মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

ধর্ম দর্শন

আকিকার গুরুত্ব ও ফজিলত

মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী | প্রকাশের সময় : ২১ আগস্ট, ২০২০, ১২:১০ এএম

আকিকা আরবি শব্দ। এর অর্থ কর্তন করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় নবজাতক ছেলে মেয়ের জন্মের সপ্তম দিন পশুর যে রক্ত প্রবাহিত করা হয় একে আকিকা বলে। আকিকা একটি মুস্তাহাব আমল। নবজাতক সন্তানের পিতা বা অভিভাবকের পক্ষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় পূর্বক কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ আকিকা করা মুস্তাহাব।

রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা আকিকা প্রমাণিত। রাসূল (সা.) আপন নাতী হজরত হাসান ও হুসাইন (রা.) এদের আকিকা করেছেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ছেলে মেয়ের জন্য আকিকা। এদের পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত করাও এবং এর মাধ্যমে ময়লা (মাথার চুল) দূর করো।’ (সহিহ বোখারি)

আকিকার পশু জবাইয়ের সময় : জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা মুস্তাহাব। হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধকস্বরূপ। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে জবাই করবে এবং তারা মাথা মুন্ডন করে নাম রাখবে।’ (সুনানে আবু দাউদ ২/৩৯২) সপ্তম দিনে না পারলে পরে যখনই করবে, সপ্তম দিনের হিসাবে করা উত্তম। অর্থাৎ সপ্তাহের যে বারে শিশু জন্মগ্রহণ করবে, তার আগের বারে আকিকা করবে। শুক্রবার দিন জন্মগ্রহণ করলে বৃহস্পতিবার আকিকা করবে। বৃহস্পতিবার জন্মগ্রহণ করলে বুধবার আকিকা করবে। এভাবে যখনই আকিকা করা হবে এই হিসাবে সপ্তম দিনে পড়বে।

সন্তান বড় হয়ে গেলেও আকিকা করা যায়। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) নবুওয়াত পাওয়ার পর নিজের আকিকা নিজে করেছেন।’ (বায়হাকি)

আকিকার উপকারিতা : আকিকার অনেক উপকারিতা রয়েছে। জীবনের প্রারম্ভে নবজাতকের নামে রক্ত প্রবাহিত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। এটা ইসলামী ভ্যাকসিন। এর মাধ্যমে আল্লাহর হুকুমে অনেক পেরেশানি, বিপদ-মুসিবত ও অসুস্থতা থেকে মুক্তি মিলে। দুনিয়াবী ভ্যাকসিনের সাথে আমাদের আখেরাতের ভ্যাকসিনের প্রতিও গুরুত্বারোপ করা উচিত।

নবজাতকের জন্ম আল্লাহর বড় একটি নেয়ামত। আকিকার মাধ্যমে এই নেয়ামতের বহির্প্রকাশ হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সম্পদ ও সন্তানসন্তুতি জীবনের শোভা।’ (সূরা কাহাফ, আয়াত : ৪৬)

সন্তানের আকিকা করার মাধ্যমে কিয়ামতের দিন পিতা সন্তানের সুপারিশের উপযুক্ত হয়। এ ছাড়াও আকিকার মাধ্যমে দানশীলতার বিকাশ ঘটে। গরিব মিসকিন ও আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় হয়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সম্পর্ক বাড়ে। পরষ্পরে হৃদ্যতা ও আন্তরিকতাপূর্ণ ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।

আকিকার পশুর সংখ্যা : ছেলে সন্তানের জন্য দুটি ছাগল আকিকা করতে হয়। আর কন্যা সন্তানের জন্য একটি। হজরত উম্মে কুরজ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘ছেলের জন্য এক ধরনের দুটি বকরি এবং মেয়ের জন্য একটি বকরি আকিকা করবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৮৩৪)

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) তাদেরকে ছেলে সন্তানের জন্য দুটি সমসয়সী ছাগল আর মেয়ে সন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করার জন্য নির্দেশ করেছেন।’ (জামে তিরমিজি ১/১৮৩)

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, ‘ইহুদিরা পুত্রসন্তানের আকিকা করত কিন্তু কন্যাসন্তানের আকিকা করত না। তোমরা পুত্রসন্তানের জন্য দুটি ছাগল এবং কন্যাসন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে হলেও আকিকা করো।’ (বায়হাকি, সুনানে কুবরা, হাদিস : ১৯৭৬০)

তবে কারো সামর্থ না থাকলে একটা ছাগল দিয়েও আকিকা হতে পারে। হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘রাসূল (সা.) একটি ছাগল দিয়ে হাসানের আকিকা দিলেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৬০২)

আকিকার জন্তুর ধরন : যে পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ, সেই পশু দিয়ে আকিকা করাও বৈধ। যে পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ নয়, সেই পশু দিয়ে আকিকা করাও বৈধ নয়। তাই আকিকার ক্ষেত্রে জন্তুর বয়স ও ধরনের দিক থেকে কোরবানির জন্তুর গুণ পাওয়া যায়, এমন জন্তুই নির্বাচন করতে হবে। (জামে তিরমিজি ৪/১০১)

কোরবানির জন্তুর সঙ্গে আকিকা করা : কোরবানির জন্তুর সঙ্গে আকিকা করা বৈধ। একটি পশুতে তিন শরিক কোরবানি হলে সেখানে আরো দু-এক শরিক আকিকার জন্যও দেওয়া যেতে পারে। তদ্রুপ কোরবানির মতো একই পশুতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে আকিকা আদায় করতে পারবে। (দুরারুল আহকাম ১/২৬৬) বড় পশু অর্থাৎ গরু, মহিষ, উট ইত্যাদিতে ছেলের জন্য এক শরিক আকিকা দিলেও তা আদায় হয়ে যাবে।

আকিকার গোশত : কোরবানির মতো আকিকার পশুর গোশতও তিন ভাগ করে এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য, এক তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনদের জন্য সদকা করে দিয়ে বাকি এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া সুন্নত। অবশ্য পরিবারের সদস্য বেশি হলে ইচ্ছা করলে সব গোশতও নিজেদের জন্য রেখে দেওয়া যায়। আকিকার গোশত সচ্ছল আত্মীয়-স্বজনকেও দেওয়া যায়। এখান থেকে আরেকটি বিষয় বুঝা গেল যে, আকিকার গোশত আকিকাদাতা স্বয়ং, যার জন্য আকিকা সে নিজে, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-অনাত্মীয়, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই আহার করতে পারবেন। কাঁচা গোশত হাদিয়া দিতে পারবেন অথবা রান্না করেও খাওয়াতে পারবেন।

মৃত বাচ্চার আকিকা : যেহেতু আকিকা করা হয় বিপদ-মুসিবত দূর করার জন্য, তাই মৃত বাচ্চার পক্ষ থেকে আকিকা করা সুন্নত। (আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫৩৬)

আকিকার পশুর চামড়া : কোরবানির মতোই আকিকার পশুর চামড়া গরিব-মিসকিনকে দিয়ে দেবে। নিজে ব্যবহার করলেও করতে পারবে। কিন্তু বাজারে বিক্রি করলে, বিক্রয়কৃত টাকা তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। চামড়া বা চামড়ার মূল্য কোনোটাই কসাইকে দেওয়া যাবে না।

আকিকার কুসংস্কার : অনেকেই মনে করে যে, আকিকার গোশত দাদা-দাদি ও নানা-নানি খেতে পারে না। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

সন্তানের মাথার চুল মুন্ডানোর জন্য যখন মাথার উপরের ক্ষুর টানা হবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আকিকার জন্তু জবাই করতে হবে, এটাও ভিত্তিহীন। মাথা মুন্ডানোর আগে-পরে যেকোনো সময় আকিকার পশু জবাই করা যাবে। হজরত আতা (রহ.)-এর এক বর্ণনা মতে, আকিকার পশু জবাই করার আগে মাথা মুন্ডিয়ে নেওয়া উত্তম। (আল মুকাদ্দামাতুল মুমাহহাদাত ১/৪৪৯)

হাদিয়া বা উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করা সুন্নত। কিন্তু আকিকার মতো ধর্মীয় ইবাদতকে এর সঙ্গে শর্তযুক্ত করা পবিত্র ও আনন্দঘন অনুষ্ঠানকে নিরানন্দ ও বিষাদময় করা মাকরুহ ও ক্ষেত্রবিশেষে হারাম।

আকিকা উপলক্ষে নবজাতকের নানার বাড়ির পক্ষ হতে কিছু পোশাক, খাবার ও সহায়ক সামগ্রী প্রেরণের বিষয়টিকে জরুরি মনে করা কুসংস্কার ও পরিষ্কার হারাম।
লেখক : মুহাদ্দিস জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণঞ্জ

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন