ঢাকা, বুধবার ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬, ১৬ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

অভ্যন্তরীণ

সুপেয় পানি সঙ্কটে দশ লাখ মানুষ

সাতক্ষীরায় ৪ হাজার ৪৩৩টি পানির উৎস অকেজো

সাতক্ষীরা থেকে আবদুল ওয়াজেদ কচি | প্রকাশের সময় : ১৪ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৮ এএম

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়া, পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতিসহ নানা কারণে মিষ্টি পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে। গত আট মাসে সাতক্ষীরা জেলার ১৫শ’ ২২টি মিঠা পানির উৎস নষ্ট হয়েছে। যদিও গত এক বছরে জেলায় ৩ হাজার ৭০টি মিঠা পানির উৎস সৃষ্টি করার দাবি করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সূত্র মতে, দিনের পর দিন জেলায় সুপেয় পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে। পুকুর ও নদীতে বাড়ছে লবণাক্ততা। বাড়ছে আর্সেনিক। পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় বেশিরভাগ নলক‚পে পানি ওঠছে না। পুকুরগুলো শুকিয়ে গেছে। কিছু এলাকার নলক‚পে সীমিত পরিমানে পানি ওঠছে। বেসরকারিভাবে স্থাপন করা পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টারগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশই অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে গোটা জেলায় বিশুদ্ধ পানি পেতে হিমশিম খাচ্ছে জেলা ২২ লাখ মানুষ। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে দূষিত পানি ব্যবহার করছে। গ্রীষ্মকাল শুরুর আগেই দক্ষিণ-পশ্চিম উপক‚লীয় শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও তালা উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায় এমন অবস্থা বিরাজ করছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সাতক্ষীরা সূত্রে জানা যায়, সরকারি হিসাব মতে জেলাতে মোট ৩৬ হাজার ৪১১টি হস্তচালিত নলক‚প রয়েছে। যার মধ্যে অকেজো রয়েছে ৪ হাজার ৪৩৩টি এবং সচল রয়েছে ৩১ হাজার ৯টি। তবে বাস্তবতা হলো অকেজোর সংখ্যা আরো বেশি।
এর মধ্যে সদর উপজেলায় চালু রয়েছে ৬৬২৫টি এবং অকেজো রয়েছে ৫০৪টি। কলারোয়ায় চালু রয়েছে ৫৪৭৭টি এবং অকেজো রয়েছে ৪৪০টি। তালায় চালু রয়েছে ৫৪৩৪টি এবং অকেজো রয়েছে ২৭৪টি। আশাশুনিতে চালু রয়েছে ৫০৯১টি এবং অকেজো রয়েছে ৭৪৪টি। দেবহাটায় চালু রয়েছে ৩০২৭টি এবং অকেজো রয়েছে ১১২টি। কালিগঞ্জে চালু রয়েছে ৪৫৫৪টি এবং অকেজো রয়েছে ১৯৭১টি। শ্যামনগরে চালু রয়েছে ৮৫৫০টি এবং অকেজো রয়েছে ৩৮৮টি। সাতক্ষীরা পৌরসভায় চালু রয়েছে ৪৪৮টি। সব মিলিয়ে জেলায় মোট ৪ হাজার ৪৩৩টি অকেজো নলক‚প রয়েছে। যা গত বছরে ছিল ২ হাজার ৪৬১টি।
চলতি বছরে কলারোয়া পৌরসভাতে একটি পানি শোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে। ৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিঘণ্টায় এক লাখ ৮০ হাজার লিটার পানি উৎপাদন করতে পারবে। চলতি বছরের জুন মাসে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা।
শ্যামনগর সদরসহ উপক‚লবর্তী গোলাখালী, কালিঞ্চি, দেবালয়, হেঞ্চিসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, খাওয়ার উপযোগী পানির জন্য মানুষের নাভিশ্বাস ওঠছে। নারী-পুরুষ এমনকি শিশুরা পর্যন্ত পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে মাইলের পর মাইল রাস্তা পাড়ি জমাচ্ছেন।
সপ্তম শ্রেণির সাবিনা জানায়, ঈশ্বরীপুর গ্রাম থেকে চার কিলোমিটার দূরবর্তী দেবালয় গ্রামের মাজেদ সরদারের বাড়ির পুকুর থেকে দিনে দুবার পানি সংগ্রহ করতে হয় তাকে। তার মা সুমাইয়া বেগম বলেন, সকাল ও স্কুল ছুটির পর এত দূর থেকে দুই দফা পানি নিয়ে আসতে গিয়ে মেয়ের লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে। নিজে গৃহস্থালি ও স্বামী দিনমজুরের কাজে ব্যস্ত থাকায় মেয়েকে দিয়ে পানি টানাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এই অঞ্চলের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ পুকুরের পানি পান করে থাকে। লবণাক্ত এলাকা হওয়ায় গ্রীষ্মকালে পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় খাওয়ার পানির সঙ্কট প্রবল আকার ধারণ করে। তবে সরকারিভাবে ট্যাংকি সরবরাহ করে বৃষ্টির সময়কার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনের সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা পূূরণের চেষ্টা চলছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে পাঁচ হাজার ৭৯৫টি পুকুর ও ১৩৬টি জলমহাল রয়েছে। এছাড়া ৪৬৫টিতে পিএসএফ থাকলেও ব্যবস্থাপনার অভাবে বন্ধ রয়েছে ৪০টি।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় সুপেয় পানির সঙ্কট রয়েছে। মিষ্টি পানির বিভিন্ন উৎস নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে সুপেয় পানির উৎস তৈরি করতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অকেজো নলক‚পসমূহ কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন নতুন মিষ্টি পানির উৎস তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে উপক‚লীয় জেলা হওয়ায় দিন দিন লবণাক্ততা ও আর্সেনিক বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঙ্কট সমাধান কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন