ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

উপ সম্পাদকীয়

মধ্যবর্তী নির্বাচন ও বিএনপি ভাঙ্গার গুঞ্জন

প্রকাশের সময় : ২৪ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মেহেদী হাসান পলাশ : একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য সরকারের সামনে দৃশ্যমান কোনো চ্যালেঞ্জ বা চাপ না থাকলেও হঠাৎ করেই জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে মধ্য মেয়াদী জাতীয় নির্বাচনের কথা। জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতেও হঠাৎ করেই এই মধ্যমেয়াদি জাতীয় নির্বাচনের কথা আলোচিত হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্নমুখী আলোচনার উপসংহার হলো, ২০১৬ সালের শেষে কিংবা ২০১৭ সালের প্রথমার্ধে সরকার একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে, যদিও এ বিষয়ে সরকার এখনো মুখ খোলেনি। হঠাৎ করেই গত ২১ জানুয়ারি সিলেটের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত জনতার কাছে নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চান। প্রধানমন্ত্রীর এই আকষ্মিক নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়া উপস্থিত নেতৃবৃন্দ, জনতা ও দেশবাসীর মনে বিরাট প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি আসন্ন দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের ভোট চাইলেন; নাকি এর ভেতরে জাতীয় নির্বাচনের কোনো বার্তা নিহিত রয়েছে। এদিকে গত ২ জানুয়ারি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জানান, খুব শিগগির বর্তমান সরকারের পতন হবে। এরপর ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা’ দিবস পালনের লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপি আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি অচিরেই দেশে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে বলে নেতাকর্মীদের জানান।
এ সকল আলোচনার মধ্যে গত ১৪ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে ‘রাজনীতিতে লন্ডন মিশন’ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। রিপোর্টে বলা হয়, সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে বিএনপির ‘আপাতত’ সরে আসা, পৌরসভা নির্বাচনের পর দলটির ‘নীরবে’ ফল মেনে নিয়ে চুপচাপ থাকা এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি নয়াপল্টনের সমাবেশে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমঝোতাধর্মী বক্তব্যকে ঘিরে একধরনের রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতিতে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে সবাই মিলে রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান এবং খালেদা জিয়াসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মামলাসমূহের বিচার কাজে কিছুটা হলেও গতি কমিয়ে আনা ও কয়েকজনের জামিন হওয়ায় সেই রহস্যের ঘনত্ব বেড়েছে। এরমধ্যেই দেশের ভেতরে-বাইরে আওয়ামী লীগ-বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ কয়েক নেতার যোগাযোগের ঘটনা এই রহস্যকে আরও গভীরতা দিয়েছে। রাজনীতির নেপথ্যের খবরাখবর রাখার চেষ্টা করেন কিংবা রাজনীতির অলি-গলিতে ঘোরাঘুরি করেন, এমন দু’একজন জানালেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা সম্প্রতি লন্ডনে সেখানে বসবাসরত বিএনপির হাইপ্রোফাইল এক নেতার সঙ্গে চা-চক্রে বসেছিলেন। এই চা-চক্রটি ‘হঠাৎ দেখা’ ধরনের বা আকস্মিক ছিল না। পূর্ব যোগাযোগের ভিত্তিতে সময়-ক্ষণ নির্ধারণ করেই এর আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন ওই উপদেষ্টার এক আত্মীয়, যিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। চা-চক্রের আয়োজন করে দিয়ে বিএনপির ওই নেতা এখন থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগ-বিএনপির দায়িত্বশীল দুই নেতার ওই বৈঠকের আলোচনার বিষয় সম্পর্কেও কিছু আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সূত্রের দাবি, আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল একাদশ সংসদ নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রীর ওই উপদেষ্টা বিএনপির হাইপ্রোফাইল নেতাকে জানান, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই, বর্তমান সরকারও সেই পথে আর পা বাড়াতে রাজি নয়। সবার অংশগ্রহণে আগাম নির্বাচন চাইলে সংবিধানের বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই হতে হবে। বড়জোর নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এসব বিষয়ে সমঝোতা হলে ফলাফলও মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকা অপরিহার্য। বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সায় পাওয়া গেলে বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার এসব বক্তব্যের জবাবে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির আলোচিত নেতা বলেছেন, ‘আন্দোলন নয়, সবার অংশগ্রহণে দেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনই তাদের মূল দাবি। এক্ষেত্রে আগের কাঠামোর মতো পুরোপুরি নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালও তারা চাচ্ছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে অবাধ নির্বাচনের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে সমঝোতার বিষয়ে বিএনপি এগিয়ে আসতে রাজি আছে।’
দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্টে আরো বলা হয়, বিএনপির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের সাংগঠনিক অবস্থা, দলীয় প্রধানসহ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার গতি-প্রকৃতি, স্থানীয় ও ভূ-রাজনীতির গতিধারাসহ সবকিছু মিলিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে দলটি। মোটামুটি অবাধ নির্বাচন হলে প্রয়োজনে বিরোধী দলে বসতেও তেমন আপত্তি নেই। মূলকথা, নির্বাচনটি হতে হবে গ্রহণযোগ্য। বিএনপির এই নেতারা আরও জানান, সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় দলটি এখন সংসদে ফিরতে চায়। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে ভালো, তা না হলে অন্তত বিরোধী দল হিসেবে হলেও সংসদে যেতে চায় দলটি। এক্ষেত্রে অন্তত দল বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে আপাতত রক্ষা পাবে বলে মনে করছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির এসব আলোচনা শুধু চা-চক্রেই সীমাবদ্ধ নেই। সময়ে-সময়ে এর অগ্রগতি নিয়ে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। উভয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি অবহিতও করছেন। অবশ্য উপদেষ্টা যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করছেন, সেটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে করছেন কি-না সেটি অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে বিএনপি নেতার আলোচনার বিষয়ে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অবগত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে একেবারে গোপনে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এসব আলোচনা বা যোগাযোগ চললেও এটি প্রথমবারের ঘটনা নয়। এর আগেও দু’একবার দল দুটির কয়েক নেতার মধ্যে এরকম অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়েছে।
অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এই রিপোর্টের সত্যতা সন্দেহাতীত নয়। কিন্তু এর বেশ কিছু বিশ্লেষণ বর্তমান বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির ঘটনা ঘটলেও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো বিএনপি সেই নির্বাচন বয়কট করেনি। শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার ফলে সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানের সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনের পরও এ অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি তো দূরে থাক জোরালো কোনো বক্তব্যও দেয়নি। অবশ্য বিএনপি সূত্রের খবর, পৌর নির্বাচনের কারচুপি ও ফলাফল সম্পর্কে পূর্ব ধারণা সত্ত্বেও তারা এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তাদের দিক থেকে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, অর্জনটাকে বড় করে দেখছে তারা। বিশেষ করে ২০১৫ সালের শুরুতে টানা ৯২ দিনের আন্দোলন ফলাফল শূন্যভাবে শেষ হওয়ার পর সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর যে হামলা, মামলা ও নির্যাতন শুরু হয় তাতে ফলে তাদের মধ্যে ভীতি ও হতাশার সৃষ্টি হয়। পৌর নির্বাচন এইসকল নেতিয়ে পড়া, ঝিমিয়ে পড়া নেতাদের গা ঝাড়া দিয়ে চাঙ্গা করার উপলক্ষ সৃষ্টি করে। দলের ভেতর কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে । এরমধ্যে মির্জা ফখরুল, খন্দকার মোশাররফ, রিজভী আহমেদসহ বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং আরও কয়েকজন মুক্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অনেকের মামলার শুনানির তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছে। মহানগরের আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তাকে রিমান্ডে না নিয়ে সরাসরি জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
তাহলে সরকারের সঙ্কট বা চ্যালেঞ্জ কোথায়? কোন প্রেক্ষাপটে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয় বিবেচিত হচ্ছে সরকারি মহলে? বর্তমান সরকার ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত যে নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী দাবি করে তার বৈধতা নিয়ে পাশ্চাত্যের দেশগুলো প্রশ্ন তুলে অতিদ্রুত সকলের অংশগ্রহণমূলক একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবি করছে আসছে। সরকার এতদিন সে দাবিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। এর প্রধান কারণ আওয়ামী লীগ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভারত, চায় না ও রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোকে শক্তভাবে তার করপুটে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী গর্বিত কণ্ঠে বলতে পারেন, আমি ছাড়া বাংলাদেশে আর কে আছে যে ওবামার টেলিফোনকে অবহেলা করে? কার্যত বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি নয়। যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই এখন আর কোনো দেশের সরকার প্রধানকে নামাতে বা বসাতে পারে না। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে না পারা তার সাম্প্রতিক প্রমাণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২০ সালে তার পিতার জন্ম শতবার্ষিকী বছরব্যাপী মহাধুমধামের সাথে পালন করতে চান, একই সাথে তিনি ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজযন্তী অনুষ্ঠান শতাধিক বিদেশি রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের উপস্থিতিতে করতে চান। কিন্তু বর্তমান মেয়াদে তার পক্ষে এ দুইটি কাজ সমাধা করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান পার্লামেন্টের মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে যদি শেখ হাসিনা এই দুটি অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে উদযাপন করতে চান তবে তাকে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করতে হবে। কিন্তু ভোটারবিহীন নির্বাচনের রায় দিয়ে সরকারকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলে সে সময় সরকারের জনপ্রিয়তা বর্তমান অনুকূল সময়ের মতো থাকবে কিনা সেটা নিয়ে সরকারি মহলেই সন্দেহ রয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরে অনুষ্ঠিত মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন বিজয়ী হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে নাও থাকতে পারে।
সরকারি হিসাবে হামলা, মামলা, নির্যাতন, নিপীড়ন, লোভ, ভয়, বিরোধ, বিভেদ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত বিএনপি বর্তমানে স্মরণকালের মধ্যে সর্বাধিক দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন শরীক দলগুলোর মধ্যকার বন্ধনও শিথিল হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে দুইটি শরীক দল এনপিপি ও ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশ জোট ত্যাগ করেছে। জোটে জামায়াতের অবস্থানও আছি -নেই এর মধ্যে। উপরোন্তু যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলীয় শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও কারাদ-, হুলিয়ার কারণে চরমভাবে নেতৃত্বশূন্যতায় ভোগা দলটি বর্তমানে নিষিদ্ধের আশংকায় কম্পিত। সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে সরকারি দলের কারচুপি ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে জোটগত প্রার্থী প্রদান ও নির্বাচন করতে না পারা এবং দলের কমান্ড দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ অগোছালো অবস্থা, মামলা, হয়রানি থেকে বাঁচতে এবং ব্যাক্তিস্বার্থের কারণে অনেক স্থানেই বিএনপির নেতাকর্মীরা নিজ দলের প্রার্থী বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর এমন দুর্বল অবস্থানের সুযোগে সরকার একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে নতুন করে তার ম্যান্ডেট ঝালাই করে নিতে চাইতেই পারে। অর্থাৎ সরকারের চ্যালেঞ্জ তার নিজের কাছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দেশে যে অরাজকতাপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল সেই অবস্থায় একতরফা নির্বাচনের পক্ষে ছিল না জাতিসংঘ, দাতা সংস্থা ও বিশ্বের অধিকাংশ দেশের কূটনীতিকরা। কিন্তু সরকার অনড় অবস্থানে থেকে একতরফা নির্বাচন করতে সক্ষম হলেও সে সময় বিদেশি কূটনীতিক, দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের এই মর্মে আশ্বস্ত করেছিল যে, এটি একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সকল দলের অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচন করবে তারা। কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি আন্দোলন থেকে সরে গেলে সরকারের উপর কোন দৃশ্যমান চাপ না থাকায় সে প্রতিশ্রুতি ভুলে যেতে চেষ্টা করে তারা।
অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগে আইএস’র উপস্থিতির জানানে দিল্লি সরকার চিন্তিত। বিশাল অভিন্ন সীমান্তের কারণে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তা ভারতীয় নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, এ আশংকা তাদের রয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় ভারতে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবির অস্তিত্ব চিহ্নিত হওয়ায় ভারত সরকারকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। তাই বাংলাদেশকে আরেকটি আফগানিস্তানে পরিণত হওয়া ঠেকাতে দিল্লির ইচ্ছা প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে রাজনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। সে লক্ষ্যে বিএনপিকে সংসদ ও রাজপথে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে সরকারের কাছে মোদি সরকারের ইচ্ছার কথা ঢাকাকে জানানো হয়েছে। দিল্লির এহেন মনোভাব জানার পর সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের নতুন ছক নিয়ে এগিয়ে এসেছে।
রাজনৈতিক পরিম-লে এই ছকের কিছু কথা বিভিন্নভাবে আলোচিত হতে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আগামী নির্বাচন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মেনে নেয়া। এরপর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন। সেই সরকারের অধীনে মোটামুটি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে সম্মানজনক সংসদীয় আসন দিয়ে পার্লামেন্টে নিয়ে এসে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার মেয়াদ ২০২২ সাল পর্যন্ত বাড়িয়ে নেয়া। এ ক্ষেত্রে যদি বিএনপি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার মেনে না নেয় তাহলে আদালতের মাধ্যমে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে কনভিক্টেড করে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, সরকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত নেতাদের নিয়ে বিএনপিতে ভাঙন ধরানো। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে ২০ দলীয় জোট ভেঙে ফেলে বিএনপিকে আরো নাজুক অবস্থায় নিয়ে নির্বাচনে আসতে বাধ্য করা। কেননা তেমন অবস্থায় বিএনপি নির্বাচনে না গেলে ধানের শীষ প্রতীক খ-িত বিএনপিকে দিয়ে দেয়া হতে পারে।
এহেন রাজনৈতিক হিসাবের কিছু বাস্তব আলামতও বর্তমানে দৃশ্যমান। ইদানীং সংবাদপত্রের পাতায় বিএনপি ভাঙার নানা কথা উঠে আসছে। সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ, কারাবন্দি কিছু বিএনপি নেতার সাথে কারাগারেই সরকারের সাথে আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। সে মোতাবেক তাদের মুক্তি দেয়া হয়েছে। মুক্তি পেয়ে বিএনপির এসব নেতা এখন বিভিন্ন স্থানে বৈঠক করছেন বলেও খবর প্রকাশিত হচ্ছে। যদিও বিএনপি কারামুক্ত নেতারা এমন সমঝোতার খবর অস্বীকার করেছে।এদিকে রাজনৈতিক টোকাইদের দিয়ে বিএনপি অফিস দখলের নাটক করানো হচ্ছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভাইকে দলছুট বিএনপির নেতৃত্বে বসানো হবে বলে শোনা যাচ্ছে। বার্ধ্যক্য ও রোগক্লিষ্ট জিয়াউর রহমানের এই ছোটভাই হঠাৎ করেই রাজনৈতিক বিষয়ে আগ্রহ দেখিযে সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখছেন, বিবৃতি দিচ্ছেন।
বাস্তবতা হলো: ভাঙন বিএনপি’র জন্য নতুন কিছু নয়। জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপি’র শৈশবে ওবায়দুর রহমান, ডা. মতিন, মশিউর রহমান, কাজী জাফর, মওদুদ আহমদদের মতো জাদরেল নেতারা বিএনপি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বিএনপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিকল্পধারা গঠন করেছেন। কর্নেল অলি আহম্মেদের নেতৃত্বে বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতা বেরিয়ে গিয়ে লিবারেল ডেমোক্রাটিক পার্টি করেছেন। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে সাইফুর রহমান-মান্নান ভুঁইয়ার নেতৃত্বে সংস্কারপন্থী বিএনপি গঠন করা হয়েছে। বিএনএফ নামে নতুন দল গড়েছেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। কিন্তু এর পরিণতি কী হয়েছে? ওবায়দুর রহমান, মওদুদদের মতো বেশিরভাগ নেতাই এরশাদের পতনের পর আবার বিএনপিতে ফিরে এসেছেন। কর্নেল অলির এলডিপি বিএনপিতে একীভূত হতে খালেদা জিয়ার গ্রিন সিগনালের অপেক্ষায়। একই লাইনে একটু পেছনের বেঞ্চে বসে প্রতীক্ষায় আছেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সাইফুর রহমানের জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল তিনি বিএনপি হয়ে মরতে চান, আল্ল­াহ তার সে ইচ্ছা পূরণ করেছেন। একই নিয়ত নিয়ে মান্নান ভুঁইয়ার অনুসারীরা দৌড়াদৌড়ি করলেও খালেদা জিয়া তার সে ইচ্ছা পূরণ করেননি। মেজর হাফিজসহ সংস্কারপন্থী বিএনপির বেশিরভাগই এখন বিএনপির রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন। জাতীয় পার্টি দাঁড় করানোর লক্ষ্যে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে স্টিম রোলার চালিয়েছেন এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে। কিন্তু তার পতনের পর ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠে সকলকে অবাক করে দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। জাতীয় পার্টি নিজেও পাঁচবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরশাদের মূল দলই জাতীয় পার্টি হিসেবে টিকে আছে। আওয়ামী লীগ মিজান চৌধুরীর নেতৃত্বে আবদুর রাজ্জাক, ড. কামাল, কাদের সিদ্দীকীর নেতৃত্বে ভাঙনের শিকার হয়েছে। কিন্তু মূল স্রোত থেকে বেরিয়ে গিয়ে কেউই হালে পানি পায়নি। বিএনপি ভাঙ্গার আগে বিএনপিকে বুঝতে হবে। এ দলটি নেতা নির্ভর নয়। শহীদ জিয়ার আদর্শ ও সমর্থক নির্ভর। ১/১১ পর বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মী যখন গ্রেফতার আতঙ্কে পলায়নপর। তখন খালেদা জিয়ার ম্যান্ডেট পেয়ে অনেকটা অবহেলিত খন্দোকার দেলোয়ার হোসেন জাতীয় নেতা হয়ে দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের নয়নমণি হয়ে উঠেছিলেন। আর ডাকসাইটে নেতারা কর্মীদের জুতাপেটা খেয়ে পালিয়েছিলেন। গৃহবন্দী খালেদা জিয়া টেলিকনফারেন্স করে সারাদেশের বিএনপি কর্মী সমর্থকদের উৎসাহ যুগিয়েছেন। প্রবাসী নেতারা সামনে এসে দেশীয় কর্মীদের সাহস ও উৎসাহ যুগিয়েছে। ফলে প্রবল চাপের মুখেও বেগম খালেদা জিয়া বলতে পেরেছেন, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই। এদেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না। কাজেই কয়েকজন নেতা ভাগিয়ে বিএনপি ভাঙ্গার চেষ্টা ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার মতো অদুরদর্শি ও অবিচক্ষণ সিদ্ধান্ত বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন। বাংলাদেশের উদার ধর্মপ্রাণ ও ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী জনগণ নিজস্ব ধর্মীয়, দেশপ্রেমিক চেতনা থেকেই বিএনপি করে। কাজেই এ প্রয়োজনীয়তা দেশে যতদিন বিদ্যমান থাকবে বিএনপি ততদিন অটুট থাকবে। জাতীয় রাজনীতির এহেন জলন্ত দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাদী দল কেন যে রাজনৈতিক দল ভাঙার খেলায় নাম লেখাচ্ছে তা বিস্ময়কর। টানা ৭ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেয়া, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি করার পরও যদি নির্বাচনে জিততে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে ভাঙার খেলায় নামতে হয় তাহলে উন্নয়নের জোয়ারের দাবী কতটুকু ধোপে টেকে?
email:palash74@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন