ঢাকা, রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

শিগগির ভাঙা হবে

বিজিএমইএ ভবন সিলগালা করেছে রাজউক

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৭ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

রাজধানীর হাতিরঝিল লেকের পাড়ে অবৈধভাবে নির্মাণ করা বিজিএমইএ ভবন সিলগালা করে দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এখন রাজউকের অনুমতি ছাড়া কেউ ভবনটিতে ঢুকতে পারবে না। ভবনটি শিগগির ভাঙ্গা হবে। চিফ ইঞ্জিনিয়ার এএসএম রায়হানুল ফেরদৌসের নেতৃত্বে রাজউকের কর্মকর্তারা গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার পর ভবনটি সিলগালা করে দেন। রায়হানুল ফেরদৌস জানান, ভবনটির মালামাল সরানোর জন্য প্রথমে বিকাল পাঁচটা, পরে তা বাড়িয়ে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সময় দেয়া হয়।
এর মধ্যে বেশির ভাগ মালামাল সরিয়ে নেয়া হয়েছে। অল্প কিছু মালামাল রয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে সংশ্লিষ্টরা এসব মালামাল নিতে পারবেন। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই আদালতের রায়ে অবৈধ বিবেচিত রাজধানীর হাতিরঝিলের বিজিএমইএ ভবন ভাঙ্গার প্রক্রিয়া শুরু করে রাজউক। সর্বোচ্চ আদালত ভবন ভাঙ্গার রায় দেওয়ার পর কয়েক দফায় সময় নিয়েছিলেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক এই সংগঠনের নেতারা। সবশেষ আদালতের দেওয়া সাত মাস সময়সীমা গত ১২ এপ্রিল শেষ হয়েছে। ওই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার সকালে ভবন ভাঙ্গার যন্ত্রপাতি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বিজিএমইএ ভবনের সামনে উপস্থিত হন রাজউকের কর্মকর্তারা। তবে এদিন ভবনটি খালি করার উপরই জোর দেন তারা। দিনভর অবস্থানের পর ১৫ তলার ওই ভবনে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়। ভবনটিতে থাকা বিভিন্ন অফিসের মালামাল সরাতে চার দফা বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় ভবনটি সিলগালা করে দিয়েছে রাজউক কর্তৃপক্ষ।
রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) খন্দকার অলিউর রহমান সকালে ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ভবন ভাঙ্গার জন্য আমাদের বুলডোজারসহ অন্যান্য গাড়ি প্রস্তুত। তবে এই ভবনের বিভিন্ন তলায় ১৯টি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। আমরা আপাতত এসব প্রতিষ্ঠানের মালামাল সরিয়ে নিতে বলছি। এটা ভবন ভাঙ্গার কাজেরই একটা অংশ।
বিজিএমইএ ভবনে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখার পাশাপাশি নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল। রাজউক সময় বেঁধে দেওয়ার পর তারা মালামাল সরিয়ে নেওয়া শুরু করে। অলিউর রহমান বলেন, এই ভবনে ব্যাংকসহ অন্যান্য অফিস আছে। ব্যাংকের ভল্টে টাকাসহ অফিসের অন্য মালামাল তারা সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছে। আমাদের কাছ থেকে তারা দুই ঘণ্টা সময় চেয়ে নিয়েছে। আমরা তাদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য সময় এবং সুযোগ দিয়েছি। সব সরিয়ে নেওয়ার পর ভবন ভাঙ্গার কাজ শুরু করবেন বলে জানান তিনি। তার আগে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোনসহ সব ইউটিলিটি সার্ভিসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন কর হবে বলেও তিনি জানান। এরপর দুপুরেও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার কাজ শেষ না হলে দ্বিতীয় দফায় বিকাল ৫টা পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেন রাজউকের এই পরিচালক অলিউর।
পনের তলা এই ভবন কীভাবে ভাঙ্গা হবে- জানতে চাইলে রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেসমিন আক্তার সাংবাদিকদের জানান, ডিনামাইট বা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বিজিএমইএ ভবনটি। এ ভবনটি ভাঙ্গতে এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ডিনামাইট রেবুলেশন ব্যবহার করে আমরা ভাঙ্গার কাজ করব। সেই অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে ঢাকায় বড় ভবন ভঙ্গার একটি ঘটনাই ঘটেছিল; এক যুগ আগে তেজগাঁওয়ের সেই র‌্যাংগস টাওয়ার ভাঙ্গার সময় দুর্ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনা স্মরণ করে হাতিরঝিল প্রকল্পের পরিচালক এ এস এম রায়হানুল ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, এ ভবন ভাঙ্গতে চীনা প্রকৌশলীদের সহযোগিতা নেওয়া হবে। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। তবে এখানে বেশ কিছু টেকনিক্যাল বিষয় আছে, তেমনিভাবে ম্যানেজমেন্টের বিষয়ও আছে।
সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার চার দিন পর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রসঙ্গে রাজউক কর্মকর্তা অলিউর রহমান বলেন, হাইকোর্ট ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছিল। কিন্তু মাঝখানে কয়েকদিন বন্ধ ছিল, এরপর কর্মদিবস শুরু হয়েছে, আমরাও আমাদের কাজ শুরু করেছি। ভবন ভাঙ্গার কাজ বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বলে জানান তিনি।
জলাশয়ের উপর আড়াআড়িভাবে গড়ে ওঠা এই বিজিএমইএ ভবনকে হাতিরঝিলের প্রকল্পের ক্যান্সার আখ্যায়িত করেছিল হাইকোর্ট। এই ভবনের শুরুটা হয়েছিল দুই দশক আগে, ১৯৯৮ সালে। সরকারের কাছ থেকে জমি বরাদ্দ নিয়ে নিজেদের এই ভবন নির্মাণ শুরু করেছিলেন দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা, যার কাজ শেষ হয় ২০০৬ সালে। তখন তাদের জলাশয় ভরাট করে ভবন তুলতে মানা করা হয়েছিল বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জানান। এই জমি দেওয়ার সময় তিনিই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন শুরুতেই অভিযোগ তুলেছিল, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নিয়ে এবং উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ ভঙ্গ করে বেগুনবাড়ি খালের একাংশ ভরাট করার মাধ্যমে ওই ভবন তোলা হয়েছে।
সংবাদপত্রে প্রতিবেদন নজরে আনা হলে ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল দেয়। চ‚ড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণ করা ওই জমি ১৯৯৮ সালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো যেভাবে বিজিএমইএকে দিয়েছে, তা ছিল বেআইনি।
ওই রায়ে এই ভবনকে সৌন্দর্যমন্ডিত হাতিরঝিল প্রকল্পে ‘একটি ক্যান্সার’ বলার পাশাপাশি হাইকোর্ট আরও বলে, ‘আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারী’ শক্তিশালী একটি মহলকে ‘আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে’ এমন যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে বিজিএমইএর আইনের প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ আপিল করলে ২০১৬ সালের ২ জুন তাও খারিজ হয়ে যায়। সর্বোচ্চ আদালতের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনও খারিজ হয়ে গেলে ভবনটি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর ছিল না বিজিএমইএর।
তখন তারা ভবন থেকে কার্যক্রম সরিয়ে নিতে সময় চায় আদালতের কাছে। গত বছরের অগাস্টে সময় দেওয়ার সময় আদালত বিজিএমইএর কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছিল যে তারা আর সময় বাড়ানোর আবেদন করবে না। হাতিরঝিলের ভবনটি রাখতে না পারার পর এখন ঢাকার উত্তরায় ১১০ কাঠা জমির উপর ১৩ তলা নতুন ভবন তৈরি করছে বিজিএমইএ; গত সপ্তাহে তা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। #

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন