ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

শত কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর শঙ্কা

এবারো সিন্ডিকেটের থাবা : রাজধানীতে ২৬টি অস্থায়ী কোরবানি পশুর হাট ইজারার প্রস্তুতি

সায়ীদ আবদুল মালিক | প্রকাশের সময় : ১৮ জুন, ২০১৯, ১২:০৪ এএম


ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১২টি হাটের জন্য প্রথম দফার ইজারা কর্যক্রম শেষ হয়ে গেলেও দক্ষিণ সিটির ১৪টি হাটের ইজারা নিয়ে এখনো চলছে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। এ হাটগুলোর জন্য টেন্ডার আহŸানের পর থেকেই আগ্রহী প্রার্থীরা চালান কাটা শুরু করলেও তারা সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে সিডিউল সংগ্রহ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। গত তিন বছর ধরেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা নিয়ে অনিয়ম চলছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন। ২০১৭ সালে ডিএসসিসি’র ১৬ অস্থায়ী হাটের মধ্যে ৯টি হাট বৈধভবে ইজারা দেয়া সম্ভব হয়েছিল। বাকি ৭টি হাট খাস আদায়ের জন্য আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে ভাগ বাটোয়ার করে দেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া গত বছরও মাত্র ৭টি হাট টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারা দেয়া হয়েছিল। বাকি ৯টি হাট একই কায়দায় দলীয় নেতা কর্মীদের মধ্যে খাস আদায়ের জন্য ভাগ করে দেয়া হয়।
রমজানের ঈদের পর থেকেই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা কার্যক্রম শুরু করেছে। দক্ষিণ সিটির ১৪ হাটের জন্য ১২ জুন টেন্ডার আহŸান করেছে। ২৬ জুন টেন্ডারবাক্স খোলা হবে। অন্যদিকে উত্তর সিটির ১২টির অস্থায়ী হাটের টেন্ডারবাক্স খোলা হয়েছে গত ১২ জুন। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে ডিএনসিসি’র হাট-বজার ইজারা কমিটির মিটিংয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে কতগুলো হাট ইজারা দেয়া যাবে, আর কতগুলোর জন্য দ্বিতীয় দফায় টেন্ডার আহŸান করতে হবে। দুই সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি বিভাগে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, গত তিন বছর ধরেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী হাট ইজারা নিয়ে চলছে অনিয়ম আর দুর্নীতি। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সেই বছরের কোরবানির হাটগুলো ইজারাতে আমরা অংশগ্রহণ করতে পারিনি। কারণ এই হাটগুলো থেকে নির্বাচনী ফান্ড সংগ্রহের না কি নির্দেশ ছিল দলীয়ভাবে। তাহলে এ বছর কি হয়েছে? এ বছরও যে চালান কাটার পরও আমরা সিডিউল পাচ্ছি না?
তিনি বলেন, এবছর টেন্ডার আহŸানের পর থেকেই আমরা চালান কেটে বসে আছি। কিন্তু ডিএসসিসি’র সম্পত্তি বিভাগ থেকে এখনো আমাদেরকে সিডিউল দেয়া হচ্ছে না। এ বিষয় আমরা প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানের সাথে দেখা করে জানতে চাইলে তিনি আমাদেরকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই করতে পারবো না। আপনারা এ বিষয়ে মেয়র মোহদয়ের সাথে কথা বলুন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, চালান কেনার পরও কারা সিডিউল পাচ্ছেন না সে খবর আমার জানা নেই। তবে আমাদের সিডিউল ছাপানোর সময় প্রিন্টগত কিছু বিপত্তি হয়েছে। সে জন্য আমরা সিডিউল সরবরাহ করতে পারছি না। এটা দ্রæত সমাধান হয়ে যাবে। যারা চালান কেটেছেন তারা অবশ্যই সিডিউল পাবেন। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে ঘুরে ফিরে একই সিন্ডিকেটের সদস্যরা কোরবানীর পশুর হাটের ইজারা পাচ্ছেন। এতে দুই সিটি কর্পোরেশন প্রায় শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চিহ্নিত সিন্ডিকেট চক্রের আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে কম মূল্যে দলীয় নেতা কর্মীদের মাঝে ভাগভাটয়ারা করে ইজারা দেয়া নেয়া হয়ে আসছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে। দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তাসহ বড় বড় কর্মকর্তারা ডেকে এনে সরকার দলীয় নেতা কর্মীদের কোরবানীর পশুর হাটগুলো নাম মাত্র মূল্যে ইজারা কিংবা খাস আদায়ের জন্য বরাদ্ধ দিচ্ছে। যাতে তারা সরকারের কাছে নিজেদেরকে আস্থাভাজন কর্তকর্তা বলে পরিচয় দিতে পারেন।
এছাড়া এ সময় ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি’র সম্পত্তি বিভাগের সামনে এবং আঞ্চলিক অফিসে প্রতিদিন ‘মহড়া’ দেন ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ও তাদের ক্যাডার বাহিনী। এতে সকল ইজারা প্রার্থীর পক্ষে নির্বিঘেœ দরপত্র জমা দেয়া সম্ভব হয় না। এ নিয়ে প্রতি বছরই গোলাগুলি, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে সিন্ডিকেটের বাইরে কারও পক্ষে সিডিউল সংগ্রহ ও জমা দেয়া সম্ভব হয় না। ডিএসসিসি’র ও ডিএনসিসি’র অস্থায়ী গরুর হাটগুলোর ইজারা ক্ষমতাসীনদের আয়ত্বে রাখতে সব সময়ই নেয়া হয় নানা কৌশল। এর মধ্যে একই ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামে-বেনামে নাম মাত্র মূল্য দিয়ে দরপত্র জমা দিয়ে থাকেন। যে কারণে নিজেদের কাঙ্খিত দামে ইজারা পেতে সহজ হয়ে যায়। এতে প্রতি বছর সিটি কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায়।
অনুন্ধানে দেখা গেছে, গত বছর সিটি কর্পোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীনদের সিন্ডিকেটের কারণে রাজধানী ঢাকার অস্থায়ী ২৬টি কোরবানি পশুর হাট থেকে শত কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন। হাটগুলো থেকে কমপক্ষে ১৫০ কোটি টাকা হাসিল উত্তোলন করেছে ইজারাদাররা। অথচ হাটগুলোর ইজারা থেকে ডিসিসি পেয়েছে মাত্র সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। সিটি কর্পোরেশন চাইলে হাটগুলো থেকে আরো অন্তত ৬ থেকে ৭ গুণ রাজস্ব আয় করতে পারত।
গত বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মাত্র ৭টি হাটের ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। এছাড়া ৯টি হাট খাস আদায়ের জন্য দলীয় নেতা কর্মীদের মধ্যে বরাদ্ধ দেয়া হয়। এ নিয়ে মোট ১৬টি হাট ইজারা দিয়েছিল ডিএসসিসি। আর উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে ১০টি হাটের ইজারা দেয়া হয়েছিল। এসব হাটের ইজারামূল্য ছিল প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। ইজারাদারদের তথ্যমতে, অস্থায়ী হাটে চার লাখ ৫০ হাজার গরু বিক্রি হয়। ৪৬ হাজার ছাগল বিক্রি হয়। এ সময় শতকরা ৫ টাকা হারে ১৩৮ কোটি টাকা হাসিল আদায় হয়েছে। গত বছরের বাজারদর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গরুর গড় দাম ছিল ৬০ হাজার টাকা এবং ছাগলের গড় দাম ছিল ১০ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটে এ তথ্য সরবরাহ করে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। একই চিত্র ছিল ২০১৭ সালের অস্থায়ী কোরবানি পশুর হাটগুলোরও।
জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) গত ১৭ মে ঈদুল আযহা উপলক্ষে ১২টি অস্থায়ী কোরবানি পশুর হাট ইজারার দরপত্র আহবান করেছেন। এরমধ্যে নতুন দুটি এবং ১০টি পুরনো। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) ১৪টি হাট ইজারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরমধ্যে ১টি হচ্ছে, আফতাব নগর। কিন্তু ডিএসসিসির দরপত্র আহবানের আগেই এই স্থানে (আফতাব নগর) ডিএনসিসি হাট ইজারার দরপত্র আহবান করেছে। ওই জায়গাটি দুই সিটি কর্পোরেশনের বর্ডার এলাকা। সামনের জায়গা ডিএনসিসির এবং পেছনের জায়গা ডিএসসিসির। বিভক্তির পর থেকে ওই স্থানে ডিএনসিসি হাট ইজারা দিয়েছে। তবে গত ঈদে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারেÑএমন আশঙ্কা থেকে ডিএনসিসি হাট ইজারা দেয়নি। তবে ঈদের কয়েকদিন আগে তড়িঘড়ি করে ডিএসসিসি ওই স্থানে হাট বসানোর অনুমতি দেয়।
অস্থায়ী ২৬ হাট : ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে এবার ২৬টি অস্থায়ী হাট বসছে। সেগুলো হচ্ছেÑউত্তর সিটি: ১) উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর ব্রিজের পশ্চিম অংশ এবং ২ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমে গোলচত্ত¡র পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশ্বের ফাঁকা জায়গা ২) মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবি সড়ক সংলগ্ন (বছিলা) পুলিশ লাইনের খালি জায়গা ৩) মিরপুর সেকশন-৬, ওয়ার্ড-০৬ (ইস্টার্ণ হাউজিং) এর খালি জায়গা ৪) খিলক্ষেত বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গা ৫) খিলক্ষেত ৩০০ ফুট সড়ক সংলগ্ন উভয় পাশ্বের বসুন্ধরা হাউজিংয়ের খালি জায়গা ৬) ভাটারা (সাইদ নগর) পশুর হাট ৭) মিরপুর ডিওএইচএস’র উত্তর পার্শ্বের সেতু প্রোপার্র্টি ও সংলগ্ন খালি জায়গার অস্থায়ী পশু হাট ৮) ঢাকা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট খেলার মাঠ ৯) উত্তরখান মৈনারটেক শহিদ নগর হাউজিংয়ের খালি জায়গা ১০) বাড্ডা ইস্টার্ণ হাউজিং (আফতাব নগর) বøক-ই, সেকশন-৩ এর খালি জায়গা ১১) কাওলা-শিয়ালডাঙ্গা সংলগ্ন খালি জায়গা এবং ১২) উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের উত্তরার সুইচ গেইট হতে কামারপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত ফাঁকা জায়গা। দক্ষিণ সিটি: ১) উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘের মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা ২) ঝিগাতলা হাজারীবাগ মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা ৩) লালবাগের রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা ৪) কামরাঙ্গীরচর ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় হতে দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা ৫) শ্যামপুর বালুর মাঠসহ আশপাশের খালি জায়গা ৬) শ্যামপুর বালুর মাঠসহ আশপাশের এলাকার খালি জায়গা ৭) মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন আশপাশের এলাকার খালি জায়গা ৮) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সামসাবাদ মাঠ সংলগ্ন আশপাশের এলাকার খালি জায়গা ৯) লিটিল ফ্রেন্ডস ক্লাব সংলগ্ন গোপীবাগ বালুর মাঠ ও কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গা ১০) শনির আখড়া ও দনিয়া মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা ১১) ধুপখোলা মাঠ সংলগ্ন আশেপাশের খালি জায়গা ১২) ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউয়ারটেক মাঠ সংলগ্ন আশপাশের এলাকার খালি জায়গা ১৩) দাওকান্দি ইন্দুলিয়া ভাগাপুর নগর (আফতাব নগর ইষ্টার্ণ হাউজিং মেরাদিয়া মৌজার সেকশন-১ ও ২) লোহারপুলের পূর্ব অংশ এবং খোলা মাঠ সংলগ্ন আশেপাশের খালি জায়গা এবং ১৪) আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গা।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন