বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৩ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১, ১২:০১ এএম

এখন পর্যটনের ভর মৌসুম। দেশের প্রধান প্রধান পর্যটনকেন্দ্রসহ দুর্গম এলাকার স্পটগুলোতে ভ্রমণ পিপাসুদের ভিড় লেগেছে। লাখ লাখ মানুষ এসব কেন্দ্রে ভ্রমণ করছে। গত তিন দিন ছুটি থাকায় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ ও প্রধানতম পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে হাজার হাজার মানুষ ছুটে যায়। বিভিন্ন সমুদ্র সৈকত পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠে। এছাড়া, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুন্দরবনসহ দেশের নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এখন ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। শুধু দেশেই নয়, ভ্রমণপিয়াসীরা দেশের বাইরেও বেড়াতে যাচ্ছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকা, সবকিছু সচল এবং শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ায় মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে দল বেঁধে ঘুরতে বের হয়েছে। পর্যটকদের এই বিপুল আগমন সামাল দিতে হোটেল-মোটেল, রিসোর্টগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। মানসম্পন্ন হোটেল-মোটেলের বেশিরভাগ রুম আগামী জানুয়ারি- ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত বুকড হয়ে গেছে। ফলে আগাম বুকিং চেক না করে পর্যটন কেন্দ্রে গিয়ে অনেকে থাকার বিপাকে পড়ছে। অনেককে হোটেল-মোটেল না পেয়ে, সমুদ্র সৈকত, সড়কের পাশে গাড়িতে কিংবা পাহাড়ে তাবু টানিয়ে থাকতে হচ্ছে।


পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম একটি ইতিবাচক দিক। বিশেষ করে আভ্যন্তরীণ পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া শুভ লক্ষণ। করোনাকারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় খাতটি স্থবির হয়ে পড়ে। হোটেল-মোটেলগুলো ব্যাপক লোকসানের মুখোমুখি হয়। এতে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পর্যটন খাতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের। আয় করেছে ৯৫০.৭ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৪.৩ শতাংশ। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির জন্য পর্যটন খাতটি ব্যাপক সম্ভাবনাময়। সমস্যা হচ্ছে, এ খাতে পর্যটকদের জন্য যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও শৃঙ্খলা থাকা দরকার, তা খুবই অপ্রতুল। বিশেষ করে, যাতায়াত, থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক সংকট ও সমস্যা রয়েছে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোর হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলো ব্যাপকহারে রুম ভাড়া এবং খাবার-দাবারের দাম বৃদ্ধি করে দিয়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে সব ধরনের হোটেল-মোটেলের রুম ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত তিন দিনের ছুটিতে কক্সবাজারের কোনো কোনো হোটেলের ২ হাজার টাকার রুমের ভাড়া ১৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। ডাল-ভাত, আলুর ভর্তা দিয়ে ভাত খেতেও ৪০০ টাকা পর্যন্ত লেগেছে। সামগ্রিকভাবে খাদ্যমান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটতে পারে এমন আঁচ করতে পেরে একশ্রেণীর দালাল আগে থেকে নিজেদের নামে হোটেল রুম বুকিং করে ১ হাজার টাকার রুম ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা এবং অন্যান্য রুম তিনগুণ-চারগুণে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দিয়েছে। এতে যেসব পর্যটক হিসাব করে অর্থ নিয়ে গেছে, তাদের হিসাব ওলট-পালট হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে তাদের অনেককে এই বেশি অর্থ ব্যয় করে থাকতে হয়েছে, নয়তো বাইরে রাত কাটিয়ে ফিরতে হয়েছে। এমনিতেই দেশের সিংহভাগ মানুষের আয় কমে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে, গণপরিবহনের ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি। মানুষ যে কোথাও ঘুরতে গিয়ে স্বস্তিতে একটু নিঃশ্বাস ফেলবে, সে সুযোগটুকুও তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, পর্যটন অনেকটা মৌসুমী ব্যবসার মতো। শীতের সময়টাকে আমাদের দেশে পর্যটনের প্রধান মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ ভ্রমণে বের হয়। এ সুযোগে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফালোভী হয়ে থাকা-খাওয়ার দাম মাত্রাতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়। ফলে সীমিত বাজেটের পর্যটকরা বেড়াতে গিয়ে বিপাকে পড়ে। এ ধরনের অবস্থা অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক।

দেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের মাধ্যমে দেশের সম্মান বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, এবার আভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও, বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা খুবই কম। এর কারণ অজানা নয়। পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে আভ্যন্তরীণ পর্যটকরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, বিদেশিদেরও অনেক সময় একই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এটা পর্যটনের জন্য নেতিবাচক দিক। এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে। পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার যেসব সমস্যা বিরাজমান, তা দূর করতে পর্যটন মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। যেসব হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট রুম ভাড়া ও খাবারের অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকরা যাতে স্বাচ্ছন্দে থাকতে ও চলাফেরা করতে পারে এবং নিরাপদ বোধ করে, এজন্য সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা নাহলে, পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হবে। এতে পর্যটনের ক্ষতি হবে।
ক্ষতি হবে অর্থনীতির।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন