বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮ আশ্বিন ১৪২৮, ১৫ সফর ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

কিশোর-তরুণদের আত্মহত্যা নয় আত্মজাগরণের পথ দেখাতে হবে

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২:০৩ এএম

মহাজগতের স্রষ্ঠা আল্লাহ তা’আলা মানুষকে ধৈর্য্যশীলতা অর্জনের জন্য পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। কোরআনের ঘোষণা, নিশ্চয়ই আমি ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছি। বিশ্বের জ্ঞানী-গুণী দার্শনিকরাও ধৈর্য্যশীলতাকে সব সমস্যার প্রতিকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিশ্বাসী মানুষদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, লা-তাহ্জান, হতাশ হইওনা। কোরআনের এই নির্দেশনা প্রতিটি বিশ্বাসী মানুষকে কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার ঐশী অনুপ্রেরণা যোগায়। পশ্চিমা দুনিয়ার ভোগাবাদী সমাজে অঢেল প্রাচুর্যের মধ্যেও অসংখ্য মানুষকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখা যায়। সেখানে আমাদের মত অতিদরিদ্র সমাজের বিশ্বাসী মানুষগুলো ক্ষুধা-দারিদ্র্য, দুর্ভীক্ষ, যুদ্ধ-হানাহানি, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে বিপন্ন হয়েও অদম্য স্পৃহায় কঠিন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার অনুপম ঐতিহ্য ও উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা কাপুরুষ ছিলেন না, হতাশ ছিলেন না। তারা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙ্গতে শত বছরের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রচনা করেছেন। আর সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুকঠিন দায়িত্ব আমাদের এবং উত্তরসুরীদের। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে হতাশা ও পলায়ণপর মনোবৃত্তি বিস্তার লাভ করছে, তা আমাদের পুরো সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা, ভঙ্গুরতা, অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে। একদিকে আমরা অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দাবী করছি, অন্যদিকে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষিত-অশিক্ষিত তরুণ-তরুনী দেশ থেকে পালিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে দেশ ছেড়ে বিদেশে আশ্রয় নিতে গিয়ে অনেকের ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হচ্ছে। উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দিতে গিয়ে পিতা-মাতা আত্মীয় পরিজনের লালিত স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকেই তারা সমুদ্রে ডুবিয়ে দিচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এসে বাংলাদেশ যখন অন্যতম আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার পাশাপাশি দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় তরুণদের একটা বড় অংশ দেশেই থাকতে চাইছে না! আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশগুলো থেকে সেসব দেশের নাগরিকরা প্রাণভয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে চাইছে। সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান থেকে নাগরিকরা যখন সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে, তাদের সাথে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিকদেরও দেখা যাচ্ছে। গত মে মাসে ভূমধ্য সাগরে নৌকাডুবিতে নিমজ্জমান ৬৮ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছিল তিউনিসিয়ার কোস্টগার্ড। বেশকিছু বাংলাদেশি নাগরিকের হদিস পাওয়া যায়নি। জুন মাসে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার পথে চার শতাধিক অভিবাসন প্রত্যাশী যাত্রীকে উদ্ধার করে লিবিয়ার কোস্টগার্ড। এদের মধ্যে ১৬৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক। এসব খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে স্থিতিশীল, উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য এটা অনেক বড় লজ্জার বিষয়।

মানুষ যখন চরম মাত্রায় বৈষয়িক ও ভোগবাদিতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন সম্পদের মোহ তার নিজের জীবনের চেয়েও কাক্সিক্ষত বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। এর পেছনে রয়েছে দেশে সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সংকট। এসব অবক্ষয় আমাদের নতুন প্রজন্মের মনোজগতে এক ধরণের বিকার গ্রস্ততার জন্ম দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা এবং কিশোর গ্যাং কালচার বৃদ্ধি পেয়েছে। পারিবারিক শৃঙ্খলা ও পরিচর্যার মধ্যে বেড়ে ওঠা কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে করোনাকালীন বাস্তবতায় দেশের অধিকাংশ শিশু-কিশোর কোনো না কোনো আসক্তিতে নিমজ্জিত হয়েছে। দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় মোবাইল ফোন আসক্তি, মাদকাসক্তি, বিদেশি বিকৃত সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে টিকটক, পুলপার্টি, কিশোর গ্যাংয়ের মত অপরাধ প্রবণ সংঘ গড়ে তুলেছে কিশোর-তরুণরা। এসবের বাইরে আরেকটি গ্রুপ মানসিক বিষন্নতার শিকার হয়ে পড়ছে এবং এদের কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সম্প্রতি লাইফস্প্রিং নামের একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক বেসরকারী সংস্থার পরিচারিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। বছরে ক্রমবর্ধমান এ সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক। সবচেয়ে আতঙ্কজনক বিষয় হচ্ছে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া। আঁচল ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থার গবেষনা জরিপে করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে জানা গেছে। ইউনেস্কো, ইউনিসেফের মত বিশ্ব সংস্থার পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশু-কিশোরদের মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছিল। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, শিশুপার্ক, ওপেন স্পেস বা প্রাকৃতিক পরিবেশে বিনোদনের সুযোগ না থাকায় শিশু-কিশোরদের মনোজাগতিক বিকাশ চরমভাবে চাপ ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা তাদের বিষন্নতা ও হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার শেষ চেষ্টা বা বিকৃত অ্যাডভেঞ্চারিজম দ্বারা তাড়িত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তাদেরকে বেঁচে থাকার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক চিন্তা ও ধারণা দিতে সক্ষম হয়নি। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা শিথিল হয়ে পড়া ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোররা। বিচ্ছিন্নভাবে কাউন্সেলিং করে এ অবস্থার উন্নয়নে খুব বেশি সফলতা প্রত্যাশা করা যায় না। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পৃক্ত করে আমূল ঢেলে সাজানো। পরিবারে শান্তি-শৃঙ্খলা, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সহমর্মিতা ও আস্থাপূর্ণ পরিবেশ ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পিতা-মাতা ও সন্তানদের মধ্যে ধৈর্য্যশীলতা ও আধ্যাত্মবোধের শিক্ষাকে জাগ্রত করতে হবে।

সামরিক প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের একনম্বর শক্তিশালী মার্কিন সেনাবাহিনী ও পশ্চিমা সম্মিলিত সামরিক জোট ন্যাটো বাহিনীর সাথে বিরতিহীনভাবে ২০ বছর যুদ্ধ করে তালেবানরা আফগানিস্তানের শাসনক্ষমতায় ফিরে এসেছে। মাত্র ৭০ হাজার দরিদ্র তালেবান যোদ্ধা ন্যাটো বাহিনীর বিমান হামলা ও সাঁড়াশি আক্রমণে অসংখ্য সহযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের হারিয়েও দমে যায়নি। তারা আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসে স্থির থেকে দেশের জন্য লড়াই করে যাওয়াকেই জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। সেখানে তারা জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধানকে বড় করে দেখেনি। মার্কিন ও পশ্চিমা বাহিনীর পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পুনর্গঠিত আফগান সেনাবাহিনীর কয়েক লাখ সদস্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত একেকটি ভারসাম্যহীন অভিযানে সফল হওয়ার পেছনে ছিল তাদের মৃত্যুভয়কে জয় করার অলৌকিক অনুপ্রেরণা। অন্যদিকে, মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং বিপুল পরিমান বেতনভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও প্রতিমাসে শত শত মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর সদস্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত একটি অন্যায় যুদ্ধে হাজার হাজার নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক, নারী ও শিশু হত্যার সাথে জড়িত সৈনিকরা মানসিকভাবে দুর্বল থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বলা হয়, নাইন-ইলেভেন বিমান হামলায় নিউইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। অন্যদিকে, ২০ বছরে আফগানযুদ্ধে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট খরচের পাশাপাশি মার্কিন সেনাসদস্য নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এ সময়ে আফগান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মার্কিন সেনাদের আত্মহত্যার সংখ্যা তিরিশ হাজারের বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা জরিপে ৩০ হাজার ১৭৭ জন মার্কিন সেনা সদস্য আত্মহত্যা করেছে বলে উল্লেখ করা হলেও সখ্যাটি আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে। তবে যুদ্ধের ট্রমা এবং মানসিকভাবে বিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত সেনা সদস্যের সংখ্যা এর বহুগুণ বেশি। পক্ষান্তরে, তালেবান বাহিনী বা যুদ্ধের ভিকটিম আফগান নাগরিকদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বিরল বা নেই বললেও চলে।

অপেক্ষাকৃত অনেক সম্পদশালী, শক্তিশালী আমেরিকান সেনা সদস্যরা আফগানিস্তানের যুদ্ধে হেরে যাওয়ার মূল কারণই হচ্ছে, সৈনিকদের মনস্তাত্ত্বিক শক্তির ভারসাম্যহীনতা। যুদ্ধের লক্ষ্য যদি সৈনিকের জীবনদানের যৌক্তিকতাকে নৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে, সেনা সংখ্যা যত বেশি আর শক্তিশালী হোক না কেন, যুদ্ধে হারবেই। সামরিক যুদ্ধে যেমন এ কথা প্রযোজ্য, একইভাবে জীবনযুদ্ধেও তা সমভাবে প্রযোজ্য। যে দেশের শিশু-কিশোররা পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করাকে জীবনের পরাজয় ভেবে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, যে দেশের তরুণরা শিক্ষার সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট গ্রহণের পরও বছরের পর বছর ঘুরে চাকরি না পেয়ে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকাকে অর্থহীন মনে করে, যে দেশের আমলা, পুলিশ অফিসার, রাজনীতিবিদ ও বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা দেশের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করে এবং সেখানে সেকেন্ড হোম গড়ে তোলে, সে দেশের বেকার তরুণরা জীবন বাজি রেখে বিদেশে পাড়ি জমাবে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু আমরা যারা দেশে উন্নয়নের জিকির তুলছি, তাদেরকে উন্নয়নের সঠিক সংজ্ঞা ও মানদন্ড সম্পর্কে বুঝতে হবে। দেশের রাজধানী শহরটি বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। শহরের বাতাসে কার্বনডাই-অক্সাইড, কার্বন মোনোক্সাইড, মারাত্মক বিষাক্ত ধুলিকণার পরিমান গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। প্রতিটি নদী দূষণে-দখলে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এ দেশের অধিকাংশ পরিবারে, সমাজে-রাষ্ট্রে শিশু-কিশোরদের সামনে কোনো সর্বজনগ্রাহ্য আইকন নেই, লাখ লাখ কিশোর-তরুণ হতাশ হয়ে মনোবিকলনের শিকার হচ্ছে, মাদকাসক্ত ও অপরাধপ্রবণ হয়ে সমাজকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। তাদের সামনে বেঁচে থাকার ঐশ্বর্য ও আদর্শ তুলে ধরার দায়িত্ব যাদের পালন করার কথা, তারাই এখন শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করে দিয়ে বসে আছে। এ থেকে উত্তরণের পথ এখন নতুন প্রজন্মকে খুঁজতে হবে। আত্মহত্যার মত ভীরুতা ও পাপচিন্তা বা দেশত্যাগ নয়, তাদেরকে আত্মজাগরণের বীজমন্ত্রে উদ্দীপ্ত করে তুলতে হবে।

শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান ও প্রায় শতভাগ ধর্মবিশ্বাসী মানুষের দেশে নতুন প্রজন্ম এতটা বস্তুবাদী, হতাশ ও আত্মহত্যা প্রবণ হতে পারে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যক্রম থেকে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পৃক্ত বিষয়গুলোকে ক্রমাগত বাতিল করে শিক্ষাঙ্গণকে শুধুমাত্র দক্ষ শ্রমিক, আমলা, ব্যাংকার, কেরানি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট তৈরীর কারখানার মত সার্টিফিকেট সর্বস্ব করে তোলার মধ্য দিয়ে সর্বব্যাপী এক সামাজিক অবক্ষয়কে জোরদার করা হয়েছে। ধৈর্য্যশীলতা, পরার্থপরতা, নি:স্বার্থ সেবার মনোভাব ও বস্তুবাদিতা-ভোগবাদিতার কুফল এবং পারলৌকিক পরকালীন মুক্তির পথ ও পাথেয় সম্পর্কে যদি শিক্ষা কারিক্যুলামে না থাকে, তবে এমন প্রজন্মকে নিজের শেকড় সম্পর্কে বেখেয়াল, স্বার্থপর বিদেশি সংস্কৃতির অনুকরণপ্রিয় ও অপসংস্কৃতি প্রভাবিত করে তোলা খুবই সহজ। জাতির দুর্দিনে লড়াই করে বেঁচে থাকার মহৎ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তাদের সামনে থাকে না। পালিয়ে বাঁচতে গিয়ে তারা সলিল সমাধির শিকার হয়। বিভিন্ন দেশের কারাগারে হাজার হাজার অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী জেল খাটছে। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপে বিদেশের কারাগারে আটক বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রামরুর তথ্য অনুসারে, গত এক দশকে সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার পথে নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি। আর পাচার হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার বাংলাদেশি। মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে বেড়ানো অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা কত তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। এ সংখ্যা আটক হওয়া সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। মাত্র ৭০ হাজার তালেবান যোদ্ধার কাছে বিশ্বের সর্বাধুনিক অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিমা বহুজাতিক বাহিনীর পরাজয় ঘটেছে। অর্থনৈতিকভাবে আফগানরা আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও তারা উন্নত জীবনের খোঁজে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। আমাদের তরুণরা যেনতেন প্রকারে দেশ ছাড়তে চায়, আমাদের শহুরে কিশোরদের একটা অংশ অপরাধে জড়িয়ে কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার সময়ে শত শত কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। করোনাকালে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে নি:স্ব অতি দরিদ্র শ্রেণীতে সামিল হয়েছে। অন্যদিকে, এ সময়ে দেশের ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি। এভাবেই অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য আর নতুন প্রজন্মকে চরম হতাশার মধ্যে ঠেলে দিয়ে আমরা তথাকথিত উন্নয়নের রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈতরণি পার হচ্ছি। এ থেকে জাতিকে মুক্ত করে দেশকে সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতি ও প্রগতির পথে নিয়ে যেতে হলে প্রথমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার মানদন্ডে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
bari_zamal@yahoo.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
Dadhack ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১১:৩৫ এএম says : 0
আল্লাহর আইন দিয়ে দেশ চলে মানুষ এভাবে বিদেশে যেত না... কাফেরদের চাকচিক্য দেখে আমাদের মানুষ বিদেশ যেত না..... প্রচুর জনগণ আছে যদি কারিগরি শিক্ষা থাকতো আমাদের দেশে তাহলে আমরা আমাদের নিজের প্রয়োজনে সবকিছু তৈরি করতাম বিদেশ থেকে একটা জিনিস আমদানী করতে না তখন এই যুবকরা সবাই চাকরি পেতো যারা দেশ চালায় তারা হচ্ছে দুর্নীতি পরায়ন তাদের নীতি হচ্ছে কিভাবে বছরের পর বছর ক্ষমতা ধরে রেখে মানুষের কষ্টের অর্জিত ট্যাক্সের টাকা লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার জন্য
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন