শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯, ১৩ মুহাররম ১৪৪৪

জাতীয় সংবাদ

বিপদের দিনে বেশি করে কোরবানি দিন

ভাষ্যকার | প্রকাশের সময় : ৩০ জুন, ২০২২, ১২:০৫ এএম

বন্যা ও দুর্যোগের সময় বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করা অপর মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। দেশের চলমান বন্যা অন্য সময়ের তুলনায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, সিরাজগঞ্জের পর দেশের মধ্যভাগে পানি উঠছে। কুড়িগ্রাম ও উত্তরের কিছু এলাকা পানিমগ্ন। এবার সাধারণ মানুষ বন্যার্তদের সেবায় এগিয়ে। সিলেট বিভাগে সারা দেশের মানুষ ত্রাণ সহায়তা নিয়ে গিয়েছে। স্থানীয়ভাবে ফুলতলী দরবারের সেবামূলক কাজ ছিল অতীতের মতোই বিশাল। ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারা দেশের আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ, ইসলামিক দল ও সংগঠন প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। খেদমতে খালক বা সৃষ্টির সেবার এসব কাফেলার সন্ধান ও পরিসংখ্যান সরেজমিনে সর্বাপেক্ষা নিখুঁতভাবে পাওয়া যাবে।

আলহামদুলিল্লাহ, ত্রাণ ও সহায়তা এমুহূর্তেও আশাতীত পর্যায়ে সচল রয়েছে। রাষ্ট্রের কর্তব্য এসব কল্যাণকর্মীদের বিষয়ে সম্ভাব্য খোঁজ খবর রাখা এবং মানবিক এই শুভশক্তিটিকে উৎসাহিত করার সবধরনের উদ্যোগ গ্রহণ। আল্লাহর রহমতে এটি বাংলাদেশের হৃদয় থেকে উৎসারিত ধর্মীয় আধ্যাত্মিক নৈতিক মানবিক শক্তি। যা হাজার বছরের ধর্ম প্রচারক ওলি আওলিয়া পীর মাশায়েখ ও নবীপ্রেমিক মানুষের কর্মধারার ফসল। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য।

মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, দরবার, ধর্মীয় সংগঠন ও সাধারণ মুসল্লীদের শত সহস্র টিম অব্যাহতভাবে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছে। সর্বশেষ বলা হয়েছে, শুকনো খাবার ও রান্না খাবারের চেয়ে এখন বেশি উপকারী হচ্ছে নগদ টাকা। কারণ, বন্যার পানি কমতে শুরু হলে সবাই নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরতে চাইছেন। এখানে দুর্বল পরিবারগুলোর বাড়িঘরে উঠার জন্য নগদ টাকার প্রয়োজন।

এমতাবস্থায় সামনে আসছে কোরবানি ঈদ। কোরবানি করা ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে হুকুম করেছেন, হে নবী আপনি আপনার প্রভুর উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন ও কোরবানি করুন। (সূরা কাউসার : ২)। নবী করিম (সা.) কোরবানির হুকুমের পর থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত কোরবানি করেছেন। একবার নবী করিম (সা.) নিজ হাতে ৬০টি দুম্বা জবেহ করেন। সাহাবায়ে কেরামও নিয়মিত কোরবানি করতেন।

নবী করিম (সা.) বলেন, কোরবানির দিনসমূহে আল্লাহর নিকট পশু কোরবানির চেয়ে উত্তম আর কোনো আমল নেই। এজন্য যাদের সামর্থ আছে তাদের কোরবানিই করতে হবে। কোরবানি না দিয়ে এর টাকা দান করে দিলে এতে কোনো সওয়াব পাওয়া যাবে না। কোরবানি না দিয়ে যে নেক আমলটি থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়, এর দশগুণ টাকা দান করলেও কোরবানির সমান সওয়াব পাওয়া যায় না।

এক ধরনের লোক আছে, যারা দুর্যোগের সময় বলে, এবার কোরবানি না দিয়ে মানুষের সেবায় টাকা বিলিয়ে দেব। এরা ইসলামের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ। এরা দুর্যোগের সময় অপচয়, বিলাসিতা ও বিনোদনের টাকা বাঁচাতে এবং দুর্গতদের দিতে বলে না। তাদের নজরটি প্রথমেই যায় যেকোনো একটি ইবাদতের দিকে। হয়তো বলবে হজ্জ না করে এ টাকা দান করে দিন। নয়তো বলবে কোরবানি না দিয়ে টাকা বিলিয়ে দিন। অন্য কোনো বিকল্প প্রস্তাব তারা করে না। ইবাদত বাদ দিতে তারা যত তাড়াহুড়া করে, ঐচ্ছিক কোনো ব্যয় কিংবা সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যয় সঙ্কোচন করে দুর্গতদের সেবার কথা তাদের মাথায় আসে না।

সমাজে কিছু লোক আছে, যারা ইসলামবিদ্বেষ থেকে এ ধরনের কথা বলে। যাদের দুর্যোগের সময় মানুষের জন্য কিছু করতে দেখা যায়নি বা তারা দেশের মানুষের বিপদের দিনে কোনো ভূমিকাই রাখেনি, তারা আগ বাড়িয়ে কোরবানি না করার পরামর্শ। ইসলামের একটি প্রতীককে বাদ দেওয়ার উৎসাহ দেয়। এদের কাছে পশু কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া পশু সম্পদের শোকরিয়া আদায়ের সুমহান ইবাদতের বিষয়টি পরিষ্কার নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ বা রিজিক স্বরূপ যে সব চতুস্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। সেসব আল্লাহর নামে জবেহ করে। তোমাদের মা‘বূদ একই মা‘বূদ, সুতরাং তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ করো এবং সুসংবাদ দাও বিনীতজনদেরকে। (সূরা হজ্জ : ৩৪)।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসব কোরবানিবিদ্বেষী লোকের বোঝা উচিত যে, বন্যাদুর্গত এলাকায় মানুষের খাদ্য ও পানীয়ের তুলনায় পশু খাদ্য সঙ্কট মোটেও কম নয়। এসময় কোরবানির জন্য প্রস্তুত গরু-ছাগল উপযুক্ত মূল্যে ক্রয় করা হলেই মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। ত্রাণকর্মী ও ময়দানে কর্মরত উলামা-মাশায়েখ এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মাধ্যমে উপদ্রুত এলাকার গরু কিনে আনা একটি বড় সেবা।

যারা সামর্থ রাখেন, তারা কোরবানির পশু ক্রয় করে স্থানীয় মানুষের মাঝে কোরবানির উদ্দেশে বিতরণ করতে পারেন। কেননা, দান-সদকার টাকা একান্ত গরিব ছাড়া সাধারণ মানুষ নিতে পারে না। কিন্তু কোরবানি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সব বান্দার জন্য বিশেষ একটি উপহার। এর গোশত ধনী গরিব সবাই নিতে পারে। এছাড়া অনেকে ওয়াজিব কোরবানি দেওয়ার পাশাপশি অনেকগুলো নফল কোরবানি দিয়ে থাকেন, তাদের পক্ষেও নফল কোরবানি বাদ দেওয়া উচিত হবে না। কারণ, সাধারণ দান-খয়রাত সবসময়ই সব জায়গায় করা যায়। যা কেবল গরিবেরই হক। কিন্তু কোরবানি একটি মহান ইবাদত। কোরবানির দিনগুলোতে আর কোনো ইবাদতই আল্লাহর নিকট পশু কোরবানির চেয়ে উত্তম নয়। অতএব তারা দূরবর্তী এলাকায় অধিক নফল কোরবানির ব্যবস্থা করতে পারেন।

বাংলাদেশে দেড় কোটির চেয়ে অধিক কোরবানির পশু এবছর তৈরি। দেশের ৮০ ভাগ কৃষক কোরবানি উপলক্ষে গরু বিক্রির চিন্তা করে। পাশাপাশি অসংখ্য উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী কোরবানি উপলক্ষে পশু পালন ও প্রস্তুত করে। এখানে বাংলাদেশের বার্ষিক একটি বিশাল অর্থনীতি কার্যকর আছে। এতে সামর্থবান মুমিনদের আবশ্যিক ইবাদতের পাশাপাশি দেশের সব শ্রেণির মানুষের একটি ইলাহী গণ দাওয়াতের সুব্যবস্থা রয়েছে। বছরে দু’য়েকবার গোশত খাওয়া যাদের জন্য কঠিন, তারাও কোরবানির ঈদ উপলক্ষে গোশত পেয়ে যায়। সব মানুষ কমবেশি গোশত খেতে পারে।

যারা অসুস্থতাজনিত কারণে রেডমিট পরিহার করে চলেন, তাদের কোরবানি আরো ফজিলতপূর্ণ, কেননা এখানে গোশত খাওয়ার নিয়ত থাকে না। অপরকে খাওয়ানোর নিয়তে একান্তভাবে আল্লাহর খুশির জন্য কোরবানির সুযোগ এক্ষেত্রে বেশি। গোশত কোনো কোরবানিদাতাই একা গোশত খেয়ে ফেলে না। এটি মানুষ সবধরণের আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী এবং নিজ আওতাধীন গরিবদের নিয়েই খায়। এতে আল্লাহর নেয়ামত, বরকত ও আমিষ ঈদ উপলক্ষে সারা দেশে ছড়িয়ে যেতে পারে।

কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়, খাদ্যজোগান, আনা-নেওয়া, কোরবানি করা, চামড়া আলাদা করা, গোশত কাটা থেকে নিয়ে গোটা কাজটি সম্পাদনের প্রয়োজনে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হয়। টাকা-পয়সার প্রবাহ বিত্তবানদের থেকে কোরবানির চামড়া বা তার মূল্য গরিবের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত বিস্ময়কর একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সঞ্চালন ঘটে। অতএব, কোরবানি দিতেই হবে।

দুর্যোগের সময় আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য আরো অধিক পরিমাণে কোরবানি করা উচিত। কারণ কোরবানি একটি আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ড বা লেনদেন মাত্র নয়, এটি আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যপূর্ণ মহান এক ইবাদত। গজব দূরীভূত করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, রিজিক বৃদ্ধি ছাড়াও কোরবানির তাৎপর্য সীমাহীন। অতএব কোরবানিবিরোধী কোনো প্রোপাগাণ্ডা প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। জুমা খুতবা বয়ান ক্লাসরুম ড্রইংরুম চায়ের দোকান ও গণসংযোগে মহান ইবাদত কোরবানির গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।

কোরবানির চামড়া নিয়ে বিগত কয়েক বছর যাবত যে অব্যবস্থাপনা চলছে, তারও আশু সমাধান কাম্য। কারণ, দেশের অসংখ্য এতীম, অসহায়, বিভিন্ন লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে কোরবানির চামড়া দিয়ে যুগে যুগে উপকৃত হয়ে এসেছে। চলমান এই বিশৃঙ্খলা দেশের বহু মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতীমখানার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। অথচ, কোরবানির চামড়া সম্পূর্ণই গরিবের হক। প্রসেস করে নিজে ব্যবহার না করলে তা অবশ্যই গরিবকে দিতে হবে। বিক্রি করলে, পুরো টাকাটাই গরিবের হক।

মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিং বা এতীমখানায় দান করলে দু’টি সওয়াব পাওয়া যায়। একটি দানের, অপরটি দীনি শিক্ষা প্রসারের। সুতরাং, দেশের প্রতিটি মসজিদ-মাদরাসা, ইসলামি সংগঠন, খানকাহ ও দরবারের পক্ষ থেকে কোরবানির প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। অজ্ঞ ও দুষ্ট লোকেদের অপপ্রচারে কান দেওয়া যাবে না। ইসলামের এই মহান অনুশাসনের পক্ষে সবসময় সোচ্চার থাকতে হবে। বলতে হবে, বিপদের দিন আল্লাহর রহমত পাওয়ার আশায় বেশি করে কোরবানি দিন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (6)
শওকত আকবর ২৯ জুন, ২০২২, ৯:২৪ এএম says : 0
কোরবানীর গরু কম দামি বেশী দামি কোন প্রশ্ন আছে? নাকি নিখুঁত পশু কোরবানী করা যাবে?ইসলাম কি বলে।আমি মোটামুটি দামের গরু দিয়ে কোরবানী করি।।
Total Reply(0)
আবুল ২৯ জুন, ২০২২, ৪:৫৫ পিএম says : 0
দুর্যোগের সময় আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য আরো অধিক পরিমাণে কোরবানি করা উচিত।
Total Reply(0)
আবুল ২৯ জুন, ২০২২, ৪:৫৬ পিএম says : 0
এ দুর্যোগের সময় যারা সামর্থ রাখেন, তারা কোরবানির পশু ক্রয় করে স্থানীয় মানুষের মাঝে কোরবানির উদ্দেশে বিতরণ করতে পারেন।
Total Reply(0)
আবুল ২৯ জুন, ২০২২, ৪:৫৫ পিএম says : 0
বন্যা ও দুর্যোগের সময় বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করা অপর মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। দেশের চলমান বন্যা অন্য সময়ের তুলনায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তাই গরীবদের জন্য এবার বেশি করে বুরবানি দেন
Total Reply(0)
আবুল ২৯ জুন, ২০২২, ৪:৫৭ পিএম says : 0
অন্য মানুষের বিপদে সাহায্য করলে মহান আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। তাই এ সময়ে বেশি করে কুরবানি দিয়ে মানুষকে সহযোগিতা করুন।
Total Reply(0)
ইমরান ২৯ জুন, ২০২২, ৪:৫৮ পিএম says : 0
সুন্দর একটি প্রতিবেদন লেখেছেন। ধন্যবাদ ইনকিলাবকে
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন