বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরী

ধর্ম দর্শন

ক্রেডিট-ডেবিট কার্ড : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ৪ আগস্ট, ২০২২, ১২:২৭ এএম

পূর্ব প্রকাশিতের পর
ক্যাশ এ্যাডভান্স ঃ আগেই বলা হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা কেনাকাটার পাশাপাশি এ কার্ড দ্বারা নগদ টাকাও উত্তোলন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে তাকে ডেইলি এ্যাভারেজ ভিত্তিতে ২-২.৫% সুদ আদায় করতে হয়। সুতরাং ক্রেডিট কার্ড দ্বারা নগদ টাকা গ্রহণ করা যে হারাম তা বলাই বাহুল্য।

দোকানী ও কার্ডহোল্ডার ঃ আগেই বলা হয়েছে, যে সকল বিপণী বিতান অথবা বিভিন্ন সেবা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে ক্রেডিটকার্ড গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে তাদের অধিকাংশই নগদ বিক্রয় এবং কার্ডের মাধ্যমে বিক্রি একই মূলে করে থাকে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান কার্ডের বিক্রির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২-৩% চার্জ করে থাকে। এ অতিরিক্ত অংশের ব্যাপারে বর্তমান সময়ের ফকীহগণ গবেষণা করে একাধিক মত প্রদান করেছেন। তাঁদের অধিকাংশের মত হল অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার কারণে ওই বেচাকেনা নাজায়েয হবে না এবং এটি সুদের আওতায়ও পড়বে না। কারণ এখানে কার্ডহোল্ডার তার কাছ থেকে কোন ঋণ নেয়নি যার সুদ দোকানী তার কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারে। আসলে এ অতিরিক্ত টাকা পণ্যমূল্যেরই অংশ। যেমনিভাবে বাকিতে কোন জিনিস কিনতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে মূল্য বাড়িয়ে নেওয়া হয়, তেমনি এ ক্ষেত্রেও ক্রেডিটে খরিদের কারণে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে। সুতরাং এটি নাজায়েয নয়। অবশ্য কোন কোন ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডে মূল্য পরিশোধ করলে ৫% বা ১০% বা এর কমবেশি ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। এটি মূলত করা হয় ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির মাধ্যমে, যেন এ উসিলায় কার্ড ব্যবহারকারীরা এ প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি বেশি কেনাকাটা করতে আগ্রহী হয়। শারীয়তের দৃষ্টিতে এ ডিসকাউন্ট প্রদানে কোন আপত্তি নেই।

রিওয়ার্ডস ঃ কোন কোন কার্ড ইস্যুকারী তাদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ভাবে পুরস্কৃত করে থাকে। কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করা টাকার পরিমাণের ভিত্তিতে সাধারণত এ পুরস্কারগুলো দেওয়া হয়ে থাকে। ব্যাপারটি বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে, এটি বিশেষ কোন কার্ডধারী নয়; বরং সকলেই পেয়ে থাকে। এবং কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান কার্ডের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য তাদের আয়ের কিছু অংশ কার্ড হোল্ডারদের পুরস্কার প্রদানের খাতে ব্যয় করে থাকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এতে মাসআলাগত কোন সমস্যা নেই। তবে কার্ড ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য হতে হবে কেনাকাটা, পুরস্কার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকা উচিত নয়।

ভ্যাট ও ট্যাক্স ঃ এতদিন পর্যন্ত আমাদের দেশে শুধু ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক ফি’র উপর ১৫% ভ্যাট নিত সরকার। কিন্তু চলতি অর্থ বছরের বাজেটে ক্রেডিট কার্ডের যে কোন ট্রাঞ্জেকশনের উপর ৩% অগ্রিম ট্যাক্স আদায়ের বিধান করা হয়। এ ধরনের ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপ শরীয়তের দৃষ্টিতে অনধিকার চর্চা ও জুলুমের অন্তর্ভূক্ত হলেও এর কারণে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা নাজায়েয হবে না।

ক্যাশব্যাক ঃ সম্ভবত নব আরোপিত ট্যাক্সের প্রভাবে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কমে যাওয়ায় কোন কোন ব্যাংক তাদের ক্রেডিট ব্যবহারকারীদের জন্য ঘোষণা করেছে ক্যাশ ব্যাক প্রোগ্রাম। কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করলে কিছু শর্ত সাপেক্ষে তারা ট্রাঞ্জেকশন এমাউন্টের ১-৫% পর্যন্ত কার্ড হোল্ডারের একাউন্টে জমা দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। তাদের এ সংক্রান্ত প্রচারপত্র ও শর্তাবলী দেখে বুঝা যাচ্ছে, এটিও এক ধরনের শর্তযুক্ত পুরস্কার, যার মাধ্যমে কার্ডের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সুতরাং এর হুকুম হবে উপরোক্ত রিওয়ার্ডস প্রোগ্রামের মত।
দোকানী থেকে ব্যাংকের কমিশন গ্রহণ ঃ হোটেল, রেস্তোরা, দোকান ও মার্কেটসহ যে সকল প্রতিষ্ঠানে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের সুযোগ রয়েছে তাদের থেকে কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংক একটি নির্ধারিত পরিমাণে (সাধারণত ১-৩%) চার্জ নিয়ে থাকে। কার্ড দ্বারা পরিশোধিত এমাউন্টের উপর এ চার্জ নির্ধারিত হয়ে থাকে। উক্ত টাকার হুকুম শরীয়তের দৃষ্টিতে কী হবে এ নিয়ে গবেষক ফকীহ আলেমদের ২টি ভিন্নমত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি ব্যাংক কর্তৃক দোকানীকে অগ্রিম পরিশোধ করে দেওয়া টাকার (যা কার্ড হোল্ডার থেকে ব্যাংক নির্ধারিত মেয়াদের পর নিবে) উপর একটি চার্জ, যা সুদের নামান্তর। সুতরাং এ টাকা গ্রহণ করা জায়েয নয়। পক্ষান্তরে অন্য ফকীহদের মতে এটি সুদের আওতায় পড়ে না। কারণ এখানে দোকানী ব্যাংক থেকে কোন ঋণ নিচ্ছে না; যার জন্য সে সুদ প্রদান করবে। এ শ্রেণীর আলেমদের মতে এটি হল ব্যাংকের পক্ষ থেকে দোকানীকে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করা এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় মেশিনারী সরবরাহের চার্জ স্বরূপ। সুতরাং এটি নাজায়েয নয়। অবশ্য এ মাসআলার হুকুম যাই হোক তা কার্ড হোল্ডার ও কার্ড ইস্যুয়ার এর মাঝের কারবারের হুকুমে প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে হয়।

সার সংক্ষেপ ঃ ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত উপরের আলোচনার সারকথা হল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে বর্তমান যুগের ফকীদের উত্থাপিত প্রবন্ধ ও সিদ্ধান্তবলীর আলোকে এ কার্ড ব্যবহার করা কিছু শর্ত সাপেক্ষে জায়েয। শর্তগুলো হল-

ক্রেডিট কার্ডের সকল বিল ‘মিনিমাম ডিও’ তারিখের মধ্যে অবশ্যই পরিশোধ করে দিতে হবে। কোন টাকা বাকি রাখা যাবে না।

কার্ডের মাধ্যমে কোন ক্যাশ এ্যাডভান্স নেওয়া যাবে না। কারণ নগদ টাকা উত্তোলনের অর্থই হল ব্যাংক কর্তৃক সুদ আরোপিত হওয়া।

ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কখনো কোনভাবেই এমন কারবারে অংশগ্রহণ করা যাবে না, যা সুদের অন্তর্ভূক্ত। যদি কার্ড ইস্যুকারী কর্তৃক নতুন কোন সুযোগ সুবিধার কথা ঘোষিত হয়- যা মাসআলার দিক থেকে সন্দেহজনক, তবে অবশ্যই সে ব্যাপারে বিজ্ঞ কোন মুফতী থেকে মাসআলা জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী আমল করতে হবে।

উপরোক্ত শর্তগুলো পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ক্রেডিট কার্ড নেওয়া ও তা ব্যবহার করার অবকাশ শরীয়তে রয়েছে। ডেবিট কার্ড/ এটিএম কার্ড দেখতে ক্রেডিট কার্ডের মতই আরেকটি ইলেকট্রিক মানি হল ডেবিট কার্ড তথা এটিএম কার্ড। এ কার্ডের সূচনা এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) থেকে। বর্তমানে এটিএম কার্ডকেই কোন কোন ব্যাংক ডেবিট কার্ডে উন্নীত করে এর দ্বারা কেনাকাটার সুযোগ করে দিয়েছে। এটিএম কার্ড সম্পর্কে অনেকেরই হয়ত ধারণা রয়েছে। কারণ আমাদের দেশে এ প্রযুক্তি এসেছে কম সময় হয়নি। ব্যাংকে একাউন্টারী ব্যক্তি এটিএম কার্ড দিয়ে বছরের যে কোন দিন যে কোন সময় (৩৬৫ দিনের ২৪ ঘন্টা) নির্ধারিত বুথ থেকে নগদ টাকা উত্তোলন করতে পারে। অবশ্য এক্ষেত্রে তার একাউন্টে ওই পরিমাণ টাকা থাকা আবশ্যক। আবার এ কার্ড দ্বারা বর্তমানে অনেক মার্কেট, দোকান বা সেবা প্রতিষ্ঠানের বিলও পরিশোধ করা যায়।

সুতরাং ক্রেডিট কার্ড ও ডেবিট কার্ডের সুযোগ-সুবিধা প্রায় কাছাকাছি হলেও এ দু’টির মাঝে মৌলিক পার্থক্য হল-প্রথমটির দ্বারা আগে খরচ করে পরে টাকা পরিশোধ করতে হয়। পক্ষান্তরে ডেবিট কার্ডের সুবিধা তখনি পাওয়া যাবে যদি কার্ডধারীর একাউন্টে আগে থেকেই পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা জমা থাকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ডেবিট কার্ডের মাসআলা সহজ এবং এটি ব্যবহার করা জায়েয। আর এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যে বার্ষিক ফি নির্ধারণ করে তাও নাজায়েয নয়। অবশ্য ফি হওয়া দরকার যুক্তিসঙ্গত পরিমাণে। দেশীয় কোন কোন ব্যাংক কিছুদিন আগেও এটিএম কার্ডের সীমিত সুযোগ দিয়ে ১,৫০০/- করে বার্ষিক ফি নিয়েছে; যা পরিষ্কার জুলুমের অন্তর্ভূক্ত। বর্তমানেও ব্যাংকগুলো ৫০০/ ৬০০ করে এ ফি নিয়ে থাকে। বাস্তবতার বিচারে তা হওয়া দরকার আরো কম।

প্রকাশ থেকে যে, ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত উপরোক্ত আলোচনা পত্রিকার স্থানের বিবেচনায় সংক্ষিপ্তভাবে করা হয়েছে। তাই কিছু কিছু বিষয়ে এখানে আলোকপাত করা হয়নি। যেমন ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ডে কোন কোন ব্যাংকের ‘লিও’ বা ‘এফবিআর’ এর শর্ত আরোপের মাসআলা এবং এ ধরনের আরো দু’একটি বিষয়। যাদের বিষয়টি প্রয়োজন তারা নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতা থেকে জেনে নিবেন।
লেখকঃ শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন