রোববার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৯ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

মুক্তাঙ্গন

ভাস্কর্যপ্রীতি ও ইতিহাস : পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

| প্রকাশের সময় : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মাওলানা রেজাউল কারীম দরবস্তী : পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-এর জীবদ্দশায় এবং তারপর অনেকদিন পর্যন্ত আদম (আ.)-এর বংশধরদের ধর্মবিশ্বাসে কোনো প্রকার শিরক বা কুফরের সংমিশ্রণ ছিলো না। তারা সবাই একত্ববাদের (তাওহিদ) অনুসারী ছিলেন। আদম (আ.)-এর শরিয়তের অধিকাংশ আদেশ নিষেধ ছিলো বৈষয়িক বিষয়ে। কারণ পৃথিবীকে নতুন করে আবাদ করতে এবং এটিকে বাসযোগ্য করতে গার্হস্থ্য বিষয়ের প্রয়োজনই ছিলো বেশি। এ কারণে আদম (আ.)-এর বংশধরদের মাঝে ধর্ম নিয়ে তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি।
কিন্তু আদম (আ.)-এর মৃত্যুর পর কালের বিবর্তনে মানুষের মধ্যে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে। তার পরলোকগমনের হাজার বছর পর হযরত নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায় ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরা নামের কয়েকজন মৃত নেককার লোকের পূজা শুরু করে। তাদের পূজায় লিপ্ত হওয়ার ধাপগুলো সম্পর্কে মুহাম্মাদ ইবনু কায়েস বলেন, ওয়াদ ছিলেন নুহ পূর্বকালীন সময়ের সবচেয়ে নেককার ও বুজুর্গব্যক্তি। লোকেরা তাকে খুবই ভালোবাসতো ও সম্মান করতো। সে মারা যাওয়ায় লোকেরা খুব কষ্ট পেলো এবং তার কবরের পাশে জড়ো হয়ে আহাজারি করতে লাগলো। ইবলিস শয়তান তাদের এ অবস্থা দেখে এক ফন্দি আঁটলো। সে মানুষের আকৃতি ধরে এসে বললো, এ লোকের জন্য তোমাদের কী বেদনা তা আমি লক্ষ্য করেছি। আমি কি তোমাদেরকে তার এমন একটি প্রতিকৃতি বানিয়ে দিবো যা তোমরা তোমাদের মিলনকেন্দ্রগুলোতে রেখে দিবে এবং এর মাধ্যমে তোমরা তার কথা স্মরণ করবে। এইসব নেককার মানুষের ভাস্কর্য সামনে থাকলে তাদের দেখে আল্লাহর প্রতি ইবাদতে অধিক আগ্রহ সৃষ্টি হবে। লোকেরা তার কথায় খুশি হয়ে তাকে তার প্রতিকৃতি বানিয়ে দিতে বললো, যাতে তারা তাকে চোখের সামনে দেখে তার জন্য শোক করতে পারে, তাকে স্মরণ করতে পারে। এভাবে শয়তান তাদের জন্য ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরা নামের পুণ্যাত্মাব্যক্তিদের প্রতিকৃতি বানিয়ে দেয় এবং লোকজন তাদের প্রতিকৃতি সামনে রেখে তাকে স্মরণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে অনেকে তাদেরকে অসিলা বানিয়ে পরকালের সাফল্য ও মুক্তির আশায় তাদের পূজা শুরু করে। কালক্রমে তাদের সন্তানেরা তাদের এ সমস্ত কাজ দেখতে লাগলো। ধীরে ধীরে বংশবৃদ্ধি হতে লাগলো। নতুন প্রজন্ম আস্তে আস্তে ওই মূর্তি তৈরির আসল উদ্দেশ্যটিই ভুলে গেলো। তারা মৃত পুণ্যবান লোকটিকে নয়, এই মূর্তিকেই শ্রদ্ধা করতে লাগলো এবং মূর্তিকে বিভিন্ন ক্ষমতার অধিকারী মনে করে এটার পূজা করতে লাগলো। আর এভাবেই মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম মূর্তি পূজার সূচনা হলো।
এ পাঁচজন মাহাত্মালোকের ভাস্কর্যের প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে প্রোথিত হয়েছিলো যে, তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এবং পারস্পরিক চুক্তি সম্পাদনকালে তাদের নাম উল্লেখ করতো। সম্প্রদায়ের এইরূপ পতন দশায় আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য নুহ (আ.)-কে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেন। (সূত্র : সূরা আরাফ, আয়াত ৬১, তাফসির ইবনে কাসির, বুখারি- ইবনে আব্বাস থেকে প্রায় অনুরূপ বর্ণনা)।
আরবের ইতিহাসে দেখা যায়, এ মূর্তিগুলোর পূজা পরবর্তীকালে আরবদের মধ্যেও চালু ছিলো। ওয়াদ’ ছিলো বনু কালবের জন্য দুমাতুল জান্দালে। সুওয়া ছিলো বনু হোজায়েলের জন্য। ইয়াগুছ ছিলো বনু গুত্বায়েফের জন্য জুরুফ নামক স্থানে। ইয়াউক ছিলো বনু হামদানের জন্য এবং নাসরা ছিলো হিমইয়ার গোত্রের বনু জি-কালা’র জন্য। পৃথিবীর প্রাচীনতম শিরক হলো নেককার মানুষের কবর অথবা তাদের মূর্তিপূজা। যা আজও প্রায় সকল ধর্মীয় সমাজে চালু আছে এবং বর্তমানে যা মুসলিম সমাজে স্থানপূজা, কবরপূজা, ছবি-প্রতিকৃতি, মিনার ও ভাস্কর্য পূজায় রূপ নিয়েছে।
এরপর হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর যুগে মানুষ চন্দ্র সূর্যের পূজা করতে লাগে, হযরত মূসা (আ.)-এর উম্মতের অনেকে গাভীর পূজা করতে শুরু করে। এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উদাহরণ যীশুর মূর্তি। আজকের খ্রিস্টানরা গির্জায় স্থাপিত যীশুর মূর্তির সামনে গিয়েই নতজানু হয়, তার কাছেই কায়মনে প্রার্থনা করে, কোনো কিছু কামনা করে।
তারা জানে যে এই মূর্তির কোনো কার্যক্ষমতা নেই, তবু তারা এটিকে নবী একটি সিম্বল বানিয়ে, ঈশ্বরের পুত্রের একটি উপমা বানিয়ে তার পূজা করছে। যীশুকে সত্য জানার পরও, তার আগমন, ধর্মপ্রচার, ঊর্ধ্বলোকগমন সব ইতিহাসে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানার পরও মানুষ তার মূর্তি বানিয়ে তাকে পূজা করা শুরু করেছে। আরব ইতিহাসে পাওয়া যায় যে, আমর বিন লোয়াই নামক ব্যক্তি সর্বপ্রথম মূর্তি বা ভাস্কর্য পূজার প্রচলন করে।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এখানের অধিকাংশ মানুষ একত্ববাদে বিশ্বসী। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এ দেশে অতি নগণ্য সংখ্যক। অপার সম্ভাবনার এই দেশের ওপর সাম্রাজ্যবাজী শকুনদের হিংস্র থাবা অব্যাহত। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মৌলিক ধর্মবিশ্বাস তথা ঈমান-আকিদার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রও অনেক পুরনো। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জেনারেশনকে তাদের ধর্মবিশ্বাস থেকে সরাতে পারলেই দেশ ও দেশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ সহজ। কাজেই, এদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিপন্থি অনেক কিছু এমনভাবে প্রচলন করা হচ্ছে, যে এগুলোর বিরোধিতা করার অধিকারকেও কেড়ে নেয়া হচ্ছে।
এদেশের বিভিন্ন স্থপনা, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা যাচ্ছে অনেক নেতা বা মহাত্মাবান ব্যক্তির ভাস্কর্য, প্রতিকৃতি, কবর, মাজার ও তাদের স্মরণে মিনার, স্তম্ভ, সৌধ বানিয়ে এগুলোকে রীতিমত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হচ্ছে। এসব ভাস্কর্য ও প্রতিকৃত বা প্রতিবিম্বগুলোকে বর্তমান সময়ে যেভাবে শ্রদ্ধা করার প্রথা শুরু হয়েছে, সেটা সেই আদী যুগের মহান ব্যক্তিদের ভাস্কর্য ও প্রতিকৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং আরব জাহিলীয়াতের মূর্তি পূজার সাথে মিল রয়েছে। কতিপয় ধর্মবিদ্বেষী বিশেষত ইসলাম বিরোধীদের প্রোপাগাÐার শিকার হচ্ছে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। ইহুদী, খ্রিস্টান, মুশরিক ও তাগুতের এ্যাজেন্টরা মুসলিম জাতির সর্বশেষ মেরুদÐ একত্ববাদের প্রতি ঈমানকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে মুসলমানের ঘরে ঘরে ভাস্কর্য ও মূর্তির ভালোবাসার জালকে এমনভাবে বিস্তার করছে, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলে শরীর শিউরে উঠে। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম কি তাহলে একত্ববাদের বিশ্বাসে অটল, অবিচল থাকতে পারবে? ষড়যন্ত্রকারীদের পাশাপাশী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষতা বিষয়টিকে আরো জটিল ও ভয়ানক করে তুলছে।
দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশ ভাস্কর্য দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছে তাদের মতো করে। অথচ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বা জমিদাতার উদ্দেশ্য ছিলো মুসলিম শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হবে। ‘মুসলমানদের সন্তানরা জ্ঞানের ক্ষেত্রে উন্নতি করবে, মুসলমানগণ এগিয়ে যাবে’ এই প্রতিহিংসায় যে রবীঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী ছিলেন, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই চলছে রবীঠাকুরের আদর্শ নিয়ে মহোৎসব। রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্যপ্রীতিকে লালন করতে শিখছে সেখানকার শিক্ষার্থীরা। একে একে ভাস্কর্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেয়া হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিক্ষালয়কে। ইতিহাসের দৃষ্টান্ত মসজিদের শহরখ্যাত ঢাকা শহরেরর যেখানে সেখানে মূর্তি ও ভাস্কর্য স্থাপন করা হচ্ছে।
সর্বশেষ দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রীমকোর্ট চত্বরে স্থাপন করা হচ্ছে গ্রীক দেবীর ভাস্কর্য বা মূর্তি। এটা নাকি ন্যায় বিচারের প্রতীক? তাহলে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে কি এতোকাল ন্যায় বিচার ছিলো না! আমাদের প্রধান বিচারপতি মহোদয় কি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মবিশ্বাস পরিপন্থি স্পর্শকাতর বিষয়ে হাত দিতে পারেন? অথচ, সুপ্রীম কোর্ট আর জাতীয় ঈদগাহ’র অবস্থান একেবারে পাশাপাশি। ঈদের নামাজ পড়ার সময় এই মূর্তিটিও মুসলমানদের নামাজের সামনে থাকবে। এতেই বুঝা যায় ষড়যন্ত্রের বীজ কতো গভীর!
এসব ভাস্কর্য প্রীতির অন্তরালে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের ধর্মবিশ্বাসের ক্ষতি এবং কালক্রমে ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্রের প্রবল আশংকা রয়েছে, অতীতের ইতিহাস এটাই বলে। কাজেই, তৌহিদ তথা একত্ববাদে বিশ্বাসী ও সকলকে এ বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। সরকার ও প্রশাসনকেও এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় আবেগ অনুভূতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের ধর্মবিশ্বাস পরিপন্থি কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ আমাদের সকলকে শয়তানের ওয়াস ওয়াসা হতে হেফাজত করুন, আমীন!
ষ লেখক : মুহাদ্দিস, হাজি আব্দুল আলী শামসুল উলূম মাদরাসা, ঢাকা

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (3)
সোলায়মান কবির ৮ ডিসেম্বর, ২০২০, ৬:৫৯ পিএম says : 0
লেখাটি পড়ে লেখকের ধন্যবাদ দিতে পারলাম না। তিনি সাম্প্রতিক কালের সাম্প্রদায়িক চোরাবালিতে মাথা গুঁজেছেন।
Total Reply(0)
Nesar Ahmad Anwary ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০, ৪:১৫ পিএম says : 0
মাশাআল্লহ সুন্দর উপস্থাপন
Total Reply(0)
Nesar Ahmad Anwary ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০, ৪:১৬ পিএম says : 0
মাশাআল্লহ সুন্দর উপস্থাপন
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন