ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ০৭ ভাদ্র ১৪২৬, ২০ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

গুজবের নিষ্ঠুরতা রুখতে হবে

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন | প্রকাশের সময় : ২৪ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

বাংলাদেশে আজ ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অনাকাংখিত ঘটনা আমাদের হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে। আরশের মালিকের কাছে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছি যেন আগামী দিনটা সুন্দর হয়। কিন্তু দিনটা কেন জানি অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। কোথাও যেন এতটুকু শান্তির জায়গা নেই যেখানে দাঁড়িয়ে বলা যায় আমরা ভালো আছি। প্রতিনিয়ত গুম,খুন অপহরণ,ধর্ষণ,শিশু হত্যার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে গুজব। এই গুজবের নিষ্ঠুরতায় কেড়ে নিচ্ছে নিরীহ মানুষে প্রাণ। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে যেমন উড়িয়ে দিতে পারছি না তেমনি ছেলে ধরা সন্দেহে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে নিরীহ মানুষটাকেও আমরা রক্ষা করতে পারছি না। গত ১৮ জুলাই নেত্রকোনায় এক যুবকের ব্যাগ থেকে এক শিশুর মন্ডু কাটা মাথা উদ্ধারের ঘটনা মুলত এসব গুজবে ঘি ঢালে। তবে নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা জানিয়েছেন-ওই গুজবের সাথে এ ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা শিক্ষিত হচ্ছি। কিন্তু ভালো মানুষ হতে পারিনি। যদি সত্যিকার অর্থেই আমরা ভালো মানুষ হতে পারতাম তাহলে প্রকাশ্যে দিবালোকে একজন মানুষকে কুপিয়ে খুন করতে পারতাম না। ব্রিজ তৈরিতে মাথা লাগে এমন কুসংস্কার সচেতন কেউ বিশ্বাস করে না। অথচ আমরা অনেকেই তা করছি। এমন কুসংস্কার থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে।

গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতা বাংলাদেশে কতটুকু বিরাজ করছে তা বুঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেই উত্তর পাওয়া যাবে। নাগরিকদের জানমাল রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র এ দায় এড়াতে পারে না। এই প্রশ্ন যে কেউ করতেই পারেন। কারণ আমরা যখন দেখি বিচারকের খাস কামরায় এক আসামি অন্য আসামিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে তখন কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে দেশের নাগরিকের নিরাপত্তা কতটুকু। পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে এটা অপপ্রচার হলেও একশ্রেণীর মানুষ তা বিশ্বাস করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এতে করে একের পর এক ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা। ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনীতে এ পর্যন্ত ৩৬ জন মানুষ নিহত হয়েছে। এদের অধিকাংশই মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী। যারা অন্যদের কাছে নিজের বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারেন না। তবে রাজধানীর বাড্ডা ও নারায়ণগঞ্জের মর্মান্তিক দুটো ঘটনা সত্যিই বেদনাদায়ক। বাড্ডায় তাসলিমা বেগম শিশুসন্তানকে স্কুলে ভর্তি করার বিষয়ে খোঁজখবর করতে গিয়েছিলেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁকে নিজের কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিলেন। কিন্তু তার অসংলগ্ন কথাবার্তায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি ছেলেধরা। এরপর এলাকার একশ্রেণীর অতিউৎসাহী লোকজন স্কুলঘরে ঢুকে তাঁকে গণপিটুনি দেয়। কিন্তু কেউ একবারও বিবেচনা করল না,তিনি আদৌ ছেলেধরা কিনা? শুধু কি তাই! খুনের সময় ও খুনের পরে অসংখ্য ক্যামেরা ছিল। অথচ সবাই গণপিটুনিতে নির্জীব মানুষটির ছবি তুলছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি। একই ঘটনা রয়েছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্বিরগঞ্জের মিজমিজি আলআমিন নগরের অতি উৎসাহী জনতা। তারা ছেলেধরা সন্দেহে একজন বাকপ্রতিবন্ধী বাবাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। একজন বাকপ্রতিবন্ধী বাবা নিজের মেয়ের জন্য চুড়ি আর লিপিস্টিক নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষা করছিলেন। সেই বাবাকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জের ওসি শাহীন পারভেজ জানান,সিরাজ বোবা ও বধির ছিলেন। তিনি ছেলেধরা নন।

বানের পানির মতো গুজব আসে এবং ছড়ায়। কিছুদিন পর আবার সেটি কালের ¯্রােতে হারিয়ে যায়। কিন্তু যে মানুষগুলো এই গুজবের শিকার হয়ে না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছে। এই সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের রেখে যাওয়া স্বজনের চোখের অশ্রæ কি থামাতে পারবে? গণপিটুনি দিয়ে মানুষকে হত্যা করা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে একশ্রেণীর অতি উৎসাহী কিছু মানুষ ছিনতাইকারী,চোর বা ডাকাত ধরে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে। অথচ তা ফৌজদারী অপরাধ হওয়া সত্তে¡ও খুনীরা ধরাছোয়ার বাইরে। পৃথিবীর কোনো সভ্য জগতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও আমাদের দেশে এই চিত্র প্রায়ই দেখা যায়। একের পর এক গণপিটুনির ঘটনা ঘটলেও সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যদি নিতে পারতো তাহলে ঘটনাগুলো এভাবে ঘটতে পারতো না। নিকট অতীতের গণপিটুনীর পরিসংখ্যানই বলে দেয় আইন হাতে তুলার প্রবণতা এখন বেড়েই চলেছে। মানুষ পিটিয়ে হত্যা করার সংস্কৃতি এই প্রথম তা নয়! অতীতেও তা দেখা গেছে। যদি সেসব ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হতো তাহলে রিফাতকে দিনদুপুরে কুপিয়ে হত্যা করার সাহস নয়ন বন্ডরা পেত না। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কন্দ্রের (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালে সারাদেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ৬ মাসে ৩৬ জন নিহত হয়েছে। এবং গত চার দিনে ৭ জন মিলিয়ে ৪৩ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। ২০১১ সালের জুলাই মাসে ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি গ্রামে শবেবরাতের রাতে ডাকাত সন্দেহে ৬ ছাত্রকে গণপিটুনিতে হত্যা করে। কয়েক দিন লেখালেখি হয়। ওই পর্যন্তই শেষ। কারও শাস্তি হয়েছে সে সংবাদ দেখিনি। “২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশপাশে বিভিন্ন ঘটনায় ১৫০ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল। ২০১১ সালের ২৭ জুলাই নোয়াখালীতে নিরীহ কিশোর মিলনকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও সে সময় ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। মিরপুরের কালশীতে একটি ঘরে জীবিত ১০ জন মানুষকে তালাবদ্ধ করে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার হিসেব অনুযায়ী গণপিটুনীতে ২০১০ সালে ১২৭ জন, ২০১১ সালে ১৩৪ জন, ২০১২ সালে ১২৬ জন, ২০১৩ সালে ১২৭ জন, ২০১৪ সালে ১০৫ জন,২০১৫ সালে ৬৯ জন নিহত হয় । গণপিটুনির শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে,প্রায় সব ক্ষেতেই নারী,মানসিক রোগী,প্রতিবন্ধী,বৃদ্ধাসহ নিরীহ মানুষ গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন।

দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে ঠিক সেই সময়টাতে সমাজে অস্থিরতা,অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার অভাব সত্যিই বেদনাদায়ক। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন,জিডিপি প্রবৃদ্ধির উন্নয়নের চেয়ে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সামাজিক রাজনৈতিক শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। এই সমাজ ও রাষ্ট্রে কেন হঠাৎ করে এই প্রবণতা দেখা দিল তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমনি এমনিতেই মানুষ অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠে না। এর পেছনে নিশ্চয় কোনো কারন নিহীত আছে। তবে মানুষ যখন মনে করে বিচার পাওয়া যাবে না কিংবা বিচার হবে না তখনই সে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে কুন্ঠাবোধ করে না। সে ভুলে যায় আইনের বাইরে বিচার করার কোনও অধিকার কারও নেই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার থাকে তখন মানুষের মনে এমনিতে নিরাপত্তাবোধ জাগে। আবার উল্টো দিকে রাষ্ট্রের শাসক যখন জনগণের মনের দ্রোহটা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে অপরাধমুলক প্রবনতা বৃদ্ধি পায়। বাক-স্বাধীনতার পথ যখন রুদ্ধ করা হয়, তখন প্রতিবাদী মানুষ বিড়ালের মতো মিউমিউ করা ছাড়া কিছু করতে পারে না। তখন সুযোগ সন্ধানীরা বেপরোয়া হয়ে উঠে হিং¯্র জানোয়ারের মতো। আসুন গুজবের কথায় কান না দিয়ে দেশের প্রচলিত আইনে তথাকথিত অভিযুক্তদেরকে তুলে দিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন