ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬, ০৮ শাবান ১৪৪১ হিজরী

ইসলামী বিশ্ব

দক্ষিণ এশিয়ায় ‘নতুন ফ্যাক্টর’ তুরস্ক!

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম

 


ইনকিলাব ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও সউদী আরবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভ‚ত হওয়ার পর তুরস্ক এখন তার অর্থনৈতিক, সামরিক ও ইসলামিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

এটা সত্য যে, দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারার অবস্থান এখনও প্রান্তিক পর্যায়ে, কিন্তু অদ‚র ভবিষ্যতে সেটা এমন না-ও থাকতে পারে। যে সব কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের অবস্থান জোড়ালো হতে পারে, সেগুলো হলো: তাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি; চীনের সাথে তাদের বন্ধুত্ব; ভারতের সাথে তাদের তিক্ত সম্পর্ক এবং প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের অসুখী সম্পর্ক।

সহায়ক শক্তি : দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের এগিয়ে যাওয়ার সহায়ক শক্তি হলো পাকিস্তান। এ অঞ্চলে তুরস্কের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক হলো পাকিস্তানের সাথে। রিয়াদ তার প্রভাব বলয় অর্গানাইজেশান অব ইসলামিক কোঅপারেশানে (ওআইসি) কাশ্মীর ইস্যুতে জোরালো এবং অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে অনীহা দেখানোর কারণে তাদের ব্যাপারে আশাভঙ্গ হয়েছে ইসলামাবাদের। অন্যদিকে, তুরস্ক এই ইস্যুতে পাকিস্তানকে জোরালো ও অব্যাহত সমর্থন দেয়ার কারণে আঙ্কারা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক একটা ক্রমবর্ধমান উন্নতির দিকে চলেছে।

এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সউদী র অর্থনৈতিক চাপের কারণে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের কুয়ালা লামপুরে ইসলামী দেশগুলোর সম্মেলনে অঙ্ক নিয়ে ওআইসিকে কাশ্মীর ও অন্যান্য মুসলিম ইস্যুতে চাপ দিতে না পারার কারণে আফসোস প্রকাশ করেছেন। সম্মেলনের আয়োজন করেছিল মালয়েশিয়া এবং তুরস্ক, ইরান, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া এতে অঙ্ক নিয়েছিল। ২০২০ সালের ফেব্রূয়ারিতে ইমরান কুয়ালালামপুর সফর করে মালয়েশিয়ার নেতা মাহাথির মোহাম্মদের সাথে সম্পর্ক মেরামত করেছেন।

তুরস্ক-পাকিস্তানের সম্পর্কের যে উন্নতি হচ্ছে, তার সর্বশেষ প্রমাণ হলো গত সপ্তাহে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের ইসলামাবাদ সফর। শুক্রবার পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দেয়া এক বক্তৃতায় এরদোগান বলেন: ‘তুরস্ক বিশ্বাস করে যে, দমনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে কাশ্মীর ইস্যুর সমাধান হবে না। এ জন্য ন্যায় বিচার আর শান্তির নীতি লাগবে’। তিনি আরও বলেন, তুরস্ক জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে প্রকাশ্যেই বলেছে যে কাশ্মীরিদের সংগ্রাম ন্যায্য এবং ওআইসির সকল বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেছে তারা।

পাকিস্তানীরা স্মরণ করেন যে, ২০০৫ সালে আজাদ কাশ্মীরে যখন ভ‚মিকম্প হয়েছিল, তখন তুরস্ক ১০০ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা এবং ৫০ মিলিয়ন ডলারের ত্রাণ সহায়তা, এক মিলিয়ন কম্বল, ৫০,০০০ টন ময়দা এবং ২৫,০০০ টন চিনি দিয়ে সহায়তা করেছিল।

পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক সম্পর্ক : চীনের পর তুরস্ক পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভ‚ত হওয়ার পর তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে, পাকিস্তান নৌবাহিনী ১৭ হাজার টনের একটি ফ্লিট ট্যাঙ্কার বহরে যুক্ত করে, যেটা তুরস্কের প্রতিরক্ষা কোম্পানি এসটিএমের সাথে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে জানা গেছে, করাচি শিপইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসে নির্মিত এটা এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় জাহাজ।
২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য চারটি করভেট জাহাজ সরবরাহের জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের একটি দরপত্র জিতে যায় তুরস্ক। এটাকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আঙ্কারা পাকিস্তানের কাছ থেকে এমএফআই-১৭ সুপার মুশহাক বিমান কিনছে, পাকিস্তানের সাবমেরিনগুলো আপগ্রেড করে দিচ্ছে এবং যৌথভাবে আরেকটি ফ্লিট ট্যাঙ্কার জাহাজ তৈরি করতে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তানের কাছে ৩০টি এটাক হেলিকপ্টার বিক্রির জন্য চুক্তি চ‚ড়ান্ত করেছে তুরস্ক।
রোহিঙ্গা ইস্যুর ভ‚মিকা : তবে, বৌদ্ধপ্রধান মিয়ানমার থেকে বহু লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর তুরস্ক আবারও বাংলাদেশের দৃশ্যপটে আসে। ভারত আর চীন যখন সুস্পষ্টভাবে মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছিল, তখন উদারভাবে অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়েছে আঙ্কারা। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থনে জাতিসংঘ, জি২০, এমআইকেটিএ (মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, এবং অস্ট্রেলিয়া), ওআইসি ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক ফোরামে তুরস্ক ব্যাপক ক‚টনৈতিক প্রচারণা চালিয়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে, প্রেসিডেন্ট এরদোগানের স্ত্রী এমিনে এরদোগান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু এবং পরিবার ও সামাজিক নীতি বিষয়ক মন্ত্রী ফাতমা বেতুল সায়ান কায়া কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প প্রদর্শন করেন। টার্কিশ কো-অপারেশান অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশান এজেন্সি (টিআইকেএ), ডিজ্যাস্টার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এএফএডি), টার্কিশ রেড ক্রিসেন্ট, ডিরেক্টরেট অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স (ডিয়ানেট), এবং তুরস্কের বিভিন্ন এনজিও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দরিদ্র মানুষের জন্য ক্যাম্প, হাসপাতাল, স্কুল, এতিমখানা এবং ফ্যাসিলিটি নির্মাণ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ-তুরস্ক সামরিক সম্পর্ক : বাংলাদেশ ও তুরস্কের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যদিও এখনও দুর্বল এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ যেখানে মাত্র ৮০০ মিলিয়ন ডলারের মতো, এরপর দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক যথেষ্ট বেড়েছে। ২০১৩ সালে তুরস্ক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অটোকার কোবরা হালকা সাঁজোয়া যান সরবরাহ করে। ২০১৫ সালে তুরস্ক বাংলাদেশকে সরকার পর্যায়ে গাইডেড মিসাইলবাহী ফ্রিগেট কেনার প্রস্তাব দেয়। ২০১৮ সালে, তুরস্কের ফার্ম ডেলটা ডিফেন্সকে এক বিলিয়ন ডলারের ৬৮০টি হালকা সাঁজোয়া যান তৈরির কাজ দেয়া হয়। ২০১৯ সালের মার্চে, মাঝারি পাল্লার এক রেজিমেন্ট গাইডেড মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সরবরাহের দায়িত্ব পায়। বাংলাদেশের নৌবাহিনী তুরস্কের নৌবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যারা বাংলাদেশের সবচেয়ে চৌকষ নৌ ইউনিট সোয়াদকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের তিন হাজারের বেশি সামরিক কর্মকর্তা এ পর্যন্ত তুরস্কে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

তুরস্ক-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক : তুরস্ক শ্রীলঙ্কারও দ্বারস্থ হচ্ছে, কারণ ভারত মহাসাগরে কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীলঙ্কা যেখানে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো প্রতিদ্ব›দ্বী দেশগুলো সুবিধা অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। মানবাধিকার ইস্যুতে পশ্চিমাদের থেকে কলম্বো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং তাদের সাথে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের বিষয়গুলোকে কাজে লাগাতে চায় তুরস্ক।

নয়াদিল্লী-ভিত্তিক তুরস্কের রাষ্ট্রদূত দেমেত সেকেরকিয়োগলুর সা¤প্রতিক কলম্বো সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসা তুরস্ককে অনুরোধ করেছেন যাতে তারা শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাতের উন্নয়নে সহায়তা করে কারণ টার্কিশ এয়ারলাইন্সের বিমান প্রতিদিনই শ্রীলঙ্কায় যাতায়াত করছে। দুই পক্ষ প্রতিরক্ষা খাত নিয়েও আলোচনা করেন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ব্যাপারেও সম্মত হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সেকেরকিয়োগলু রাজাপাকসাকে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট এরদোগান আবার শ্রীলঙ্কা সফরে আগ্রহী। ২০০৫ সাল সর্বশেষ শ্রীলঙ্কা সফর করেন এরদোগান। ২০০৪ সালের এশিয়ান সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সফরের অংশ হিসেবে তখন শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলেন তিনি। সে সময় সুনামি-আক্রান্ত দক্ষিণ শ্রীলঙ্কায় ৪৫০টি বাড়ির সমন্বয়ে গঠিত একটি গ্রাম নির্মাণ করে দিয়েছিল তুরস্ক। সূত্র : সাউথ এশিয়ান মনিটর।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (9)
কায়সার মুহম্মদ ফাহাদ ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৭ এএম says : 0
Wish you all the best, Turkey.
Total Reply(0)
Jakir Bhuiyan ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৭ এএম says : 0
সুন্দর ভ্রাতৃত্ববোধ সম্পর্ক আল্লাহ কবুল করুক! আল্লাহ উত্তম ফয়সালাকারি !
Total Reply(0)
অহেদুল তালুকদার ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৭ এএম says : 0
এক হও মুসলমান! !
Total Reply(0)
Mohammad Mayinuddin ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৭ এএম says : 0
দক্ষিন এশিয়ায় তুর্কিদের আসাটা জরুরি। এখন তুর্কিদের সাহায্য আমাদের দরকার ও আমাদের সাহায্য তুর্কিদের প্রয়োজন।
Total Reply(0)
Imam Hasan ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৮ এএম says : 0
Most welcome
Total Reply(0)
Selim Rahman ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৮ এএম says : 0
আশাব্যাঞ্জক খবর।
Total Reply(0)
Md Balal ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৮ এএম says : 0
বাংলাদেশের উচিৎ তুরস্কের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা
Total Reply(0)
Monayem Hussain ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ২:১৮ এএম says : 0
তুরস্কের আগমনকে স্বাগতম জানাই
Total Reply(0)
jack ali ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:১১ পিএম says : 0
All the non-believers united under one banner against Islam and also so called muslim leader those who rule muslim populated country... as a result muslims are the victim of genocide/ousted from their home/victim of rape and many other crime committed against muslim... still muslims are not united... Allah mentioned in the Qur'an several places that muslim must be united under one banner which is Islam.
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন