ঢাকা, বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০১ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

নেপথ্যে চাঁদাবাজি

গুলিস্তান-মতিঝিলের ফুটপাথ ফের দখলের পাঁয়তারা

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১১ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

রাজধানীর গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকার ফুটপাতে নতুন করে হকার বসানোর পায়তারা চলছে। পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে এবং ফুটপাতের এক-তৃতীয়াংশে বসতে দেয়ার দাবিতে রাজধানীতে আন্দোলন করছে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন নামে একটি অনিবন্ধিত সংগঠন। বাম ঘারানার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সাথে নিয়ে সংগঠনটি প্রতিদিনই কোনো না কোনো কর্মসূচী পালন করছে। গতকাল বুধবার দুপুরে মতিঝিল শাপলা চত্বরের সামনে সড়ক অবরোধ করে প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করছেন তারা। প্রতীকী অনশন কর্মসূচিতে হকার নেতাসহ গুলিস্তান-পল্টন-মতিঝিল এলাকার শতাধিক হকার অংশ নেয়। এ কর্মসূচির কারণে রাজধানীর ইনকিলাব মোড় থেকে শাপলা চত্বর এবং ফকিরাপুল থেকে মতিঝিলের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে সেই যানজট দৈনিক বাংলা হয়ে পল্টন মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তাতে যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
জানা গেছে, হকারদের পূনর্বাসনের নামে বিভিন্ন দাবিতে যারা আন্দোলন করছে তারা কেউই প্রকৃত হকারদের প্রতিনিধি নন। বরং যারা হকারদের কাছে থেকে চাঁদা তোলে সেই লাইনম্যানরাই আন্দোলনের নামে সরব হয়ে উঠেছে। এরা কথায় কথায় মেয়রকে হুমকী-ধমকী দিতেও দ্বিধা করছে না। গতকাল বুধবার শাপলা চত্বরের কর্মসূচী থেকেও আজ বৃহস্পতিবার নগর ভবন ঘেরাও করার কর্মসূচী দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীর মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকার ফুটপাত থেকে মাসে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা চাঁদা উঠতো। দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাতে প্রতিদিন তোলা এই চাঁদার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা। রমজান মাসে এই চাঁদার পরিমান শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতো। হকারদের উচ্ছেদ করার পর এখনও চলছে সেই চাঁদাবাজি। সন্ধ্যার পর ফুটপাতে বসা হকাররা জানান, আগের মতোই সেই চিহ্নিত লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজরা প্রতিদিনই টাকা তুলছে। বরং আন্দোলনকে ইস্যু করে চাঁদার পরিমান দ্বিগুণ করা হয়েছে। নিরীহ হকারদের বলা হচ্ছে-আন্দোলন করে আবার তাদেরকে ফুটপাতে বসানোর ব্যবস্থা করা হবে। সে জন্য টাকা বেশি দিতে হবে। আজহারুল ইসলাম নামে এক হকার বলেন, ওরা দিনে আন্দোলন করছে, রাতে করছে চাঁদাবাজি। ওদেরকে পেছন থেকে মদদ দিচ্ছে গুলিস্তান আহাদ বক্সের কতিপয় দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্য। জুলহাস নামে এক হকার বলেন, ফুটপাতে বসার জন্য হকাররা মিটিং-মিছিল করছে। স্বার্থের খাতিরে হকার ও চাঁদাবাজরা এখন এক হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখনও আগের মতোই রাতের ফুটপাত থেকে দ্বিগুণ চাঁদা তুলছে চিহ্নিত সেই চাঁদাবাজরাই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেছিল তারাই দিনে আন্দোলন করছে, রাতে করছে চাঁদাবাজি। এদের মধ্যে রয়েছে পল্টন বাসস অফিসের ফুটপাতের আবুল হাশেম কবীর, সেকেন্দার হায়াত, পল্টন থানা পুলিশের সোর্স এক সময়কার হকার সর্দার দুলাল,আমীন, শাহীন, বাবুল ভূঁইয়া, খোকন মজুমদার, জুয়ারী সালাম, হিন্দু বাবুল, গুলিস্তান পূর্ণিমা ¯œ্যাক্সকের সামনের ফুটপাতের চাঁদাবাজ আক্তার, জাহাঙ্গীর, জুতার মার্কেটের সালেহ, জজ, সেলিম, লম্বা হারুন ও তার শ্যালকসহ আরও চিহ্নিত ও চাঁদাবাজি মামলার আসামীরা।
ফুটপাত দখলে রাখার কারণে মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টনসহ আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ যানজট লেগেই থাকতো। ফুটপাতকে হকারমুক্ত করা গেলে যানজটের ভয়াবহতা অনেকটাই কমে যাবে-এমন তথ্য উঠে এসেছে বুয়েটসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সুপারিশে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বিষয়টি উপলব্ধি করার পর ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার ঘোষণা দেন মেয়র সাঈদ খোকন। বিভিন্ন সংস্থার সাথে বৈঠক করে গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার ফুটপাত হকারমুক্ত করার অভিযান শুরু হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এ উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসা পেলেও হকার নামধারী কতিপয় অনিবন্ধিত সংগঠনের পক্ষ নিয়ে বাম ঘারানার নেতারাও মেয়রের বিপক্ষে বক্তব্য দেয়া শুরু করেছেন। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র সাঈদ খোকন তাতে মোটেও কান দেন নি।
সাধারণ হকাররা জানান, ফুটপাতে আবার বসানোর দাবিতে শুরু থেকেই অনিবন্ধিত সংগঠনগুলো আন্দোলনের নামে হুমকী ধমকী দিয়ে আসছে। তারা হকারদের দৈন্যদশার কথা বলে আন্দোলনের ডাক দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। অথচ তাদের আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজদের রক্ষা করা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজরা তাদের চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখার জন্য ষড়যন্ত্র ও বিশৃঙ্খলার পথ বেছে নিয়ে নিরীহ হকারদের বিপদগামী করার চেষ্টা করছে। আমরা চাই হকারদের পূনর্বাসন করা হোক। আমাদের দাবিগুলো তুলে ধরে ইতোমধ্যে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবিগুলো বিবেচনা করবেন।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, ফুটপাতে হকারদের আর কখনওই বসতে দেয়া হবে না। দুপুরে ফুটপাতে হকারদের বসার প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, বিকালের আগে তারা কোনোভাবেই ফুটপাত আটকে রাখতে পারবে না। এজন্য বিভিন্ন পয়েন্টে আমাদের কর্মী নিয়োগ করা আছে। তারা না পারলে প্রয়োজনে পুলিশ দিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন