বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪, ২ শ্রাবন ১৪৩১, ১০ মুহাররম ১৪৪৬ হিজরী

ইংরেজি নববর্ষ সংখ্যা

কক্সবাজারে রেল আসছে নতুন বছরে

৭৬ ভাগ কাজ শেষ : দৃশ্যমান ৫০ কিমি রেল পথ : প্রস্তুত হচ্ছে দৈনিক ৪৬ হাজার যাত্রী যাতায়াত সক্ষমতার স্টেশন

শামসুল হক শারেক, কক্সবাজার থেকে : | প্রকাশের সময় : ১ জানুয়ারি, ২০২৩, ১২:০০ এএম

কক্সবাজার-দোহাজারী রেল পথ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ২০২৩ সালের নতুন বছরে শতাব্দীর স্বপ্ন রেল আসছে কক্সবাজারে। রেল চালু হলে পর্যটক যাতায়াত সহজ হবে। কম সময়ে এবং কম খরচে কৃষিপণ্য, মাছ, লবণ পরিবহন করা যাবে সহজে। এতে করে কক্সবাজারের পর্যটনসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

পর্যটন, লবণ, চিংড়ি ও কৃষিপণ্যসহ নানা কারণে গুরুত্ব বেড়ছে পর্যটন শহর কক্সবাজারের। এছাড়াও রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ফোকাস পেয়েছে কক্সবাজার। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে দেশের উন্নয়ন অগ্রতি ও অর্থনীতির বিকাশে। আধুনিক উন্নত সমাজ ব্যবস্থায় যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণের কোন বিকল্প নেই। এরই প্রেক্ষিতে কক্সবাজারের সাথে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজ করণের দাবী ছিল বহুদিনের। এই দাবীর প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা সরকার কক্সবাজার বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দের উন্নিত করে এবং শতাব্দীর দাবী দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ প্রকল্প গ্রহণ করে।

শতাব্দীকালের দাবী দোহাজারী কক্সবাজার রেল লাইন এক সময়ের স্বপ্ন হলেও এখন আর স্বপ্ন নয়। এটি এখন বাস্তব। ২০২৩ সালের নতুন বছরে রেল আসছে কক্সবাজারে। কক্সবাজার থেকেই রেলে চড়ে মানুষ যাবে দেশের এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সহজ হবে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য আনা নেয়া। আর কক্সবাজারে বাড়বে পর্যটকের স্রোত। পর্যবেক্ষদের মতে কক্সবাজার দোহাজারী রেললাইন চালু হলে পর্যটকদের পাশাপাশি ঘুরে যাবে কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাকাও।

এই গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে দেহাজারী-কক্সবাজার ১০০ কিমি রেল পথের ৭৬ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এখন কক্সবাজারবাসী আশা করছেন দ্রুতই ট্রেন আসবে কক্সবাজারে।

জানা গেছে, আগামী জুনের মধ্যেই ট্রেন আসছে পর্যটননগরী কক্সবাজারে। এই টার্গেট নিয়েই কাজ করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

ইতোমধ্যে ৫০ কিলোমিটারের বেশি রেললাইন এখন দৃশ্যমান হয়েছে। এরই মধ্যে এই মেগা প্রকল্পের কাজ ৭৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি প্রকল্প কর্মকর্তাদের। বাকি ২৪ শতাংশ কাজ দ্রুত শেষ করে ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে কক্সবাজারে ট্রেন চলাচল শুরু করতে পারবেন বলে তারা আশাবাদী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ চালু হলে শুধু পর্যটন খাতে সম্ভাবনা বাড়বে তা নয় লবণ, মৎস্য, কৃষিসহ অন্যান্য খাতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, আগামী জুনের মধ্যে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন চালু হবে। তখন সারাদেশ থেকে মানুষ ট্রেনে চড়ে সরাসরি কক্সবাজারে যাবে। গত ৮ ডিসেম্বর

রেলপথ মন্ত্রী নতুন : রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শনের সময় কক্সবাজারের আইকনিক স্টেশনে উপস্থিত সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

এসময় রেল মন্ত্রী বলেন, একসময় এটি স্বপ্ন ছিল, এখন সেটা বাস্তবায়নের পথে। কক্সবাজারবাসী যেমন অপেক্ষায় আছে, তেমনি সারা দেশের মানুষও ট্রেনে করে পর্যটন নগরী কক্সবাজার যাওয়ার জন্য অপেক্ষায়। আশা করা যাচ্ছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ আগামী বছর জুনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

তিনি আরো বলেন, কক্সবাজারে চলাচলের জন্য টুরিস্ট কোচের আদলে উন্নত মানের কোচ দিয়ে ট্রেন চালানো হবে। এজন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ৫৪টি কোচ কেনা হবে যেগুলোর জানালা সুপ্রশস্ত। মানুষ অনায়াসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ পাবে। এসময় মন্ত্রী বলেন, রেল লাইনের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

রেলমন্ত্রী এ সময় নির্মাণাধীন আইকনিক স্টেশন বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন তলা ঘুরে দেখেন। আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যে স্টেশন বিল্ডিংয়ের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। মন্ত্রী পরে পরিদর্শন কারে চড়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার নতুন লাইন পরিদর্শন করেন।

এ সময় কক্সবাজার সদর-রামুর সংসদ সদস্য সাইমুম সরোয়ার কমল, বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) কামরুল আহসান, বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেনসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

২০১১ সালের ৩ এপ্রিল দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম পর্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেল পথ নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার এবং রামু থেকে কক্সবাজার ১২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ হচ্ছে। মিয়ানমার সরকারের সম্মতি না থাকায় আপাতত রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার রেললাইনের কাজ হচ্ছে না। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ১০০ কিলোমিটার রেলপথে স্টেশন থাকছে আটটি। এগুলো হলো- সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাঁও, রামু, কক্সবাজার সদর ও উখিয়া। এ জন্য সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাকখালী নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে তিনটি বড় সেতু। এ ছাড়া এই রেলপথে নির্মাণ করা হচ্ছে ৪৩টি ছোট সেতু, ২০১টি কালভার্ট ও ১৪৪টি লেভেল ক্রসিং। সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া এলাকায় তৈরি হচ্ছে একটি ফ্লাইওভার, রামু ও কক্সবাজার এলাকায় দু›টি হাইওয়ে ক্রসিং। হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর চলাচলে ৫০ মিটারের একটি ওভারপাস ও তিনটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমানের মতে ১০০ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ৫০ কিলোমিটারের বেশি এখন দৃশ্যমান। বেশির ভাগ ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ শেষ হয়েছে। যেগুলো বাকি আছে সেগুলো আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যেই শেষ হবে। গত অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৭৬ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ আছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তিনি আরো জানান, আমরা চেষ্টা করছি ২০২৩ সালের জুন-জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে। একই সাথে রেলস্টেশনগুলোর নির্মাণকাজও চলমান আছে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের প্রায় সাত বছর পর ২০১৮ সালে ডোয়েল গেজ ও সিঙ্গেল ট্র্যাক রেললাইন প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রামু পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণে প্রথমে ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর অর্থায়ন করেছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার।

এদিকে, কক্সবাজার সদর থেকে সাত কিলোমিটার পূর্ব-উত্তরে ঝিলংজা ইউনিয়নের হাজিপাড়া এলাকায় ২৯ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে। দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেলস্টেশন। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, স্টেশনটিকে সৈকতের ঝিনুকের আদলে তৈরি করা হচ্ছে। স্টেশন ভবনটির আয়তন এক লাখ ৮২ হাজার বর্গফুট। ছয়তলা ভবনটির বিভিন্ন অংশে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলমান আছে। নির্মাণাধীন আইকনিক ভবন ঘেঁষে ৬৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থের তিনটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। এর পাশেই রেলওয়ের আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে আটটি ভবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্টেশনটিতে আবাসিক হোটেলের পাশাপাশি ক্যান্টিন, লকার, গাড়ি পার্কিং ইত্যাদির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পর্যটকরা স্টেশনের লকারে লাগেজ রেখে সারা দিন সমুদ্রসৈকতে বা দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে পারবেন। এই স্টেশন দিয়ে দিনে ৪৬ হাজার মানুষ আসা যাওয়া করতে পারবেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে। এরপরও কাজ চলছে। একইভাবে সাগরপথে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অন্য দেশ থেকে মালামাল আনতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

এদিকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‹কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট সেতুর পাশে আরেকটি নতুন রেলসেতু নির্মাণ করা হবে। নতুন সেতুটি হবে পদ্মা সেতুর আদলে। এই সেতু নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ৭৮০ মিটার। আর সেতুর উচ্চতা হবে ১২ দশমিক দুই মিটার। সেতুর ওপরে চলবে গাড়ি আর নিচে দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুটি নির্মাণে সব ব্যয় বহন করবে কোরিয়ান সরকার। শিগগিরই এই সেতুর কাজ উদ্বোধন করা হবে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার সদর রামুর এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল এ প্রসঙ্গে বলেন, শতাব্দীকালের দাবী দোহাজারী কক্সবাজার রেল যোগাযোগ এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতায় নতুন বছরে রেল আসছে কক্সবাজারে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেল লাইন চালু হলে অবশ্যই কক্সবাজারের পর্যটনসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। ট্রেনে পর্যটক যাতায়াত সহজ হবে। কম সময়ে এবং কম খরচে কৃষিপণ্য, মাছ, লবণ সহজে পরিবহন করা যাবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন