মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

মুক্তাঙ্গন

ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন

প্রকাশের সময় : ৬ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
অশান্তির চরমে পৌঁছে এখন আমরা কেবল অস্থিরচিত্তে অনৈতিক উপায়ে মুক্তির পথ খুঁজছি। জাতীয় অর্থ ভা-ার আজ অরক্ষিতÑশত শত কোটি টাকা হ্যাকারা লুটে নেয়, সবার অজান্তে-অলক্ষে। প্রিয় সন্তানকে গলাটিপে হত্যার পর নির্বিকার থাকেন মা-জননী! দোষ চাপানোর চেষ্টা চলে খাবারের দোকানীর ঘাড়ে। অবোধ শিশুর পায়ূপথে বাতাস ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হয়, আরো কতভাবেই না নির্যাতিত হচ্ছে নারী ও শিশু। যখন তখন রাজপথে দুর্ঘটনা, সহিংসতায় প্রাণ যাচ্ছে হাজার হাজার বনি আদমের। কারণ একটাই, আমাদের কারো মনেই যেন শান্তি নেই। খুব কষ্ট আজ পেয়ে বসেছে আমাদের। এ যেন হেলাল হাফিজের কবিতা :
কষ্ট নেবে কষ্ট
হরেক রকম কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট!
লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচ হলুদ রঙের কষ্ট...
মাল্টি-কালার কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট...
অনৈতিকতা ও অশ্লীলতার সর্বশেষ শিকার সোহাগী জাহান তনু। সে সেনানিবাসের মতো সুরক্ষিত এলাকায় খুনের ভাগ্যবরণকারী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী। সারাদেশের মানুষ এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার। এ প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামী অনুশাসন সম্পর্কে আলোকপাত করলাম।
ইসলাম সবসময় নারীর অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দেয়। নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি সূরার নাম ‘নিসা’ বা নারী। আবার সূরা বাকারা, আল ইমরান, মায়েদা, আহযাব, নূর ইত্যাদিতে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত, বলতে হয় ‘ধর্ষণ’ বা ব্যভিচারের শাস্তি নিশ্চিত করে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও নারী অধিকার সুরক্ষিত করা ইসলামের শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম অঙ্গীকার।
ইসলামে ধর্ষণ বলতে বিবাহবহির্ভূত যে কোনো যৌনচার, সঙ্গম বা অপরাধকে “যিনা” বা ব্যভিচার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যিনা সুস্পষ্ট হারাম ও নিন্দনীয় অপরাধ। মহান আল্লাহ্ বলেন, “আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ” (বাণী ইসরাইল : ৩২)। ইমাম কুরতুবী বলেন, ‘যিনা করো না’ এর চেয়ে ‘যিনার কাছেও যেয়ো না’ অনেক বেশি কঠোর বাক্য। অর্থৎ যিনার পর্যায়ভুক্ত সবকিছুই হারাম।
ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদ- দেয়া এবং যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশত বেত্রাঘাত করাই হলো একমাত্র শাস্তি। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য। মহান আল্লাহ্ বলেন, “ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে” (নূর : ০২)। অন্যদিকে নারী নির্যাতনের জঘন্যতম মাধ্যম দেহব্যবসা। কিন্তু আল্লাহ্র নির্দেশ “তোমাদের অধীনস্তদের তোমরা অবৈধ বৃত্তিতে (দেহব্যবসায়) বাধ্য কর না... ” (নূর : ৩৩)।
ইসলাম নারী-পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক মিলনকে দ-নীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। তবে তা প্রমাণের জন্য ইসলামে ৪ জন পুরুষ চাক্ষুষ সাক্ষীর বিধানসহ বেশ কিছু কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণের শিক্ষা ও নির্দেশনা দেওয়া আছে। তবে ধর্ষকের স্বীকারোক্তি অথবা সাক্ষ্য না পাওয়া গেলে আধুনিক ডিএনএ টেস্ট, সিসি ক্যামেরা, মোবাইল ভিডিও, ধর্ষিতার বক্তব্য ইত্যাদি অনুযায়ী ধর্ষককে দ্রুত গ্রেফতার করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। স্বীকারোক্তি পেলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করা যাবে। তবে এমন ক্ষেত্রে সচ্ছতা, নৈতিকতা, পাপ-পরকাল, চিন্তাবিশেষ অগ্রাধিকার পাবে এবং বুঝতে হবে শাস্তির কঠোরতার একমাত্র উদ্দেশ্য ন্যায়, শান্তি ও নারী অধিকার বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা নারী নির্যাতনের অনুঘটক। তাই ইসলামে ‘পর্দা’ একটি সার্বক্ষণিক বিধান। এক পলকে একটু দেখায় অনেকটুকু অশ্লীলতা ও নিন্দনীয় অপরাধের জন্ম হয়। এজন্যই ‘চোখের হেফাজত’ বা দৃষ্টির সংযম খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্র নির্দেশ “হে রাসুল (সা.) মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে... নারীগণ যেন নিজেদের দৃষ্টিকে নত রাখে ও নিজের গুপ্তাঙ্গ হেফাজত করে এবং নিজেদের সাজসজ্জা অন্যদের প্রদর্শন না করে” (নূর : ৩০, ৩১)। শুধু তাই নয়, মহান আল্লাহ্র কঠোর হুঁশিয়ারি, “যারা ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার বিস্তারে উৎসাহী তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি” (নূর : ১৯)।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের জন্য যতটুকু শাস্তির বিধান রয়েছে তা প্রয়োগে অবহেলার ফলে ধর্ষণের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বরং ধর্ষিতাকে একঘরে করে রাখা হয়, তাকে সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়। তার পরিবারকে হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়। এগুলো কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না।
বস্তুত ধর্ষণ, ব্যভিচার বা নারী নির্যাতন হলো তথাকথিত ভোগবাদী আধুনিক সভ্যতার উপহার। কিন্তু ইসলাম নারী মুক্তি ও স্বাধীনতার রক্ষক। পৈষাচিকতায় নারীকে বিনোদন অথবা বিপননের মাধ্যম হিসেবে নয় বরং মানুষ তথা আল্লাহ্র পরিপূর্ণ সৃষ্টির সৌন্দর্যে ইসলাম নারীকে বিকশিত দেখতে চায়। এলক্ষে ‘সূরা নূর’ মহান আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহ। হযরত ওমর (রা.) বলেন, “তোমরা তোমাদের নারীদের সূরা নূর শিক্ষা দাও”। অন্যদিকে চারিত্রিক পবিত্রতা ও পর্দা একটি আন্তরিক বিষয় এবং পর্দা মেনেই একজন নারী তার সম্ভ্রমকে বহুলাংশে নিরাপদ রাখতে পারেন। এজন্যই মহান আল্লাহ্ বলেন, “তোমরা যা প্রকাশ করো ও গোপন করো আল্লাহ্ সে বিষয়ে অবগত আছেন” (নূর : ২৯)।
ষ লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
এসএ বিপ্লব ৬ এপ্রিল, ২০১৬, ১১:২০ এএম says : 0
অবশ্যই, নারী নির্যাতন বন্ধে ইসলামী আইনের বিকল্প নেই।
Total Reply(0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন