ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

পরীক্ষামূলক প্লাজমা থেরাপি শুরু

জটিল রোগীদের চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের বিষয়টি ইতিবাচক : প্রফেসর ডা. ইকবাল আর্সলান

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ১৫ মে, ২০২০, ১২:০৪ এএম

২৭ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে প্রটোকল প্রণয়ন করেছে

করোনা রোগীদের চিকিৎসায় দেশে পরীক্ষামূলক প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করা হবে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের শিক্ষক ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিটরে প্রধান প্রফেসর ডা. এম এ খান। তিনি বলেন, এটি একটি পুরাতন পরীক্ষিত চিকিৎসা পদ্ধতি। বিশেষ করে যখন কোন রোগের নির্দ্দিষ্ট কোন ওষুধ নেই এবং সুস্পষ্ট কোন চিকিৎসা ব্যবস্থাও নেই। সেই ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর ও পরীক্ষিত চিকিৎসা পদ্ধতি। তিনি বলেন, চীন, আমেরিকাসহ অন্যান্য অনেক দেশে ইতোমধ্যে করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপির সফলতা প্রমাণিত হয়েছে। চীনের প্লাজমা থেরাপির ব্যবহারের প্রথম দিকে ১০ জন অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে এটি প্রয়োগ করে দেখা গেছে, তারা সকলেই দ্রæত সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। অপরদিকে একই সময় অন্য দশজন অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্লাজমা না দিয়ে প্রথাগত চিকিৎসা দেয়ার তাদের মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু ঘটে। তাই করোনা চিকিৎসায় এর সফলতা প্রমাণিত। এ কারণে গত ৩ এপ্রিল ইউএসএফডিএ এটির পরীক্ষামূলক ব্যবহারের অনুমোদন দেয়।

প্রফেসর খান বলেন, ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে এ সংক্রান্ত নীতিগত অনুমোদন নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যে করোনা রোগীরা আছেন তাদের ওপরই এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে। এছাড়া ঢাকার আরও দুয়েকটা হাসপাতালে রোগীদের ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সেন্টার হবে আমাদের এখানে। এছাড়া কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। আমাদের ক্রাইটেরিয়া মত রোগী পাওয়া গেলে তাদের ওখানেও করতে পারি। কিছু ডোনার আমাদের হাতে আছে। যারা ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছেন তাদের আহ্বান জানাচ্ছি তারা যেন প্লাজমা দিতে এগিয়ে আসেন।

তিনি বলেন, কোভিড মহামারির হাত থেতে জীবন বাঁচাতে গত ২৭ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে একটি প্রটোকল প্রণয়ন করেছে। যেটি চ‚ড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিএমআরসিতে জমা দেয়া হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ৪৫ জন কোভিড আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্লাজমা প্রয়োগ করবো। একইসঙ্গে অপর ৪৫ জনকে প্লাজমা ছাড়া অন্য চিকিৎসা দেয়া হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আমাদের এক থেকে দেড় মাস সময় লাগবে। এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আমাদের দেশে মুমূর্ষু রোগীদের ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করা হবে।

রক্তরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তের তরল, হালকা হলুদাভ অংশকে প্লাজমা বা রক্তরস বলে। তিন ধরনের কণিকা ছাড়া রক্তের বাকি অংশই রক্তরস। মেরুদÐী প্রাণীর শরীরের রক্তের প্রায় ৫৫ শতাংশই রক্তরস। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের তথ্য মতে, একজন সুস্থ মানুষের রক্তে শতকরা ৫৫ শতাংশ প্লাজমা থাকে। আর ৪৫ শতাংশ থাকে রক্তের কোষ। রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা করলে দেখা যাবে এর মধ্যে ৯২ ভাগ পানি ৭ দশমিক ৫ ভাগ প্রোটিন। এই প্রোটিনের মধ্যে থাকে এলবোমিন এবং গেøাবমিন। গেøাবমিনের মধ্যে থাকে ইমিউনো গেøাবমিন। যা শরীরে এন্টিবিড তৈরি করে। যে কোন সুস্থ মানুষের শরীরে কোন ভাইরাস প্রবেশ করার তিন থেকে ৭ দিনের মধ্যে এন্টিবডি তৈরি হয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। করোনা আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রেও এটি সত্য। তবে করোনা আক্রান্ত রোগী পরপর দুইবার করোনা নেগেটিভ প্রমাণিত হওয়ার পর কমপক্ষে ১৪ দিন অতিক্রান্ত না হলে তার শরীরে থেকে প্লাজমা নেয় যাবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৮টি এ্যাফরেসিস মেশিন রয়েছে। এরমধ্যে রংপুর রাজশাহী ও সিলেট মেডিকেল কলেজে এই মেশিন রয়েছে। রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে এই মেশিন কার্যকর রয়েছে। এই মেশিনের সাহায্যে একজন মানুষের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে ২০০ এমএল প্লাজমা তৈরি করতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে একটি মেশিন দিয়ে দৈনিক ১০ থেকে ১২ জনের প্লাজমা সংগ্রহ করা সম্ভব।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ দাউদ আদনান বলেন, প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাতা নির্বাচন। কারণ নারী, বৃদ্ধ এবং শিশুদের শরীর থেকে প্লাজমা নেয়া বিজ্ঞানসম্মত নয়। ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের শরীরের এন্টিবডি শক্তিশালী থাকে। তাই এই বয়সী করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ্য হয়েছে এমন লোকদের দাতা হিসাবে নিতে হবে।

ডা. এম এ খান জানান, দাতার শরীর থেকে প্লাজমা সংগ্রহের জন্য একটি বিশেষ কিট প্রয়োজন হয়। এ ধরনের প্রতিটি কিটের দাম ১২ হাজার টাকা। প্লাজমাদাতার রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ জানতে যে পরীক্ষা করতে হয় সেজন্য স্পেন থেকে চারটি কিট আনার আদেশ দিয়েছেন তারা। প্রতিটি কিটের দাম পড়বে দেড় লাখ টাকা করে। একটি কিটে ৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। আপাতত ঢাকা মেডিকেলের নিজস্ব খরচে পরীক্ষামূলক পর্যায় শুরু করা হলেও বড় আকারে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গেলে সরকারের সহায়তা লাগবে বলে জানান এ চিকিৎসক।
তিনি বলেন, প্লাজমা সংগ্রহের কিট আমাদের হাতে অল্প কয়েকটা আছে। আমরা চাইলেই ডোনারের কাছ থেকে কিটের খরচ নিতে পারি না। আর রোগীরাও এই খরচ দেবে না। এজন্য সরকারকে এগুলো সরবরাহ করতে হবে।

পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বলে রোগীকে প্লাজমা থেরাপি দেওয়ার পর আরও কিছু পরীক্ষা করাতে হয়। কিছু পরীক্ষা ঢাকা মেডিকেলে হয়, কিছু পরীক্ষা বাইরে করাতে হবে। সেজন্যও আলাদা খরচ আছে জানিয়ে প্রফেসর খান বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, স্বাস্থ্য অধিদফতর এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। তারা এখনও নিশ্চুপ। তারা বলেছে মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠিয়েছে। আমি যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা করার সম্ভাব্যতা দেখতে এপ্রিলের শুরুতে আগ্রহের কথা জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজির প্রফেসর ডা. এম এ খান। ১৯ এপ্রিল তাকে সভাপতি করে ৪ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ডা. আহমেদুল কবির, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. মাজহারুল হক তপন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী ওই কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের রোগী দিন দিনই বাড়ছে। রোগী বাড়তে থাকায় চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। এক্ষেত্রে প্লাজমা থেরাপি কতটা কাজে আসবে জানতে চাইলে প্রফেসর খান বলেন, এ বিষয়ে এখনও তারা শতভাগ নিশ্চিত নন। করোনাভাইরাসের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আর প্লাজমা থেরাপির যেহেতু কোনো ক্ষতি নেই, সে কারণে এর পরীক্ষা চালাতে কোনো সমস্যা নেই। বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে, ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এটা কার্যকর হয়েছে।

ডা. এম খান স্বাস্থ্য অধিদফতরে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেন, করোনা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তির রক্তের প্লাজমা সংগ্রহ করে ফ্রিজিং করতে হবে। কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মধ্যে যাদের অবস্থা খারাপের দিকে, তাদের শরীরে এই প্লাজমা প্রয়োগ করা হবে। করোনা হওয়ার পর জ্বর, কাশি ও গলাব্যথা শুরু হয়। ভাইরাসের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ফুসফুস আক্রমণ করে। এই প্রদাহকালীন নানা ধরনের সাইটোকাইন এবং ক্যামোকাইন বেশি পরিমাণে নিঃসৃত হয়ে ফুসফুস জ্বালা করে। যন্ত্রণা তাৎক্ষণিকভাবে লাঘব করতে পারে প্লাজমা।

এ প্রসঙ্গে করোনা সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটির অন্যতম সদস্য প্রফেসর ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশই প্লাজমা থেরাপি ব্যবহার করছে। এত ভাল ফল পাচ্ছে। তাছাড়া প্লাজমা থেরাপির পেছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। এটি মানুষের শরীরে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করে সেটি প্রমাণিত। তাই জটিল কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের বিষয়টি ইতিবাচক।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন