সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯, ২৬ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

বিএনপি কি আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কৌশল মোকাবিলা করতে পারবে?

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ২০ মে, ২০২২, ১২:০৩ এএম

গত ৭ মে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সার্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কর্যানির্বাহী সংসদের বৈঠকে আগামী জাতীয় নির্বাচন কিভাবে এবং কেমন হবে, তার একটি ধারণা পাওয়া গেছে। বৈঠকে বলা হয়, আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে। বিশেষ করে বৃহত্তম বিরোধীদল বিএনপিকে কিভাবে নির্বাচনে আনা যায়, এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে। নির্বাচন হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ। বিরোধীদলের সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে দেয়া হবে। দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়, আগামী নির্বাচন হবে কঠিন থেকে কঠিনতর।
আগামী নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের এমন আলোচনা পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে ইতোমধ্যে দেশের মানুষ জেনেছে। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে আগামী নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের এমন মনোভাব ইতিবাচক মনে হতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে এ বার্তা পৌঁছানো, আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচন সবদলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে বদ্ধপরিকর। সাধারণত নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে দেশের মানুষের সামনে রাজনৈতিক দলগুলো যে বক্তব্য তুলে ধরে, তার পেছনেও লুকিয়ে থাকে ভিন্ন বক্তব্য। যেটা সাধারণ মানুষ জানে না। স্বাভাবিক রাজনীতিতে নির্বাচনী কৌশল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে বিগত এক যুগের অধিক সময় ধরে এই স্বাভাবিক রাজনীতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। দেশের রাজনীতির চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। ক্ষমতাসীনদল ও বিরোধীদলের মধ্যে যে স্বাভাবিক রাজনীতি থাকার কথা, তা উধাও হয়ে গেছে। ভারসাম্য বলতে কিছু নেই। কেবল ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র আধিপত্য। দলন-পীড়নের মাধ্যমে বিরোধী রাজীনিতিকে কোনঠাসা করে ফেলা হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন বিতর্কিত আইন করে সংবাদপত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও সংকুচিত করা হয়েছে, কিংবা সরকারের রোষানল এড়াতে নিজেরাই সংকোচন নীতি অবলম্বন করে চলেছে। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলকে দেশে-বিদেশে যথেষ্ট সমালোচনা ও বদনামের ভাগিদার হতে হয়েছে এবং হচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের দেড় বছরের মতো বাকী। এ প্রেক্ষিতে, ক্ষমতাসীন দলের আচরণে কিছুটা নমনীয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। নির্বাচন অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করার কথা বলা হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে, বিগত যে দুটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সে ক্ষমতাসীন হয়েছে, তা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ছিল না, তা স্বীকার করে নিচ্ছে। তা নাহলে, এ কথা বলার প্রয়োজন হতো না।
দুই.
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি যে অত্যন্ত বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য ছিল, বোধ করি ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেও এ নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। যে নির্বাচনে বিনাভোটে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়, তা কোনো সচেতন মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এমন ইতিহাস বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। ইতিহাস নেই বলে যে হবে না, এমন গ্যারান্টি দেয়া যায় না। ‘সু’ অথবা ‘কু’ যেটাই হোক না কেন, ঘটনার মধ্য দিয়ে সে ইতিহাস সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে বিনাভোটে সরকার গঠন করার মতো নির্বাচন হয়ে একটি ‘কু’ ইতিহাস রচিত হয়েছে। এতে ক্ষমতাসীন দল বিন্দুমাত্র লজ্জিত হয়নি। বরং বিরোধীদলকে দমন করে পাঁচ বছর কাটিয়ে দেয়। ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন করবে না বলে ২০১৪ সালের যে নির্বাচন বিরোধীদল বিএনপি ও তার জোট বর্জন করেছিল, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে সেই ক্ষমতাসীন দলের অধীনেই তারা অংশগ্রহণ করে। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল পুনরায় জয়লাভ করার এমন কৌশল অবলম্বন করে যে, বিরোধীদল ঘুর্ণাক্ষরেও তা টের পায়নি। নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালটবক্স ভর্তি করে নিজের বিজয় সুনিশ্চিত করে ফেলে। পরদিন শুধু লোক দেখানো শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখিয়ে দেয়। এ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হলেও ক্ষমতাসীন দল তাতে গা করেনি। এ দুটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কৌশল ছিল অভিনব ও চমকপ্রদ। প্রথমটি ছিল, জোরজবরদস্তি ও ক্ষমতার দাপটের। দ্বিতীয়টি ছিল, শান্তিপূর্ণ চালাকির। এতে ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও তার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। এটা সে নিজেও জানে। সামনে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন। এটিও ক্ষমতাসীন দল তার অধীনেই করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যদি তাই হয় তবে, স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায়, এ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সে নিশ্চিতভাবেই নতুন কোনো কৌশল অবলম্বন করবে, সেটাই স্বাভাবিক। সে কৌশল কী হবে, তা নির্বাচন শেষ না হওয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অজানাই থেকে যাবে। প্রাথমিকভাবে ক্ষমতাসীন দল যে কথা বলেছে, তাতে অনেকের মনে হতে পারে, ইভিএমে ভোট অনুষ্ঠানের বিষয়টি তার একটি কৌশল। এর মাধ্যমে ভোটের ফলাফল পাল্টে দেয়া যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, যেকোনো মেশিন কিভাবে চলবে তা নির্ভর করে তার পরিচালকের ইচ্ছা অনুযায়ী। কম্পিউটারে যেমন বিভিন্ন বিষয়ে প্রোগ্রামিং করা থাকে এর বাইরে কম্পিউটার যেতে পারে না, তেমনি ডিজিটাল মেশিনের ক্ষেত্রেও প্রোগ্রাম সেট করা যায়। আমরা যদি ডিজিটাল ঘড়ির সময় নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দুই-তিন বা তার চেয়েও বেশি সময় বাড়িয়ে দেই তাহলে তা সেভাবেই চলবে। এ সরকারের আমলেই ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে দেয়া হয়েছিল। একইভাবে যদি ইভিএমে এমনভাবে প্রোগ্রামিং করা হয়, দশ ভোট একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে পড়বে তারপর বিভিন্ন প্রতীকে পড়বে, তাহলে তা তাই করবে। এভাবে দশ ভোট অন্তর ভোটের প্রোগ্রামিং করলে, তার বাইরে মেশিন কাজ করবে না। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে তার পরিচালকের ওপর। এছাড়া জোরজবরদস্তির তো ব্যাপার রয়েছে। ভোটার বুথে ঢুকে ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার পর মার্কা চলে আসলে সেখানে উপস্থিত ক্ষমতাসীন দলের লোকজন তাদের মার্কায় সুইচ টিপে দিতে পারে। এতে ভয়ে ভোটারের কিছু বলার থাকবে না। ইভিএমের জটিলতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকায় উন্নত বিশ্বেও তা ব্যবহার করা হয় না বললেই চলে। সবাই ব্যালটেই ভোট গ্রহণ করে। এখন আমাদের দেশে ক্ষমতাসীন দল ইভিএম ব্যবহার করতে চাচ্ছে কেন, এ প্রশ্নের জবাব বোধকরি দেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এনে ক্ষমতাসীন দল আসল কৌশল আড়াল করে রেখেছে কিনা, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ক্ষমতাসীন দল ইভিএম ব্যবহারের ইস্যুটি সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে বিরোধীদলগুলো এ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে। এই ব্যস্ততার আড়ালেই ক্ষমতাসীন দল তার আসল কৌশল পাকাপোক্ত করে ফেলবে।
ক্ষমতাসীন দল আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার যে কথা বলেছে তা সচেতন মানুষের বিশ্বাস করার সুযোগ খুব কম। তারা কি দেখেনি, বিগত দুটি নির্বাচন তার অধীনে কেমন হয়েছে? সেগুলো কি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ছিল? আমাদের দেশে কি কেউ নিজে ক্ষমতায় থেকে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়? এমন নজির কি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের মধ্যে কেউ সৃষ্টি করতে পেরেছে? তাহলে, কি করে ক্ষমতাসীন দল বলে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে? তাছাড়া, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হলে তো সবদলের অংশগ্রহণ বিশেষ করে বৃহত্তম বিরোধীদল বিএনপি’র অংশগ্রহণ জরুরি। বিএনপি কি তার অধীনে আরেকটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে? ফলে আগামী নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত তার অধীনে বিরোধীদলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত ইভিএমে ভোটগ্রহণে বিরোধীদলগুলোকে রাজী করা। সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিরোধী দলগুলোর কারোই সরকার এবং ইভিএমের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস নেই।
তিন.
বিএনপি বিগত কয়েক বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন করবে না বলে ঘোষণা দিয়ে আসছে। সর্বশেষ গত ঘোষণা দিয়েছে গত বছর। বিগত কয়েক মাস ধরে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবী নিয়ে সভা-সমাবেশ করছে। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভার পর এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি’র মহাসচিব বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের কথা পরিস্কার, আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগ না করলে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে নির্বাচনের কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।’ অন্যদিকে, নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের বক্তব্যকে বিএনপি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছে। দলটি মনে করছে, বিএনপিকে নির্বাচনে আনা, সভা-সমাবেশ করার সুযোগ দেয়া এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার আশ্বাস সরকারি দলের একটি কৌশল। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও এমন আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। সরকার রাতের আঁধারে নির্বাচন করেছে। দুই দুইটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে ক্ষমতাসীন দলের কোনো আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি আর বিশ্বাস করা যায় না। দলটির এই মনোভাব ও বক্তব্য ঠিকই আছে। ক্ষমতাসীন দল যেভাবেই হোক, নামকাওয়াস্তে একটি নির্বাচন দেখিয়ে এবং তাতে জিতে ক্ষমতায় থাকার কৌশল করবে ও করছে, এটাই স্বাভাবিক। এমন নজির ইতোমধ্যে দেখিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কেন তার কৌশল ধরতে পারেনি? ক্ষমতাসীন দলের কৌশলের কাছে কেন বারবার পরাস্ত হবে বা ফাঁদে পা দেবে? তার কি নিজস্ব কোনো কৌশল নেই? ইতোমধ্যে সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপি ও গুরুত্বপূর্ণ নেতারা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে আসবে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির কাছে বিএনপি শিশু। তাদের এ বক্তব্য বিএনপি’র সাধারণ সমর্থকদের অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য। তারা মনে করছে, আওয়ামী লীগ কখন কি কৌশল অবলম্বন করে বা করবে তা বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ধরতে পারে না। এতেই দলটি বারবার পরাজয় বরণ করছে। অনেকের আবার এমন ধারণাও রয়েছে, বিএনপি’র এই পরাজয়ের কারণ দলের প্রথম সারির কিছু নেতার দলের প্রতি আনুগত্য না থাকা। নিজেদের মামলা-মোকদ্দমা ও ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষার জন্য এবং সরকারের সুবিধা নিয়ে তারা আঁতাত করে চলে। দলটির সমর্থকদের এ ধারণা অমূলক নয়। তারা দেখেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়ার ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে রাজপথে প্রথম সারির কোনো নেতা অংশগ্রহণ করেনি। আন্দোলনের ডাক দিয়ে যদি নেতারা মাঠে না থাকেন, তাহলে সে আন্দোলন কখনোই সফল হয় না। আন্দোলন করতে হলে নেতা-কর্মীদের সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন সইতে হয় এমনকি জীবনও দিতে হয়, এটা সব দেশেই দেখা যায়। সরকারের নির্যাতনের ভয়ে যদি বিরোধীদল রাজপথে নেমে আন্দোলন না করে, তাহলে কোনো দিনই সরকারকে দাবী মানানো সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ বিরোধীদলে থেকে দেখিয়েছে, কিভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দাবী মানতে বাধ্য করতে হয়। ক্ষমতায় থেকে বিরোধীদলকে কিভাবে ও কোন কৌশলে মোকাবেলা করতে হয়, তাও দেখিয়েছে। এ কারণেই সে বিএনপিকে তার কৌশলের কাছে শিশু বলে আখ্যায়িত করতে পারছে। ক্ষমতাসীন দল কিভাবে বলে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে আসবে, এ কথা কি বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা বুঝতে পারছেন? হ্যাঁ, বিএনপির একশ্রেণীর সুবিধাবাদী নেতা নিশ্চিতভাবে এ কথা বুঝতে পারছেন। কারণ, সরকার তাদের দিয়েই বিএনপিকে দুই টুকরো করে নির্বাচনে নিয়ে আসবে, এমন একটি কথা রাজনৈতিক অঙ্গণে ইদানিং বেশ আলোচিত হচ্ছে। এমনও কথা ভেসে বেড়াচ্ছে, বিএনপি’র প্রায় অর্ধ শতাধিক সুবিধাবাদী নেতাকে সরকার ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এমপি বানিয়ে দেখাবে বিএনপি নির্বাচনে এসেছে। সরকার যদি কোনো রাখঢাক না করেই এই পন্থা অবলম্বন করে, তখন বিএনপি’র মূল অংশ কি করবে? ২০১৮ সালের নির্বাচনে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। বিএনপি সংসদে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বিএনপি’র যে আট-নয় জন এবং ধানের শীষ নিয়ে জোটের অন্যরা জিতেছিল, তারা বেঁকে বসেছিল। তারা সংসদে যোগ দেবে এমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে বসে থাকে। ফলে বিএনপিকে বাধ্য হয়ে সংসদে যোগ দিতে হয়। বিএনপি তার আট-নয়জন এমপিকে যেখানে সংসদে যোগ দেয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি, সেখানে যদি সরকার বিএনপি’র ব্যানারে অর্ধ শতাধিক এমপি নির্বাচিত করিয়ে সংসদে নিয়ে আসে, সেটা ঠেকাবে কিভাবে? ক্ষমতাসীন দলের এই প্রকাশ্য-গোপন কৌশল কি বিএনপি মোকাবেলা করতে পারবে? আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে ঘায়েল করার জন্য ক্ষমতাসীন দলের হাতে সবচেয়ে বড় একটি অস্ত্র হচ্ছে, বিএনপি’র শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে ক্ষমতাসীন দল ততই মামলাগুলো সচল করে তুলবে। এখনই সেই আলামত দেখা যাচ্ছে। বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের মামলা-মোকদ্দমা চাঙ্গা করতে শুরু করেছে। এর জেরে অনেককে হয়তো গ্রেফতারও করা হবে। নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কোনো কোনো নেতা গ্রেফতারও হতে পারে। তখন নেতৃত্বের যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেবে কিভাবে? এমন পরিস্থিতিতে, বিএনপিকে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন না করা এবং নিরপেক্ষ সরকারের দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমত, দলের অখণ্ডতা রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, মামলা-মোকদ্দমা মোকাবেলা করা। তৃতীয়ত, এসব সংকট সামনে রেখে আন্দোলন জোরদার করা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা বিএনপি কিভাবে করবে, তাই এখন দেখার বিষয়।
চার.
করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। এই মন্দার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া এবং তা সামাল দিতে না পারায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পাকিস্তানে ইমরান খান সরকারের পতন হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষকে জনরোষে বিদায় নিয়ে পালাতে হয়েছে। আমাদের দেশেও অর্থনৈতিক মন্দার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। এ নিয়ে জনঅসন্তোষ বিরাজ করছে। তার ওপর কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাকস্বাধীনতার সংকোচন, রাজনৈতিক অধিকার খর্ব, র‌্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনা হচ্ছে। এসব বিষয় ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিব্রতকর ও চ্যালেঞ্জের বিষয়। এতে বিরোধীদলের রাজনীতির জন্য কিছুটা হলেও সুবিধাজনক অবস্থান সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় তারা যদি যৌক্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, হয়তো তারা সাফল্যের মুখ দেখলেও দেখতে পারে। তবে সরকার যেহেতু আওয়ামী লীগের, তাই সে জানে এসব বিষয় কিভাবে মোকাবলো করতে হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সরকারের কাছে আগামী নির্বাচনে জনগণের সামনে তার উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে, জনগণের সামনে তুলে ধরার মতো বিএনপি’র কি রয়েছে, তা এখনো পরিস্কার নয়। কিভাবে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিভাবে হবে, রাজনীতির ধারাটিই বা কি হবে, এসব বিষয় দলটি এখনও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি। এসব বিষয় যদি দলটি জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারে তাহলে হয়তো সফল হলেও হতো পারে।
darpan.journalist@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (3)
আকিব ২০ মে, ২০২২, ৫:৩৩ এএম says : 0
দেশে সবচেয়ে বেশি জনমত থাকার পরও বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারছে না। এর প্রধান কারণ তাদের নিজেদের মাঝেই ঐক্য নেই। নয়তো এখন দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি।
Total Reply(0)
আকিব ২০ মে, ২০২২, ৫:৩৫ এএম says : 0
সরকারের উপর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এবার বিশ্বের অনেক চাপ আছে। এবার যদি বিএনপি ভালো ভাবে আন্দোলন করতে পারে তাহলে তারা ক্ষমতায় আসা অনেক সহজ হবে।
Total Reply(0)
আকিব ২০ মে, ২০২২, ৫:৩৫ এএম says : 0
আমি মনে করি এবার তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps