সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯, ২৬ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবদুল মুহিতের দাফন আজ সিলেটে

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৬ মে, ২০২২, ১২:০৬ এএম

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সিলেটে শহরের রায়নগরে পারিবারিক কবরস্থানে আজ রোববার দাফন করা হবে। গতকাল শনিবার ঢাকার গুলশানে আজাদ মসজিদে জানাজা শেষে তার ছোট ভাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন একথা জানান। তিনি বলেন, আমাদের পৈত্রিক বাড়ি সাহেব বাড়ির পেছনে আমাদের গোরস্তান আছে। যেখানে আমাদের বাবা, মা, দাদা-দাদি সবার কবর রয়েছে। সেখানে উনাকে দাফন করা হবে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত শুক্রবার রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। আবুল মাল আব্দুল মুহিত একজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক ও ভাষাসৈনিক ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এরশাদের শাসনামলে তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পীকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বরা।

গতকাল শনিবার গুলশান আজাদ মসজিদে আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় নামাজে জানাজা জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সেটি স্থগিত করা হয়। গুলশান আজাদ মসজিদে প্রথম জানাজার পর তার কফিনে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। এরপর দাফনের জন্য লাশ নেওয়া হয় সিলেটে। আজ রোববার রায় নগরের পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মা-দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন জানান, নগরীর ধোপাদিঘীর পাড়স্থ সাবেক অর্থমন্ত্রীর বাসভবনে জানাজা ও দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জরুরি বৈঠক করে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ। অতপর দুই দিনের শোক ঘোষণা করা হয়।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্ম গ্রহণ করেন। তার মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী ও বাবা আবু আহমদ আবদুল হাফিজের ১৪ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন তার ছোট ভাই।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি অংশ নিয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনে। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন এবং সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বিদেশে চাকরিরত অবস্থায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। আবদুল মুহিত ১৯৫৬ সালে যোগ দিয়েছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব ছিলেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসে যোগদান করেন। ছিলেন পাকিস্তান কর্মপরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপ-সচিব। ওয়াশিংটন দূতাবাসে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনের সময় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। তিনি ১৯৭১ সালে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকনমিক কাউন্সেলরের দায়িত্বে ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মুহিত। ১৯৮১ সালে আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থনীতি এবং উন্নয়ন বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থা বা ইফাদেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮২-১৯৮৩ সালে এরশাদ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন মুহিত। পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), আইডিবি ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০২ সালে আবুল মাল আবদুল মুহিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহা ঐক্যজোটের মনোনয়নে সিলেট-১ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হন। সেবার পরাজিত হলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন। ২০০৯ জানুয়ারি ৬ তারিখে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় সংসদে টানা ১০ বছর বাজেট উপস্থাপন করেন।

আবদুল মুহিত ২০২১ সালের ২৫ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হন। গত মার্চের শুরুতে আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন কিছুদিন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ১৪ মার্চ সিলেট ঘুরে আসেন। সিলেট সিটি করপোরেশন ১৬ মার্চ তাকে ‘গুণীশ্রেষ্ঠ সম্মাননা’ দেয়।

দেশের অর্থনীতিতে মুহিতের অবদান অপরিসীম : তথ্যমন্ত্রী
তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের অবদান অপরিসীম। মুহিতের মৃত্যুতে আমরা দেশের অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রাখা একজন বিজ্ঞ ও ভদ্র মানুষকে হারালাম।

গতকাল শনিবার রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সদ্যপ্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিক আবুল মাল আবদুল মুহিতের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণকালে সাংবাদিকদের তথ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক ছিলেন। বাংলাদেশ যে আজ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে, সব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ যে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সর্বোতভাবে সহায়তা করেছেন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আবুল মাল আবদুল মুহিতের মাধ্যমে দেশে মোট ১২টি বাজেট পেশ হয়েছে। যার মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের ১০টি বাজেট দিয়েছেন একাধারে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ও এ প্রাজ্ঞ মানুষটি। ভব্যতা-ভদ্রতাসহ অনেক কিছু তার কাছে শেখার ছিল উল্লেখ করে হাছান মাহমুদ বলেন, কনিষ্ঠ ও অনুজদের মুহিত ভাই যেভাবে আপন করে নিতেন, তা ছিল অভাবনীয়। তার মৃত্যু আমাদের দেশ ও দলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণকারী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বর্তমান সিলেট শহরের ধোপা দিঘির পাড়ে পৈতৃক বাড়িতে। ২০০৯ সাল থেকে টানা ১০ বছর তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৮৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগদানকারী মুহিত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন ও যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps