শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৬ আশ্বিন ১৪২৯, ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

ধর্ম দর্শন

ক্রেডিট-ডেবিট কার্ড : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ২৮ জুলাই, ২০২২, ১২:০৩ এএম

কাগজি নোট আবিস্কারের আগে বিত্তবানদের ধাতবমুদ্রার ওজন বহন ও সংরক্ষণের বিড়ম্বনার ইতিহাস সকলেরই জানা। তারো আগে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ছিল খাদ্যদ্রব্য। যেমন কারো ২ গজ কাপড় দরকার হলে তাকে বাড়ি থেকে ২ মন ধান নিয়ে দোকানী থেকে এর বিনিময়ে কাপড় সংগ্রহ করতে হত। কিন্তু এসব কিছুতেই ইতিহাস বানিয়ে দিয়েছে আধুনিক যুগের কাগজি মুদ্রা। কিন্তু আজকের সহজপ্রিয় মানুষ এই কাগজি টাকার সহজ বোঝাও আর বইতে রাজি নয়। তাই আগের যুগের বিনিময় মাধ্যমগুলোর তুলনায় কাগজি টাকা অনেক হালকা, সহজে বহনযোগ্য ও সুবিধাজনক হলেও এর চেয়ে আরো সহজ কিছু উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা চলছেই। কারণ টাকার সংখ্যা অনেক বেশি হলে তা স্থানান্তরও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত নিরাপত্তার দিকটি তো রয়েছেই। এসব সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যেই প্রচলন ঘটেছে ইলেক্ট্রিক মানি তথা ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড ও এটিএম কার্ড জাতীয় বৈদ্যুতিক মুদ্রার। আজকের আলোচনায় এ সকল কার্ড ব্যবহারের ইসলামের আলোকে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

ক্রেডিট কার্ড ঃ বড় বড় তিনটি আন্তর্জাতিক কোম্পানী ভিসা, মাষ্টার ও আমেরিকান এক্সপ্রেস, ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। তাদের লাইসেন্স নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও অনেকগুলো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড চালু করেছে। ক্রেডিট কার্ড মূলত বাকিতে কেনাকাটা করা এবং প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ ধার নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত একজন ব্যক্তির আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে এ কার্ড সরবরাহ করে থাকে। এ কারণে একেকজনের ক্ষেত্রে ক্রেডিট লিমিট হয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন অংকের। কার্ডহোল্ডার তাকে দেওয়া লিমিট অনুযায়ী বাকিতে নির্ধারিত অংকের কেনাকাটা করতে পারে এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে সে টাকা ব্যাংককে পরিশোধ করার সুযোগ থাকে। এই মেয়াদ সাধারণত ১৫ দিন থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণের সুবিধার্থে নিম্নে ক্রেডিট কার্ডের কিছু নিয়ম উল্লেখ করা হল।

ক্রেডিট লিমিট ঃ এই কার্ড হোল্ডারের নাম ইস্যুকারী ব্যাংক একটি একাউন্ট খুলে থাকে; যাকে বলা হয় কার্ড একাউন্ট। এই একাউন্টে ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাকে একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হয। যেমন ৫০ হাজার, এক লক্ষ ইত্যাদি। কার্ডধারী ব্যক্তি এই কার্ড দেখিয়ে ওই পরিমাণ টাকার পণ্য ক্রয় করতে পারে এবং ইচ্ছা করলে ওই নির্ধারিত একাউন্টের ৫০% টাকা নগদও উত্তোলন করতে পারে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঠিক করা ওই একাউন্টকে বলা হয় ক্রেডিট লিমিট।

পণ্য ও সেবা ক্রয় ঃ ক্রেডিট কার্ড দ্বারা কেবল ওই সকল দোকান বা মার্কেট থেকেই কেনাকাটা করা যায় যাদের সাথে কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংকের চুক্তি থাকে। উন্নত বিশ্বে অধিকাংশ বিপনী ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে এই কার্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও আমাদের দেশে এখনো তা ব্যবহারের পরিধি উন্নত কিছু দোকান-মার্কেট, হোটেল- রেস্তোরা ও এয়ারলাইনসের মধ্যেই সীমিত রয়েছে। তবে ক্রমান্বয়ে ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংক, এর ব্যবহারকারী ও ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দোকানী থেকে ব্যাংকের ফি গ্রহণ ঃ কার্ডহোল্ডার ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা খরিদের পর ইস্যুকারী ব্যাংক ওই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহারকৃত অংকের টাকা দুই-তিন দিনের মধ্যেই পরিশোধ করে থাকে। তবে এ সকল প্রতিষ্ঠান থেকে ইস্যুকারী ব্যাংক নির্ধারিত হারে ফি নিয়ে থাকে; যা সাধারণত ব্যবহারকৃত টাকার ১ থেকে ৩ শতাংশ হয়ে থাকে।

দোকানী কর্তৃক কার্ডহোল্ডার থেকে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ ঃ সাধারণত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের জন্য কার্ড হোল্ডারকে অতিরিক্ত অর্থপ্রদান করতে হয় না; বরং সাধারণ বাজার মূল্যেই সে কেনা-কাটা করতে পারে। কারণ কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংককে দোকানী কর্তৃক কমিশন প্রদান করা লাগলেও যে দোকানে এ সুবিধা থাকে সেখানে বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যায়। এবং গড় হিসেবে এটি লাভজনক হয়ে থাকে। তবে কোন কোন ছোট দোকানদার অথবা খুবই স্বল্প লাভ করে থাকে (যেমন১-৩%) এমন প্রতিষ্ঠানকার্ডে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩% চার্জ করে থাকে। তাদের দাবী হচ্ছে, ব্যাংক তাদের থেকে যে ৩% কমিশন নিয়ে থাকে সেটিই তারা গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিচ্ছে।

বিল পরিশোধ ঃ মাসের ১টি নির্ধারিত তারিখে ব্যাংক তার কার্ড মেম্বার বরাবরে বিল প্রেরণ করে থাকে। বিল তৈরীর আগ পর্যন্ত যত টাকার কেনাকাটা করা হয়েছে বা যত টাকা খরচ করা হয়েছে তার পুরো হিসাব এতে থাকে। প্রতিবেদন আকারে তৈরী ওই বিলে আরো উল্লেখ থাকে কত তারিখের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে হবে। গত মাসের বিল-তারিখের পরে কোন টাকা পরিশোধ করে থাকলে তার বিবরণ এবং আরো প্রয়োজনীয় তথ্য।

চার্জ ঃ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী সকল গ্রাহককে মূলত ১টি চার্জই পরিশোধ করতে হয়। তা হল বার্ষিক ফি। তবে কোন কোন সময় এ ফি’র ক্ষেত্রেও ছাড় দেওয়া হয়ে থাকে। আর বার্ষিক ফি’র সাথে আমাদের দেশে ১৫% ভ্যাটও যোগ হয়।

এছাড়া কার্ড ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে আরো কিছু চার্জওব্যাংক কর্তৃক কার্ড মেম্বার থেকে নেওয়া হয়ে থাকে। যেমন- নির্ধারিত তারিখে (মিনিমাম ডিও প্রদানের তারিখ) বিল না দিলে নির্ধারিত অংকের জরিমানা।

ফাইনান্সিয়াল চার্জ ঃ প্রতি মাসের ক্রেডিটকার্ড বিল যদি নির্ধারিত দিনের মধ্যে পুরো জমা করে দেওয়া হয় তবে এ জন্য কোন অতিরিক্ত চার্জ ব্যাংকে প্রদান করতে হয় না। কিন্তু যদি আংশিক বিল প্রদান করা হয় (ব্যাংক থেকে এ ধরনের সুযোগ গ্রাহককে দেওয়া হয়ে থাকে) তবে নির্ধারিত দিনের পর যে টাকা বকেয়া থাকবে তার উপর ব্যাংক মাসিক ভিত্তিতে ২/৩% ফাইনান্সিয়াল চার্জ এর নামে কার্ডহোল্ডার থেকে নিয়ে থাকে।

ক্যাশ এ্যাডভান্স ঃ কার্ড ব্যবহারকারী তার ক্রেডিট লিমিটের ৫০% টাকা ব্যাংকের যে কোন শাখা অথবা এটিএম বুথ থেকে নগদে উত্তোলন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ওই টাকা পরিশোধের তারিখের আগ পর্যন্ত সময়ের জন্য ২-৩% সুদ আদায় করতে হয়।

শরঈ দৃষ্টিকোণ ঃ ক্রেডিট কার্ডের বিষয়টি নতুন মাসআলা হওয়ার এ সংক্রান্ত শরীয়তের হুকুম কী হতে পারে তা নির্ণয়ের জন্য বর্তমান যুগের ফকীহগণ অনেক আগে থেকেই একক ও সম্মিলিত গবেষণা করেছেন। ওআইসি ফিকহ একাডেমীতে এ বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে বেশ কিছু প্রবন্ধ পেশ করা হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনার পর ফয়সালাও করা হয়েছে। এছাড়া আরবের ও আমাদের এ অঞ্চলের আরো কয়েকজন ফকীহ এ বিষয়ে প্রবন্ধ বা পুস্তিকা লিখেছেন। তাদের মতামতের সারকথা হল, কিছু শর্ত সাপেক্ষে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা জায়েয। মাসআলার দিক থেকে ক্রেডিট কার্ডের যে সকল বিষয় আলোচনায় আসে সেগুলো হল, ক্রেডিট লিমিট, দোকানী থেকে ব্যাংকের কমিশন গ্রহণ, দোকানী কর্তৃক (ক্ষেত্র বিশেষে) কার্ডহোল্ডার থেকে অতিরিক্ত চার্জ গ্রহণ, ফাইনান্সিয়াল চার্জ, রিওয়ার্ড ও ক্যাশব্যাক ইত্যাদি। এখানে সংক্ষেপে সেগুলোর হুকুম তুলে ধরা হল।

ব্যাংক ও কার্ডহোল্ডারের মাঝে লেনদেন ঃ কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংক কার্ডমেম্বার থেকে যে সকল চার্জ নিয়ে থাকে তার মধ্যে একটি হল ‘বার্ষিক ফি’ একথা সুস্পষ্ট যে, এ ব্যাপারে শরীয়তের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। এ কারণ ব্যাংক কার্ডধারী ব্যক্তিকে এ ব্যাপারে যে সকল সার্ভিস প্রদান করে থাকে তার বিনিময় হিসেবেই এ ফি নিয়ে থাকে।
কার্ড ব্যবহারকারী থেকে ব্যাংক ফাইনান্সিয়াল চার্জ বা ইন্টারেস্ট নামে যে অর্থ নিয়ে থাকে তা ওই সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা নির্ধারিত দিনে পুরো টাকা আদায় করে না। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে, ওই টাকা ব্যাংক কর্তৃক বিক্রেতাকে পরিশোধ করা টাকার সুদ হিসাবে। অতএব এ টাকা দেওয়া নেওয়া কোনটাই জায়েয নয়। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডের বিল আদায়ে এত বিলম্ব করা যাবে না, যে কারণে এর উপর ফাইনান্সিয়াল চার্জ তথা সুদ আরোপিত হয়। (চলবে)

লেখকঃ শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন