ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

ধর্ম দর্শন

আম্বিয়াদের শিক্ষার অবিনশ্বর ফল

সত্যালোকের সন্ধানে

| প্রকাশের সময় : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এ, কে, এম, ফজলুর রহমান মুন্শী : এই পৃথিবীতে যতজন পয়গাম্বর আগমন করেছেন, তারা একই দ্বীন এবং একই আকীদা-বিশ্বাস নিয়ে আগমন করেছিলেন। তাওহীদ, একই নবুওত, একই ইবাদত, একই আখলাক, একই শাস্তি ও পুরস্কার এবং একই আমলী জিন্দেগী ছিল তাদের জীবন-দর্শন। এ কারণে আম্বিয়াদের শিক্ষার মাঝে কোপনভ প্রভেদ ছিল না। এ জন্য আল কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “আল্লাহপাক তোমাদের জন্য সেই দ্বীনকে বিধিবদ্ধ করেছেন, যা নূহ (আ.) এবং অন্যান্য পয়গাম্বরকে প্রদান করেছিলেন। এরই নাম হচ্ছে ইসলাম।” কিন্তু আম্বিয়াদের নীতিমালার প্রধান ও প্রয়োজনীয় দিক ছিল, তাওহীদ। আর এটাই হচ্ছে নবুওতের মূল কাঠামোর অবিনশ্বর প্রবাহ।
সম্ভবত ইসলামের পরিপূর্ণতার পূর্বে বহু ভালো মানুষ অতিবাহিত হয়েছেন। তাদের আহ্বানও হয়তো উপকারী ছিল। তাদের চারিত্রিক নসিহত হয়তো হৃদয়গ্রাহী ছিল। চাই তারা গ্রিক-দার্শনিকই হোক অথবা হিন্দুস্থানের অবতারই হোক। কিন্তু তাদের দাওয়াত ও আহ্বানের সাথে যদি তাওহীদ শামেলে হাল না হয়ে থাকে, তাহলে তারা নুবওতের মর্যাদায় কখনো অধিষ্ঠিত ছিলেন না। পয়গাম্বর-সুলভ শিক্ষার একমাত্র পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের আহ্বান। যদি তা না থাকে তাহলে নবুওত মোটেই থাকতে পারে না। আল-কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “এবং আমি তোমার পূর্বে আর কোনও রাসূল প্রেরণ করিনি, কিন্তু তাঁকে এই অহী করে ছিলাম যে, আমি ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত-বন্দেগী কর।” (সূরা আম্বিয়া : রুকু-২) অপর এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছেÑ “এবং আমি প্রত্যেক কাওমের মাঝেই একজন রাসূল প্রেরণ করেছি, (এবং এ নির্দেশও তাদেরকে দিয়েছি যে)। আল্লাহর ইবাদত কর এবং শয়তান ও মূর্তিপূজাকে বর্জন কর।”  (সূরা নহল : রুকু-৫) সুতরাং এর দ্বারা বোঝা যায় যে, শিক্ষার ক্ষেত্রে নবুওতের পরিচয় তাওহীদের দ্বারাই লাভ করা যায়। তাই ইসলাম পরিপূর্ণতার পূর্বেকার যে সকল নবুওতের দাবিদারদের শিক্ষার প্রধান অংশ বা ভিত্তি তাওহীদ নয়, তাদের নবুওতের দাবিদার হওয়ার কোনোই অধিকার নেই।
নবুওতের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য :
আল্লাহপাকের পছন্দনীয় ও মনোনীত জীবন বিধানকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার পথ নির্দেশনা ও শিক্ষাদানের জন্য যুগে যুগে বহু নবী এবং রাসূল পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। কিন্তু আম্বিয়ায়ে কেরামের আগমনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে কাব্যের ভাষায় এবং সুললিত বর্ণনা বিন্যাসের দ্বারা যেভাবেই ব্যক্ত করা হোক না কেন, বর্তমান নিবন্ধে আমরা ঐ সকল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে তুলে ধরতে প্রয়াস পাব, যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জবান মোবারক হতে প্রকাশ পেয়েছিল। আসল দাবি হচ্ছে তা-ই, যা দাবিদারের জবান হতে প্রকাশ পায়। সাক্ষীর দ্বারা সে উদ্দেশ্য কখনো পরিপূর্ণ হয় না। আল-কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “স্মরণ কর, তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ হতে তার বংশধরকে বের করেন এবং তাদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা বলে নিশ্চিয়ই আমরা সাক্ষী রইলাম।’ (এই স্বীকৃতি গ্রহণ) এ জন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, আমরা তো এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম।” (সূরা আ’রাফ : রুকু-২২) এ জন্য আম্বিয়াদের আগমনের সর্বপ্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে ভুলে যাওয়া সেই অবিনশ্বর দিনের অঙ্গীকারকে স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং সে অঙ্গীকার মোতাবেক আনুগত্য ও প্রাণোৎসর্গের পথ গ্রহণ করা। এ কারণে জীবন চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই অবিনশ্বর দিনের অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। এতে করে রাসূলের আগমন সম্পর্কিত একটি উদ্দেশ্য এভাবে পরিপূর্ণতা লাভ করে যে, তাঁর অস্তিত্ব বা সত্তা বনী আদমের জন্য চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ দলিল। এরপর যেন আদম সন্তানেরা এই ওজর পেশ করতে না পারেÑ “আমাদের কাছে কোন সত্তা সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য আগমন করেননি।” আল-কোরআনে ঘোষণা করা হচ্ছে, “সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী বহু রাসূল প্রেরণ করেছি। যাতে রাসূলের (আগমনের) পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়” (সূরা নিসা : রুকু-২৩) এই তাজকীর বা স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর রাসূলগণের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, ‘হেদায়েত এবং পথ প্রদর্শন করা। এই হেদায়েত মূলত আল্লাহপাকের ‘হাদী’ বা পথ প্রদর্শক গুণের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এ জন্য আল-কোরআনের অপর এক আয়াতে নবী এবং রাসূলের হাদী বা হেদায়েতকারী শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, “প্রত্যেক কাওমের জন্যই একজন হাদী বা পথপ্রদর্শক আগমন করেছেন।” (সূরা রাআ’দ : রুকু-১)
সূরা শুরাতে ইরশাদ হচ্ছে, “এবং নিশ্চয়ই তুমি সোজা রাস্তার দিকে পথ প্রদর্শন করছ।” (সূরা শুরা : রুকু-৫) তাছাড়া সূরা আম্বিয়াতে কয়েকজন পয়গাম্বরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, “এবং আমি এই পয়গাম্বরগণকে এমন পথ নির্দেশক করে প্রেরণ করেছি, যারা আমার নির্দেশ মোতাবেক হেদায়েত করছেন।” (সূরা আম্বিয়া : রুকু-৫)
অনুরূপভাবে যে সকল আসমানী কিতাব তাদেরকে দেয়া হয়েছিল, সেগুলোকে বারবার ‘হেদায়েত’ এবং কখনো কখনো ‘নূর’ ও ‘আলোকরশ্মি’ শব্দ দ্বারা বিশেষিত করা হয়েছে। এই হেদায়েত এবং পথ প্রদর্শনের দ্বিতীয় মর্ম হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহর বান্দাহকে বাতিল ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকার হতে বের করে সত্যের আলোকজ্জ্বল পথে নিয়ে আসেন। মানুষ যখন ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা, নিরর্থক চিন্তা-ভাবনা এবং অর্থহীন ভেজালপূর্ণ কর্মকা-ে আবদ্ধ হয়ে সহজাত উপদেশ ও দূরদর্শিতা এবং আত্মিক পরিচয়ের নূর হতে বঞ্চিত হয়ে নিরাশ হয়ে যায়, তখন আম্বিয়ায়ে কেরাম এসকল অন্ধদেরকে হাত ধরে অন্ধকার হতে আলোর পথে নিয়ে আসেন এবং তাদেরকে সন্দেহের পরিবর্তে দৃঢ়বিশ্বাস, অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞান, মিথ্যা ও বাতিলের পরিবর্তে ন্যায় ও সত্য এবং অন্ধকারের পরিবর্তে নূর বা আলোদান করেন। আল-কোরআনে তাই ঘোষণা করা হয়েছেÑ ‘সেই আল্লাহ, যিনি স্বীয় সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী বান্দাহদের নিকট অবতীর্ণ করেন, যেন তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর পথে নিয়ে আসতে পারেন।’ (সূরা হাদিদ : রুকু-১)
এই পৃথিবীর নাজাত ও মুক্তি শুধু কেবল মধ্যম পন্থাতেই অর্জিত হতে পারে। যখন মানুষের মানসিক পরিবর্তনের মতো মানবদেহের সৃষ্ট উপাদানরাজিতে কম ও বেশির প্রকোপ দেখা দেয়, তখন অবশ্যই পৃথিবীর বুকে অশান্তি নেমে আসতে বাধ্য। মানব সমাজে এবং বিভিন্ন বংশ পরম্পরার এই সমতা বা মধ্যম গন্থার পরিবেশ বজায় না থাকলে উভয় পাল্লার ওজন সমান থাকবে না। সুদূর নীলাকাশ হতে শুরু করে পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণা পর্যন্ত মধ্যম পন্থার পাল্লাতে পরিমিত অবস্থায় আছে। রসায়ন ও মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এই সমতার ব্যক্তিকে সচক্ষে অবলোকন করতে পারেন এবং আশ্চর্য হয়ে বলতে বাধ্য হন যে, কোথাও একবিন্দু কম-বেশির অবকাশ নেই যেভাবে এই বস্তুময় জগতের সর্বত্র এহেন বিস্ময়কর সমতার পাল্লা বিরাজমান, ঠিক তেমনি রূহানা বা আত্মিক এবং আখলাকী দুনিয়ায়ও এই মধ্যম পন্থার সমতা থাকা নেহায়েত দরকার। বিশ্বাস সংক্রান্ত হোক চাই ইবাদত, চারিত্রিক হোক বা বৈষয়িক সর্বত্রই এই সমতার নামই হচ্ছে সত্য, ন্যায় এবং ইনসাফ। আল-কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছেÑ ‘এবং তিনিই আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং মানদ- স্থাপন করেছেন যাতে তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর; তোমরা ওজনের ন্যায্যমান প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওজনে কম করো না। (সূরা আররহমান : রুকু-১)
এই ওজনের সমতা ও ভারসাম্য অনিচ্ছায় পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণার এবং এর প্রতিটি স্পন্দন ও ক্রিয়াকর্মে প্রকৃতির ¯্রষ্টা পরিমিতভাবে কায়েম রেখেছেন। এই সমতা ও ওজনের ভারসাম্যতা রাসূলগণের মাধ্যমে আগত শরিয়তের দাঁড়িপাল্লা মোতাবেক ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপে একই স্পন্দনে হওয়া চাই। ইচ্ছাশক্তিহীন পৃথিবীর দাঁড়িপাল্লাকে বলা হয় প্রাকৃতিক আইন এবং ইচ্ছা শক্তিসম্পন্ন পৃথিবীর দাঁড়িপাল্লার নাম হচ্ছে শরীয়তের আইন। ইচ্ছাশক্তিহীন পৃথিবীর সার্বিক ন্যায়ানুগ ইনসাফ ঐশী প্রাকৃতিক দাঁড়িপাল্লার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই দাঁড়িপাল্লার মাঝে ন্যূনতম বেশি-কম দেখা দিলে পৃথিবীর শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে মানবিক দুনিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা, স্বস্তি ও স্থিতিশীলতার নিয়মতান্ত্রিকতা শরিয়তের দাঁড়িপাল্লার দ্বারা কায়েম থাকে। অন্যথায় এখানেও অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য। এ জন্যই আল-কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছেÑ ‘নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে স্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি ন্যায়নীতি যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা হাদিদ : রুকু-৩) আম্বিয়াগণের প্রেরণের এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রাকে মানুষ শরিয়তের দাঁড়িপাল্লা মোতাবেক ইনসাফ ও সমতাকে কায়েম রাখলে তা এই বর্তমান বিশ্বের নিয়মতান্ত্রিকতায় শান্তি ও নিরাপত্তার পথ সুগম করে তুলবে। আজ ইউরোপের অংশীবাদী ধ্বনি, বিশ্বের প্রতিটি স্থানে অনুরণিত হচ্ছে। এমনকি রাসূলগণের গুরুত্ব ও তাদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর নানারকম সন্দেহ, বিশ্বাস ভঙ্গের কুটিল জালবিস্তার করা হচ্ছে, কিন্তু খেয়াল ও কল্পনা-বিলাসের প্রতি নজর না করে ব্যবহারিক দিক হতে দুনিয়ার এক একটি মহাদেশ ও প্রতিটি আবাদির জরিপ করা হলে দেখতে পাবে, আজ বিশ্বের যেখানেই সততার আলো, ন্যায় ও ইনসাফের কিরণ ঝলমল করে আলো বিতরণ করছে, তা এই নবুওতের উদিত সূর্যের আলোরই বিচ্ছুরিত কণা বিশেষ। কেউ দ্বীনদার হোক চাই বেদ্বীন, সুস্থ বিশ্বাসের অধিকারী হোক চাই বদ আকীদা বা অবিশ্বাসী, গ্রিসের দার্শনিক হোক চাই আফ্রিকার মূর্খ, ইউরোপের সুসভ্য হোক, মরুভূমির অসভ্য হোক, রোমান হোক চাই সাধারণ হোক, ঈসা (আ.)-এর অনুসারী হোক, চাই মূসা (আ.)-এর অনুসারী হোক, মুর্তিপূজারি হোক বা একত্ববাদী হোক, অগ্নিউপাসক হোক চাই হিন্দু হোক, মুসলিম হোক চাই অমুসলিম হোক, চাই শহরবাসী হোক, চাই গ্রামবাসী হোক, হিমালয়ের চূড়ায় বসবাসকারী হোক বা মৃত্তিকা গর্তে বসবাস করুক, যেখানে যে অবস্থায়ই থাকুক, সে যদি আল্লাহর নামের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়, পাপ ও পুণ্যের প্রভেদ সম্বন্ধে সচেতন হয়, তাহলে সে আল্লাহর রাসূলগণ এবং আল্লাহর পয়গাম্বরগণ ছাড়া কোনো শিক্ষকের প্রচেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন। আজ যেখানেই সত্য ও ন্যায়ের অস্তিত্ব বিদ্যমান আছে, তা কোনই গ্রিক দার্শনিক, ইউরোপীয় অধ্যাপকের শিক্ষা ও লেখনি এবং বক্তৃতা ও ভাষণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং তা হচ্ছে আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ শিক্ষার শুভফল মাত্র। আজ বিশ্বজোড়া অপসংস্কৃতির সয়লাব যতই বেশি হোক না কেন, তবুও পুণ্য, ন্যায় ইহসান, সহমর্মিতা, ন্যায়ানুবর্তিতা, সচ্চরিত্রতার শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঐ সকল লোকদের কণ্ঠেই প্রচারিত হচ্ছে, যারা রাসূল এবং পয়গাম্বরদের যথার্থ অনুসারী। আর যারা অংশীবাদী, অবিশ্বাসী, তারা নিজেদের অজান্তে যে সকল ভালো কাজ করে, এর মাঝেও পয়গাম্বরদের শিক্ষার পরশ পাওয়া যায়। তাই যে সকল লোক বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিয়ে পয়গাম্বরদের অস্বীকারকারী, তারাও ব্যবহারিক জীবনে পয়গাম্বরদের কর্মকা-কে স্বীকার করতে বাধ্য। এ জন্য আম্বিয়াদের অস্তিত্ব সারা দুনিয়ার জন্য রহমতস্বরূপ। আল-কোরআনে আসমানি কিতাবসমূহকে বার বার রহমত ও হেদায়েত বলা হয়েছে এবং এ ঘোষণাও দেয়া হয়েছে যে, এগুলোকে রহমত ও পথপ্রদর্শনের জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে। এর দ্বারা নবুওতের মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সত্তাকে সারা দুনিয়ার রহমতের উৎস হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আমি তোমাকে (হে মুহাম্মদ)! সারা দুনিয়ার জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : রুকু-৭) সাহায্য ও সহানুভূতি : আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম যে উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেন এর সামনে যত বড় মুশকিলই আসুক না কেন, যত বৃহৎ বালার সম্মুখীন হোক না কেন, যত বড় কষ্ট ও আঘাতের মোকাবেলা করা হোক না কেন, পরিশেষে সে উদ্দেশ্য অবশ্যই পরিপূর্ণতা লাভ করে। পয়গাম্বরদের সীরাত তাদের আহ্বানের তারিখ, স্বয়ং তাদের এই দাবির ওপর সত্য সাক্ষী হয়ে আছে। আল কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘এবং আমার বাক্য স্বীয় বান্দাহ রাসূলদের জন্য পূর্বাহ্নেই স্থিরিকৃত হয়ে আছে যে, অবশ্যই তাকে সাহায্য দেয়া হবে এবং আমাদের সৈন্যরাই বিজয়ী হয়।’ (সূরা সাফফাত : রুকু-৫)
শুধু কেবল এই দুনিয়াতেই নয়, বরং হাশরের দিনও তাদের এবং ঈমানদারদের কামিয়াবী হবে। আল-কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে ও মুমিনদেরকে পার্থিব জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দ-ায়মান হবে সাহায্য করব। যেদিন সীমা লংঘনকারীদের ওজর-আপত্তি কোনো কাজে আসবে না, তাদের জন্য রয়েছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস। (সূরা নহল : রুকু-৬)
পয়গাম্বরদের ওপর কখনো এমন কঠিন সময়ও আপতিত হয় যে, যখন তারা স্বীয় কাওমের হেদায়েত গ্রহণ হতে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হয়ে যায়। এমনকি আশার আলোর কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায় না। অপরদিকে আল্লাহর আজাব দেরিতে আসার কারণে অবিশ্বাসীরা মনে করতে থাকে যে, তাদেরকে মিথ্যা আজাবের ধমক দেয়া হয়েছিল। এমন সময় হঠাৎ করে আশার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহর সাহায্য ও সহানুভূতির প্রচ্ছায়ায় আগমন ত্বরান্বিত হয়ে পড়ে। এতে করে পুণ্যবান লোকদের অন্তরকে সত্য গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং অবিশ্বাসীদের ওপর কোনো না কোনো আজাব আপতিত হয়ে তাদের মূলোৎপাটন করে দেয়। আল-কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘এমনকি যখন পয়গাম্বরগণ স্বীয় কাওমের ঈমান গ্রহণ হতে নিরাশ হয়ে পড়েন এবং অবিশ্বাসীরা মনে করতে থাকে যে, তাদের কাছে মিথ্যা কথা বলা হয়েছে, তখনই আমার সাহায্য এসে যায়।’ (সূরা ইউসুফ : রুকু-১২)
আল্লাহর এই সাহায্য ও হেফাজতের আহ্বান যারা পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করে তারা এ পথে সকল প্রকার মুসিবতকে বরণ করে নেয় এবং স্বীয় মস্তককে হাতের মুঠোয় পুরে চলাফেরা করে, তারা বিরুদ্ধবাদীদের সৈন্য-সামন্ত ও সমরাস্ত্রের সমূহ ভয়ভীতি সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অর্পিত দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব হতে কখনো পিছপা হয় না এবং কোনো মূল্যেই তারা বিরুদ্ধবাদীদের সাথে  আপস করতে সম্মত হয় না। বিরুদ্ধবাদী অবিশ্বাসীরা প্রথমাবস্থায় তাদের বাহ্যিক দুর্বলতা ও সহায়হীনতা দেখে মনে করতে থাকে যে, তারা তো এমনিতেই পরাজিত। কিন্তু আল্লাহপাক তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা ছিন্ন করে ঘোষণা করেন, “সুতরাং কখনো এই ধারণা করো না যে আল্লাহপাক রাসূলদের সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করবেন।’ (সূরা ইব্রাহীম : রুকু-৭) সৃষ্টির বহু পূর্বেই এই কানুন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, সত্যের আহ্বানকারীগণই পরিণামে বিজয় লাভ করবে। আল-কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আল্লাহ লিখে রেখেছেন যে, আমি এবং আমার রাসূলই বিজয়ী হব।’ (সূরা মুজাদালাহ : রুকু-৩)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন