মঙ্গলবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ২৬ চৈত্র ১৪৩০, ২৯ রমজান ১৪৪৫ হিজরী

আন্তর্জাতিক সংবাদ

পাকিস্তানে কিলিং মিশন চালাচ্ছে ভারতীয় গুপ্তচররা?

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২ মার্চ, ২০২৩, ১২:০১ পিএম

একবছরেরও কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের করাচী আর রাওয়ালপিন্ডি শহরে মোটরসাইকেল চেপে আসা অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা হত্যা করে খালিদ রাজা, বশীর আহমেদ আর মিস্ত্রী জাহিদ ইব্রাহিমকে। জায়গা আলাদা হলেও, তিনটি হত্যার কায়দাই এক।

প্রথম খুনটা হয়েছিল ইব্রাহিমের, গত বছর মার্চ মাসে করাচীর আখতার কলোনীতে। এবছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে খুন হন বশীর আহমেদ আর ২৬ তারিখ করাচীর গুলিস্তাঁ জোহর এলাকায় হত্যা করা হয় খালিদ রাজাকে। তিনটে খুনের ঘটনাস্থল আলাদা, কিন্তু ধরণ এক। পাকিস্তানে এধরনের টার্গেট কিলিং নতুন নয়, কিন্তু নিহত তিনজনের ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে।

খালিদ রাজা, বশীর আহমেদ আর মিস্ত্রী জাহিদ, তিনজনেই এমন সংগঠনের সঙ্গে একসময়ে যুক্ত ছিলেন, যেগুলি ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে সক্রিয় ছিল। করাচীর গুলিস্তাঁ এলাকায় ৫৫ বছর বয়সী সৈয়দ খালিদ রাজাকে তার বাড়ির সামনেই দিনের বেলা হত্যা করা হয়। রাজা নব্বইয়ের দশকে আল-বদর-মুজাহিদিন নামের একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন। অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সশস্ত্র সংঘাত ছিল আল-বদর-মুজাহিদিন সংগঠনটি।

যদিও তাকে হত্যা করার দায় স্বীকার করেছে সিন্ধু দেশ আর্মি নামের সরকার বিরোধী বিচ্ছিনতাবাদী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, তবে এটাই এধরনের প্রথম হত্যা নয়। বিগত কিছুদিন যাবত অধিকৃত কাশ্মীরে আগে সক্রিয় ছিল, এমন জঙ্গী কমান্ডারদের রহস্যময় হত্যার অন্যতম একটা ঘটনা খালিদ রাজার খুন। গত দিন দশেকের মধ্যে এটি দ্বিতীয় এবং এক বছরে পঞ্চম হত্যার ঘটনা, যেখানে অধিকৃত কাশ্মীরে সক্রিয় প্রাক্তন ও বর্তমান জঙ্গী কমান্ডারদের অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা বেছে বেছে হত্যা করছে।

কে ছিলেন এই সৈয়দ খালিদ রাজা? করাচীতে জামাত-এ-ইসলামীর নেতা ইঞ্জিনিয়ার নইমুর রহমান সামাজিক মাধ্যমে একটা পোস্ট দিয়ে সৈয়দ খালিদ রাজার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এও লিখেছেন যে জামাত-এ-ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী জমিয়ত-এ-তুলাবায় তারা দুজন একসঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

করাচীর সিনিয়র সাংবাদিক ফৈজুল্লাহ খানের কথায়, সৈয়দ খালিদ রাজার সঙ্গে শহরের বিহারী সম্প্রদায়ের ভাল যোগাযোগ ছিল। তিনি নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে আফগানিস্তানে আল-বদর সংগঠনের প্রশিক্ষণ শিবিরে ট্রেনিং নেন আর তারপরে অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইতে সামিল হন। কিন্তু ৯১৯৩ সালে পাকিস্তানে ফিরে আসার পরে তাকে পেশোয়ারে সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়।

আল বদর মুজাহিদিন আসলে জামাত-এ-ইসলামীরই সশস্ত্র শাখা হিসাবে কাজ করত। আশির দশকের শুরুর দিকে আফগানিস্তান আর তার পরে অধিকৃত কাশ্মীরে এর সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছু অভ্যন্তরীণ মত বিবাদের জেরে আল বদর জামাত থেকে পৃথক হয়ে যায়। সেই সময়ে জামাত-এ-ইসলামী সৈয়দ সালাউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন হিজবুল মুজাহিদিনকে সমর্থন করত আর জামাত চাইত আল বদর হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গেই মিশে যাক।

ফৈজুল্লাহ খান বলছেন, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যখন সৈয়দ খালিদ রাজাকে আল বদরের করাচী শাখার প্রধান হিসাবে ঘোষণা করা হয়, সেই সময়ে তিনি সংগঠনে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। ৯/১১র ঘটনার পরে প্রাক্তন সেনাপ্রধান পারভেজ মুশারাফের নির্দেশে পাকিস্তানে কট্টর সংগঠনগুলোর ওপরে যখন নিষেধাজ্ঞা জারী হল, তখন সেগুলির কয়েকশো সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ধৃতদের মধ্যে সৈয়দ খালিদ রাজাও ছিলেন এবং কয়েক বছর জেলে কাটানোর পরে ধীরে ধীরে তিনি চরমপন্থী জীবন থেকে সরে এসে শিক্ষা প্রসারের কাজে যুক্ত হন।

বশীর আহমেদের হত্যা: সৈয়দ খালিদ রাজা খুন হওয়ার ঠিক আগে, ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ লাগোয়া রাওয়ালপিন্ডি শহরে কাশ্মীরি জঙ্গী কমান্ডার বশীর আহমেদ পীর ওরফে ইমতিয়াজ আলমকে খুন করা হয়। তিনি তখন মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন।

এখানেও অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা মোটরসাইকেলে চেপে আসে আর পিস্তল থেকে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। সাংবাদিক জালালুদ্দিন মুগলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে ৬০ বছর বয়সী বশীর আহমেদ আদতে ভারত শাসিত কাশ্মীরের কুপওয়াড়া এলাকার মানুষ। আশির দশকের শেষ থেকেই তিনি কাশ্মীরি জঙ্গী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকেই সপরিবারে পাকিস্তান চলে যান। হিজবুল মুজাহিদিনের সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য হওয়া ছাড়াও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির পরে তিনিই হয়ে ওঠেন শক্তিশালী কমান্ডার।

ভারতের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলছে পাকিস্তান সরকার : গতবছর মার্চ মাসে করাচীর আখতার কলোনীতে খুন হন জৈশ-এ-মুহাম্মদের সদস্য মিস্ত্রী জাহিদ ইব্রাহিম। মোটরসাইকেল আরোহী দুই অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি তার ফার্নিচারের দোকানে ইব্রাহিমকে নিশানা করে গুলি চালায়।

যারা ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের কাঠমান্ডু থেকে দিল্লিগামী আইসি ৮১৪ বিমানটি হাইজ্যাক করে কান্দাহারে নিয়ে গিয়েছিল, সেই ছিনতাইকারীদের একজন ছিলেন মিস্ত্রী জাহিদ ইব্রাহিম। ছিনতাইকারীরা ভারতীয় জেলে দীর্ঘদিন ধরে বন্দী জৈশ-এ-মুহাম্মদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৌলানা মাসুদ আজহার এবং তার আরও দুজন কমান্ডার মুশতাক জরগর ও উমর সৈয়দ শেখকে ছাড়িয়ে নেয়ার বদলে বিমানযাত্রীদের ছেড়েছিল।

মিস্ত্রী জাহিদকে কে কীভাবে খুন করল, তা বিশদে জানা যায় না, কিন্তু আগে এক প্রভাবশালী সংগঠনের কমান্ডারকে যখন নিশানা করা হয়েছিল, সেই সময়ে ভারতের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছিল পাকিস্তান। লাহোরে ২০২১ সালের জুন মাসে একটা গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল। ওই বিস্ফোরণ আসলে লস্কর-এ-তৈয়বা এবং জামাত-উদ-দাওয়ার প্রধান হাফিজ সৈয়দের বাড়ি লক্ষ্য করেই ঘটানো হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু হাফিজ সৈয়দ এবং তার পরিবারের সদস্যরা সুরক্ষিত থাকলেও অন্য চারজন নিহত হয়েছিলেন।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানী খার ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ওই বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ভারত যুক্ত ছিল বলে পাকিস্তানের গোয়েন্দা এজেন্সিগুলো মনে করে। ওই বিস্ফোরনের ঘটনার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘের কাছেও আবেদন করেছিলেন হিনা খান।

লাহোরের সিনিয়র সাংবাদিক মাজিদ নিজামীর কথায় পাকিস্তানে কাশ্মীরি জঙ্গী সংগঠনগুলোর ওপরে ভারতের কথিত হামলার যে প্রথম ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, সেটা ছিল হাফিজ সৈয়দের ঘনিষ্ঠ খালিদ বশীরের লাহোর থেকে অপহরণ করে নৃশংস ভাবে হত্যা। দুদিন পরে লাহোর লাগোয়া জেলা শেখপুরায় পাওয়া গিয়েছিল বশীরের লাশ। হাফিজ সৈয়দের নিরাপত্তা সংক্রান্ত খবরাখবর জানার জন্য বশীরকে ব্যাপক মারধর করা হয়েছিল, যাতে দেহের হাড়গোড় টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল আর শেষে তার চোখে গুলি করা হয়।

মাজিদ নিজামীর কথায়, খালিদ বশীরের হত্যার দায় কেউই স্বীকার করে নি, কিন্তু ওই ঘটনার ধরণ দেখে সেটিকে ভারতীয় গুপ্তচরদের কাজ বলেই মনে করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা এজেন্সিগুলি। ওই ঘটনায় ধৃত দুজনের ফাঁসির সাজা হয়। তারা পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের জানিয়েছিল যে মধ্যপ্রাচ্যের কোনও এক দেশে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ এর অফিসারেরা এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল তাদের।

কয়েকটি ঘটনা জানাজানি হলেও সম্প্রতি এমন আরও কয়েকটি ঘটনা আছে, যেখানে সংগঠনগুলোর কমান্ডারদের নিশানা করা হয়েছিল। এই ঘটনাগুলি প্রকাশ্যে আসে নি। সাংবাদিক মাজিদ নিজামীর কথায়, গত বছর পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরে হিজবুল মুজাহিদিনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সৈয়দ সালাউদ্দিনের গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যদিও তার নিরাপত্তা কর্মীরা সেই প্রচেষ্টা সফল হতে দেন নি।

আবার সাংবাদিক ফৈজুল্লাহ খান বলছিলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে করাচীর আখতার কলোনী এলাকায় জৈশ-এ-মুহাম্মদের জাহিদ ইব্রাহিম মিস্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ভারতীয় বিমান ছিনতাইকারী দলের আরেক সদস্যকে তার বাড়িতে ঢুকে মারার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু গোয়েন্দা এজেন্সি-গুলো হামলাকারীদের কল ট্রেস করে তাদের গ্রেপ্তার করে নেয়। 'খুন হওয়া ব্যক্তিদের জানাজায় যারা এসেছিলেন, তাদেরও সন্দেহ ভারতীয় গুপ্তচররাই এইসব রহস্যজনক খুনের পিছনে আছে'

এই রহস্যজনক ঘটনাগুলোর পিছনে কারা আছে? সৈয়দ খালিদ রাজার হত্যার দায় যদিও সিন্ধু দেশ সংগঠন স্বীকার করে নিয়েছে, তবে তাদের বিবৃতি থেকে এটা স্পষ্ট নয় যে কেন তারা ওই হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। তারা বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে সিন্ধুু প্রদেশে ধর্মীয় কট্টরপন্থী এবং ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ সৈয়দ খালিদ রাজার হত্যা।

সেটাই যদি সত্যি হয়, তাহলে তো করাচী আর সিন্ধু প্রদেশে কয়েক কোটি মানুষ এই সংগঠনটির নিশানায় চলে আসবে, তাহলে কেন সৈয়দ খালিদ রাজাকেই বেছে নেয়া হল? অন্যদিক থেকে যদি দেখা যায়, তাহলে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে পাকিস্তানের মাটিতে ভারত তার দেশের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে প্রো-অ্যাক্টিভ হয়ে অভিযান শুরু করেছে। সম্ভাব্য উদ্দেশ্য একটাই, যাতে ভারত শাসিত কাশ্মীরে আবারও নতুন করে কোনও হিংসাত্মক আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনাই আর না থাকে।

আবার ভারতীয় মিডিয়াতে ওইসব হামলার ঘটনা দেখিয়ে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছিল যেন ভারতীয় এজেন্সিগুলি তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে একের পর এক সাফল্য পাচ্ছে। কয়েকজন ভারতীয় তো এই হামলার ঘটনাগুলোকে ইসরায়েলের গুপ্তচর বাহিনী মোসাদের কাজের ধরনের সঙ্গে তুলনা করছিলেন। মাজিদ নিজামীর কথায়, খুন হওয়া ব্যক্তিদের জানাজায় যেসব সংগঠন অংশ নিয়েছিল, তারাও ভারতের যুক্ত থাকার কথা বলছিল আর এইধরনের অন্য যারা আছে, তাদের চলাফেরার ওপরে বিধিনিষেধ আরোপ করার কথাও উঠেছিল সেখানে। সূত্র: বিবিসি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন