয়া শামী : ১/৮৪৪; তাহতবী আলাল মারাকী : ৩৪২) আবু হুরায়রার (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেনÑ “যে ব্যক্তি কবরস্থানে গিয়ে সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাছ ও সূরা তাকাছুর পাঠ করে তার সওয়াব কবরস্থ মুমিন নর-নারীর জন্য ঈসালে সওয়াব করে তার জন্য এ সকল কবরবাসী সুপারিশকারী হবে।” (দারাকুতনী : ৪/৮২) হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি স্বীয় মা-বাবার পক্ষ থেকে হজ করে সে তাদের পক্ষ থেকে তো হজ আদায় করলই পাশাপাশি তাকে অতিরিক্ত দশটি হজের সওয়াব দেয়া হবে।” (দারাকুতনী সূত্রে ফাতওয়া শামী : ২/৬০৭) শেষোক্ত হাদিসের দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় ঈসালে সওয়াব করলে অনেক সময় মৃত ব্যক্তির চেয়ে ঈসালে সওয়াবকারী নিজে বেশি উপকৃত ও লাভবান হয়।
স্মর্তব্য : ঈসালে সওয়াবের নির্দিষ্ট কোনো পন্থা বা পদ্ধতি নেই। কুরআন খতম, সূরা ইয়াসিন, ইখলাছ, তাকাছুর ইত্যাদি যে কোনো সূরা পাঠ করে কিংবা দরুদ, নফল নামাজ, রোজা, যাকাত, সদকা, হজ ইত্যাদিসহ যে কোনো নফল ইবাদতের মাধ্যমেই ঈসালে সওয়াব করা যায়। রদ্দুল মুহতার : ১/৮৪৪; হিন্দিয়া : ৫/৩৯৪; মিরকাত : ৪/৮২; ফাতওয়া রহীমিয়া : ৭/৯৪-৯৫।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন