সোমবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১০ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ঝুঁঁকিপূর্ণ সিলেটের রেলপথ

তেল পরিবহনে লাভের চেয়ে ক্ষতিপূরণই বেশি সিলেট-আখাউড়া সেকশনের বিষফোঁড়া প্রায় ১৭৯ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন ও সেতু

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১২:০০ এএম

সিলেটের রেললাইনে বাড়ছে অহরহ ট্রেন দুর্ঘটনা। কখনো যাত্রীবাহী ট্রেন আবার কখনো তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলের তৈরি এই রেল লাইনগুলো বর্তমানে ঝুঁঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এতে বেড়েই চলেছে সিলেট-আখাউড়া সেকশনে ট্রেন দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বড় অঙ্কের। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি তেলবাহী ট্রেন প্রায়ই দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। এতে করে তেলের বাবদ রেল যা আয় করছে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে।

সিলেট-আখাউড়া সেকশনে প্রায় ১৭৯ কিলোমিটার রেলপথ ঝুঁঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। এতে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালানোর নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই রেলপথ এতটাই নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া সিলেট সেকশনে রেললাইনের পাশাপাশি রয়েছে বেশকিছু ঝুঁঁকিপূর্ণ রেল সেতু। এসব ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন ও সেতু রেলের বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে।

রেলওয়ের রেকর্ডপত্র বলছে ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রেলক্রসিংয়ে ৩১০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। গত বছর সিলেটে রেললাইনে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই থামছে না। যার ফলে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের কাছাকাছি বরমচাল এবং মাইজগাঁও স্টেশনের মাঝখানে গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় একটি তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এতে ট্রেনের ২০টি বগির মধ্যে ১০টি লাইনচ্যুত হয়। তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। লাইনচ্যুত হওয়ার পর ট্যাঙ্কার ফেটে অনেক তেল পড়ে যায়। স্থানীয়রা সে সব তেল সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।

এদিকে, গত বছরের নভেম্বর মাসেই ঘটেছে দুটি দুর্ঘটনা। এরমধ্যে গত ৭ নভেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সাতগাঁও স্টেশনে তেলবাহী ট্রেনের ৭টি বগি লাইনচ্যুত হয়। একই সাথে গত ১১ নভেম্বর সিলেটের মৌলভীবাজারের মধ্যবর্তী ভাটেরা নামক স্থানে মালবাহী ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
দুর্ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনা ঘটলেই বন্ধ হয়ে যায় ট্রেন চলাচল। দুর্ভোগে পড়েন ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীরা। সিলেটেই কেন বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে জানতে চাইলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদত আলি বলেন, একই অঞ্চলে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে এটি ঠিক। তবে এসব দুর্ঘটনাগুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে হচ্ছে। কখনো লাইনের সমস্যা, কখনো কোচের সমস্যা, কখনো বা যারা ট্রেন চালাচ্ছেন তাদের কারণেও দুর্ঘটনা হচ্ছে। সিলেটের লাইনগুলো পুরনো এবং লাইনে কিছুটা সমস্যা আছে। এ জন্য রেলের তরফ থেকে ট্রেন চালানোর বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া আছে। কতটা স্পিডে ট্রেন চালাতে হবে তার রেস্ট্রিকশন দেওয়া আছে। যেখানে ট্রেন ৬০ কিলোমিটার গতিবেগে চলার কথা ছিল সেখানে গতি কমিয়ে ৪০ থেকে ৩০ কিলোমিটার বেগে চলার নির্দেশ দেওয়া আছে।

দুর্ঘটনা ঘটলেই তদন্ত কমিটি করা হয় তারপরেও কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটছে? এমন প্রশ্নে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলেই তদন্ত হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদনে সময়মতো আমাদের কাছে আসে। তদন্ত কমিটির যে রিপোর্ট আসে সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরপরই বাস্তবায়ন করা যায় না, অফিশিয়াল কিছু প্রসিডিউর আছে সে অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়। সে ক্ষেত্রে কেউ অপরাধী হলে সব মিলিয়ে ১ থেকে ২ মাস সময় লাগতে পারে তার শাস্তি দিতে। তার মানে এই না যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বাস্তবায়ন হয় না।

ঝুঁঁকিপূর্ণ এই রেললাইন নিয়ে রেলের পরিকল্পনা কি জনতে চাইলে রেলের এই কর্মকর্তা বলেন, ব্রিটিশ আমলের সিলেটের এই লাইনটি নতুন করে করা হবে। তার জন্য চায়নার একটি প্রজেক্টও আছে। মোটামুটি একটা ভালো পর্যায়ে চলে আসছে প্রজেক্টটি। হয়তো কিছুটা সময় লাগবে এই রেললাইন নির্মাণ করতে। তবে সিলেটের রেললাইন পুরোপুরি নতুনভাবে তৈরি করা হবে।

অন্যদিকে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়ে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ট্রেন চলাচলের মূল সাপোর্ট হচ্ছে রেললাইন। সেই রেল লাইনেই যদি যেখানে পাথর থাকার কথা সেখানে পাথর না থাকে, স্লিপারগুলোও অনেক সময় নষ্ট অবস্থায় পাওয়া যায়। তাছাড়া রেললাইনের নিচের মাটিও অনেক সময় কমে যায়। ফলে ট্রেন লাইনচ্যুত হয় বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দুর্ঘটনায় এটি একটি কারণ হতে পারে। এছাড়াও আরও অনেক কারণ থাকতে পারে দুর্ঘটনার। তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রেল কর্তৃপক্ষের রেললাইনের ইনস্পেকশন বাড়াতে হবে। তাহলে দুুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তেলবাহী ওয়াগন দুর্ঘটনায় পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় রেল কর্তৃপক্ষের। একদিকে রেললাইন মেরামত। অন্যদিকে পরিবহনকৃত তেলের ক্ষতি পরিশোধ করতে হয় রেল কর্তৃপক্ষকে। কিভাবে তেলের ক্ষতিপূরণ পান এমন প্রশ্নে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মো. আইয়ুব হোসেন বলেন, রেলওয়ের সাথে আমাদের ট্রান্সপোর্টেশন এগ্রিমেন্ট আছে। তেল পরিবহনের সময় যদি কোন ক্ষতি হয় চুক্তি অনুযায়ী তার ক্ষতিপূরণ দেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আমরা শুধুমাত্র এই তেল পরিবহনের জন্য ভাড়া দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার সিলেটের তেলবাহী ওয়াগন দুর্ঘটনায় আমাদের (যমুনা) কোম্পানির তেল ছিল। পাশাপাশি আমার জানা মতে পদ্মা-মেঘনা কোম্পানির তেলও পরিবহন করা হচ্ছিলও এই ওয়াগনে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন