ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হোক

মীর আব্দুল আলীম | প্রকাশের সময় : ১৬ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম | আপডেট : ১২:১৬ এএম, ১৬ জানুয়ারি, ২০২০

নির্বাচন কেমন হবে? নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ হবে তো? নাকি কারচুপির নির্বাচনে জিতে যাবে সরকার দলীয় প্রার্থী? ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন নিয়ে এমন ভয়ে-সংশয়ে আছে রাজধানীর ভোটাররা। আগের মতো কারচুপি আর জোরজুলুমের নির্বাচনই হবে কিনা তা নিয়ে দেশজুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে ইসি এবং সরকার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রমাণ করুক- এটা এখন কায়মনে দেশবাসী চায়। এদেশে সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনের শঙ্কা থেকেই যায় বরাবর। তাই এ নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও অবাধ করে বিগত নির্বাচনের কষ্ট জনগণকে ভুলিয়ে দিক ইসি, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ভোট পদ্ধতি ইভিএম নিয়ে এবারও বিতর্ক আছে। তা আদালতেও গড়িয়েছে। শেষমেশ ভোটের দিন কী হবে তা নিয়ে ঘোরপাকে জনগণ। চলতি মাসের ৩০ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। মাঠে এখন প্রার্থীরা তুমুল প্রচারণায় পুরোদমে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। ভোটারদের মধ্যেও ঐ একই সংশয়।

নির্বাচনী মাঠকে কোনোক্রমেই ঘোলাটে করতে দেবে না নির্বাচন কমিশন (ইসি), এমন ঘোষণাই দিয়েছি। নির্বাচন যেন ‘উৎসব’ হতে পারে, সেই চেষ্টাই করবে কমিশন। শুরুটা ভালই হলো ইসির। শেষ ভালো হবে তো? নাকি সেই পুরনো রূপেই হবে সিটির নির্বাচন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নির্বাচনী আইনের বাধাকে সংসদ সদস্যরা (এমপি) প্রচারে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনী কাজে মন্ত্রী এমপিরা জড়িত হলে নির্বাচন প্রভাবিত হবে বৈকি! এ নির্বাচন কমিশনের আমলে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বা পরে যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব নির্বাচনের অধিকাংশ হয় সুষ্ঠু হয়নি অথবা নানা কারণে অংশগ্রহণমূলক ছিল না। তাই মানুষ মনে করে, আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হওয়ার সম্ভাবনা কম। এমন কারণেই হয়তো আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্ব›দ্বী বিএনপির শঙ্কা থাকা অযৌক্তিক নয়। আগের বদনাম কিছুটা দূর করতে সরকারকে যেমন ঢাকা সিটি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, তেমনি নির্বাচন কমিশনকেও নিতে হবে শক্ত অবস্থান।

বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো- এ প্রবাদটি অনেক পুরনো। ইসি হুঙ্কার দেবে আর ফাঁক-ফোঁকড়ে অধিক ক্ষমতাধর প্রার্থীরা তরী পার হবেন তা যেন না হয়। কোনো কিছু অর্জনের জন্য কোন গোষ্ঠি নানা রকম কলকব্জা শক্ত করে আঁটতে থাকেন। ষড়যন্ত্রের মধ্যে এমন সব ফাঁক-ফোঁকড় থাকে যা দিয়ে সহজের পার পাওয়া যায়। ব্যবহারিকভাবে যখন কোনো কিছু বাঁধার জন্য গিঁট বা বাঁধন দেয়া হয় তখন স্থান-কাল-পাত্রভেদে এটা এমনভাবে করা হয় যা কিনা কারো জন্য খুলে ফেলা সহজ হয়। আর কারো জন্য কঠিন ও জটিল হয়ে পড়ে। এমনটা যেন নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে না করা হয়।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ এর নির্বাচনের কারণে ভোটারদের একটা আশঙ্কা আছে যে, তারা ভোট দিতে পারবেন কিনা। কারণ, ভোটারদের ইচ্ছার ওপর ভোট দেয়া এখন আর নির্ভর করে না। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক ভূমিকা এবং নির্বাচনে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। এই বিষয়গুলো ঠিক না থাকলে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আরেকটি মহড়া হতে পারে সিটি নির্বাচন। এমনটি যেন না হয়। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ২০১৫ সালের সিটি নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি এবার প্রার্থী হননি এবং নির্বাচন বর্জন করেছেন। তার কথা, ‘নির্বাচন করে কী হবে? পূর্বনির্ধারিত ফলের এই নির্বাচনে গিয়ে লাভ কী? ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের নামে যে প্রহসন হয়েছে, এরই পুনরাবৃত্তি হবে।’ এমন আশংকা থাকতেই পারে এদেশে। এদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ারও কিন্তু নজির আছে। সব প্রতিকূলতা, আশঙ্কা, ভয় ভীতি দূরে ঠেলে মুজিব শতবর্ষ সামনে রেখে ইসি একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের উপহার দেবে আমরা আশা করি। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আবহ সৃষ্টি করা সম্ভব। নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীগণ হেরে যাবেন এমনটাও নয়। কমিশনার প্রার্থী যাই হোক গ্রহণযোগ্য মেয়র প্রার্থী কিন্তু দুই সিটিতেই দিয়েছে সরকার দল। দেশে উন্নয়নও হচ্ছে ব্যাপক। মেট্রো রেল, স্বপ্নের পদ্মা সেতু হচ্ছে গাঁটের টাকায়। অগণতন্ত্রের বলে শোকতাপ কিন্তু উন্নয়ন ভুলিয়ে দিচ্ছে অনেকটাই। এ অবস্থায় অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন তো সরকার করতেই পারে। আমরাও অবাধ এবং নিরপেক্ষ একটা নির্বাচন চাই।

আমরা চাই না নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো সংঘাত হোক। নির্বাচনী রক্তপাত বহু দেখেছি। রাজনৈতিক দলগুলোর আগুন নিয়ে খেলা দেখেছি। মানুষের পোড়া লাশ দেখেছি। জ্বালাও-পোড়াও কোনটা দেখিনি? আমরা চাই না, এ নির্বাচনে কোনো রকম রক্তপাত হোক অথবা প্রাণহানি ঘটুক। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাতময় কোনো পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, রক্তপাত যাতে না ঘটে সেদিকে নজর রাখার আহ্বান জানাই সিইসির কাছে। যতদূর দেখছি সিইসি এ ব্যাপারে এখনো যথেষ্ট সজাগ দৃষ্টি দিচ্ছেন। তিনি ভোটের মাঠে নির্বাচনী আচরণবিধির প্রতিপালন নিশ্চিত করতে গিয়ে পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সে বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সতর্ক থাকার পরমর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘কোনো বিভ্রান্তিকর বা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়লে ধৈর্য, বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সঙ্গে তা মোকাবিলা করতে হবে। পত্রপত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় ইসি প্রায়ই সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে হুঙ্কার দিচ্ছেন। ঢাকার সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে ইসি নির্বাচনের প্রায় সব রকম দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এর পাশাপাশি সবাইকে নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনেও আহ্বান জানান তিনি।

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনও জনগণ কামনা করে না। ভোটের অধিকার প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি নাগরিকের। সবাই যেন আনন্দ চিত্তে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে সে নিশ্চয়তা নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকারীদের দিতে হবে। নির্বাচনের পর রাজধানীতে যেন কোনোরূপ বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা সৃষ্টি না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। আপামর জনগণের প্রত্যাশাও তাই। নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা ভালো ভূমিকা থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আচরণবিধি প্রয়োগ করতে গিয়ে এমন কিছু করবে না যেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। নির্বাচন ঘিরে আগে ও পরে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী, দলসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কী করতে পারবে আর কী পারবে না, তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে আচরণ বিধিমালায়। নিয়ম ভাঙলে শাস্তির বিধানও রয়েছে সেখানে। ভোটের মাঠে সমআচরণ ও সমান সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে হবে। জুডিশিয়াল মাইন্ড নিয়ে আইন-কানুন ব্যবহার করতে হবে। আইনকে সমুন্নত রেখে কাজ করলে সুষ্ঠু একটা নির্বাচন ঠিকই উপহার দিতে পারবে ইসি।

নির্বাচনে কেউ জিতবেন, কেউ হারবেন। যারাই জিতুক, শান্তিপূর্ণ ও অবিতর্কিত নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত না হলে দলের জয় গণতন্ত্রের জয় বলে প্রতিষ্ঠিত হবে না। আমরা প্রত্যাশা করি, কোন চাপে এই নির্বাচনের বৈশিষ্ট্যকে যেন প্রভাবিত করা না হয়। সুষ্ঠু পরিবেশে ভোটগ্রহণ এবং স্বচ্ছভাবে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। জয়-পরাজয় যাঁরই হোক, নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনোভাবেই নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে পরাজিত হলে চলবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে কী হবে? আবার সংঘাত, সংঘর্ষ হবে? এটা এখন হয় না র‌্যাব-পুলিশের পিটুনি আর মামলার ভয়ে। চাপা ক্ষোভ তৈরি হবে। সরকার এবং ইসির প্রতি বাজে ধারণা তৈরি হবে। বিগত নির্বাচনগুলো একতরফা হলেও এবার ঢাকা সিটির নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ হলে কোনো সংশয় নেই। না হলেই যত বিপদ। রাজনৈতিক যুদ্ধ হতে পারে। যদিও এর সম্ভাবনা কম। তবে এটাই বলতে চাই, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া চলতি সরকারের সময়টা খুব একটা খারাপ যায়নি। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। গণতন্ত্রে ঘাটতি থাকলেও, হরতাল অবরোধ না থাকায় জনমনে স্বস্তি আছে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পেরেছে, শিল্প কারখানায় উৎপাদন হয়েছে। ভয় এখানেই; এ ধারা ঠিক থাকবে তো? সামনের দিনগুলো ভালো যাবে তো? নির্বাচন ঘিরে আবার জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, হরতাল অবরোধ এসব হবে না তো? সাধারণ মানুষের মধ্যেও নির্বাচনকে ঘিরে বেশ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তবে তারা নির্বাচনকে ঘিরে আর কোনো অশান্তির পরিবেশ চায় না।

নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয় তাহলে আন্দোলনের ইস্যু তৈরি হবে, বাড়বে আশান্তি। অর্থনীতি ধ্বংস হবে। সম্পদ নষ্ট হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষয় হবে। দেশে বেকারত্ব বাড়বে, অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দেবে। দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হবে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হবে। এমনটা আমরা কেউই আর চাই না। তবে এটাও সত্য, বিরোধী দলের রাজনীতি করার পরিবেশ দিতে হবে বর্তমান সরকারকে। দেশের স্বার্থে তাদেরও ছাড় দিতে হবে। ক’বছর আগে রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে আমরা প্রতিদিন যা দেখেছি সে কথা এখনো ভুলে যাইনি। প্রতিনিয়ত চোখের সামনেই এসব ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছি। কিছুই করতে পারিনি। এসব রোধে আইন যে নেই তাও নয়, আছে। নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কাজ। আমরা চাই, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হোক। যেকোন মূল্যে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করা হোক। জনপ্রত্যাশা এই: ইসি সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। সরকারও সততার সঙ্গে যথাবিধি সহযোগিতা প্রদান করবে। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু গণতন্তের ভীত রচনা করেছিলেন। গণতন্ত্রের মূলভিত্তি নির্বাচন, এ কথা আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন