মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

অভ্যন্তরীণ

দেশের দীর্ঘতম ‘ভাসমান সেতু’ এখন উৎসবস্থল

শাহেদ রহমান, যশোর থেকে | প্রকাশের সময় : ১৫ মে, ২০২২, ১২:০৫ এএম

যশোরের মণিরামপুর দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। এই উপজেলার ঝাঁপা গ্রামবাসী নিজেদের উদ্যোগে সিমেন্ট বালি কিম্বা লোহা নয়, প্লাস্টিকের ব্যারেল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে প্রায় আধা কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেশের দীর্ঘতম ভাসমান সেতু। গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে এবং নিজেদের অর্থায়নে নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন ভাসমান সেতুটি। যা দেখতে প্রতিদিন আশেপাশের হাজার হাজার দর্শনার্থী ভীড় করছেন।
ঝাঁপা বাঁওড়ের ওপর দৃষ্টিনন্দন ভাসমান সেতু নির্মাণ করে বিপ্লব ঘটিয়েছে। সেতুটির মাধ্যমে বাঁওড়ের দুই তীরের হাজার হাজার মানুষের যোগাযোগে এক নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়েছে। আট ফুট চওড়া ও এক হাজার মিটার দৈর্ঘের ভাসমান সেতুটি নির্মাণ করতে ব্যবহার করা হয়েছে ৮৮৯টি প্লাস্টিকের ড্রাম, ৮শ’ মণ লোহার পাত ও ২শ’৫০টি লোহার শিট। খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। সময় লেগেছে প্রায় একবছর। ভাসমান সেতুর উদ্ভাবক মাদরাসা শিক্ষক আসাদুজ্জামান তার বন্ধু সেতু নির্মাণের উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান টুটুল স্থানীয় লেদ কারখানার মিস্ত্রি ও সহকর্মীদের সহায়তায় অসাধ্য কাজটি সম্পন্ন করেছেন।
মণিরামপুর উপজেলার অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা রাজগঞ্জ বাজার। এই বাজার সংলগ্ন বৃহত্তর বাঁওড় ঝাঁপা গ্রাম। ঝাঁপা রাজগঞ্জ বাজারসহ উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। গ্রামটির তিন পাশ এই বাঁওড় ও একপাশ কপোতাক্ষ নদ দ্বারা বেষ্টিত। গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে নৌকায় চড়ে যাতায়াত করতে হতো। শিক্ষার্থীরা নৌকা চেপে ঝুঁকি নিয়ে বাঁওড় পার হতো। ঝড় বৃষ্টি কিম্বা বৈরী আবহাওয়ায় রুদ্ধ হয়ে যায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যমটিও। এতে অনেক সময় মুমূর্ষু রোগী কিম্বা জরুরী কাজে অন্যত্র যাওয়া মানুষকে পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। এমন পরিস্থিতিতে ঝাঁপা গ্রামবাসী বাঁওড়ের উপর একটি সেতু নির্মাণ করার জন্য একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদনও করেছেন। কিন্তুু তাতে কোন সুফল মেলেনি।
ভাসমান এ সেতু নির্মাণের অন্যতম উদ্যোক্তা মাদরাসা শিক্ষক আসাদুজ্জামান জানান, বাঁওড় পাড়ে বসে টুটুলসহ কয়েকজন বন্ধু গল্প করছিলেন। এসময় বাঁওড়ে মেশিন দিয়ে বালি তোলা হচ্ছিল। সেই মেশিনটি রাখা হয়েছিল প্লাস্টিকের ব্যারেলের ওপর ভাসমান অবস্থায়। এ দৃশ্য দেখে সেতু নির্মানের পরিকল্পনা করেন তারা। এরপর গ্রামবাসীর সাথে বৈঠক এবং তহবিল গঠনের কাজ শুরু করেন ওই বন্ধুরা। গ্রামের মোট ৬০ ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা নিয়ে তহবিল গঠন করে স্থানীয় লেদ শ্রমিকদের সহায়তায় প্লাষ্টিকের ব্যারেল আর স্টীলের পাত দিয়ে নির্মান করা হয় এক হাজার ফুট দৈর্ঘ্যরে এই ভাসমান সেতু। সেতুটি উদ্বোধনের ফলে ঝাঁপা বাঁওড়ের দু’পাশের প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মধ্যে চলাচলের সেতুবন্ধন হলো। বর্তমানে সেতুটির উপর দিয়ে ভ্যান, রিকশা ও ইজিবাইকসহ হালকা যান চলাচল করতে পারবে।
এদিকে আগত দর্শকদের কেন্দ্র করে বাঁওড় পাড়ে গড়ে উঠেছে মোটরসাইকেল ও গাড়ি পার্কিং এলাকা, নাগরদোলা, খাবারে দোকান, চটপটি-ফুচকা, বাচ্চাদের খেলনা ও ফুলের দোকান। মনোরম পরিবেশের ঝাঁপা বাঁওড় ঘুরতে ট্রলার ও নৌকার ব্যবস্থা আছে।
যশোরের জাহিদ হাসান বলেন, ‘বন্ধুদের সাথে ঘুরতে আসা হয় মাঝে মাঝে। অনেক নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশ। প্রকৃতি এতোটা কাছ থেকে দেখতে ভালোই লাগে।’
সেতু কমিটির সভাপতি আব্দুল জলিল সরদার বলেন, গ্রামবাসী মিলে এই ভাসমান সেতুটি নির্মাণ করেছি। শুধু যাতায়াত নয়; সেতু ঘিরে মানুষের উর্পাজন বেড়েছে। তাছাড়া বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে দেশজুড়ে।
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ভাসমান সেতুকে ঘিরে যেন জনস্রোত নামে। শুক্র ও শনিবারসহ ঈদের পরে দিনগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরের পদচারনায় মুখরিত থাকে গোটা এলাকা।’
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ‘মনিরামপুরে ঝাঁপা ভাওড় ভাসমান সেতু ঘিরে অনেক মানুষ জীবন জীবিকা চলছে। এখানে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ আছেন ঘুরতে। শুধু বিনোদনী নয়; দুই পাড়ের মানুষের যাতায়েতের সুব্যবস্থা হয়েছে সেতুটির মাধ্যমে।’

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps