ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

সোনালি আসর

ঈদ বোনাস

প্রকাশের সময় : ৪ জুলাই, ২০১৬, ১২:০০ এএম

বা তে ন বা হা র
স্কুল ছুটির পর রীনা মীনা ও সেঁজুতি তিন বান্ধবী হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। হাঁটতে হাঁটতে মীনা বলল- জানিস, সেঁজুতি, রীনার বাবা ঈদে হাফ বেতন ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছেন না। তাতে তার বাবার রীতিমতো ডাল-ভাতের জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হবে। তাই তাদের ঈদের কেনাকাটা কিছুই হবে না।
সেঁজুতির প্রশ্ন, হাফ বেতন কেন? আর মালিক ঈদ বোনাসই বা দেবে না কেন?
মালিক বলেছেÑ হরতাল-অবরোধে বিদেশে সময়মতো মাল রপ্তানি হয়নি। তাই টাকাও আসেনি। আর টাকা না আসলে মালিক বেতন-বোনাস দেবে কোত্থেকে?
সেজুতি বলল, মালিকের দৃষ্টিতে তার বক্তব্য যথার্থ। কিন্তু নি¤œ বেতনভুক ও শ্রমজীবী মানুষের বেলায় এই যুক্তি সম্পূর্ণ অবান্তর। কারণ নি¤œ আয়ের মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এদের বেলায় মালিকের যুক্তি মানা সম্ভব নয়। তাই নি¤œ আয়ের মানুষের বেতন-ভাতার সঙ্গে ঈদ বোনাস পরিশোধ করা একান্ত অপরিহার্য। এ আলাপচারিতা শেষ না হতেই ওরা তাদের বাড়ির কাছে চলে আসায় আপাতত আলাপ-আলোচনার ইতি টেনে বিকালে কথা হবে বলে যে যার মতো করে বাড়ি ফিরে গেল।
বাড়ি ফেরার পর সেঁজুতিকে কিছু একটা ভাবতে দেখে তার মা জিজ্ঞেস করলেনÑ সেঁজুতি তুই কি কিছু ভাবছিস? হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আয়, খাবি। সেঁজুতি বললÑ মা মনি, একটু পরে আসছি।
এদিকে মেয়েকে বিষণœ বদনে কিছু একটা ভাবতে দেখে সেঁজুতির মায়ের মনে প্রশ্ন জাগলÑ সেঁজুতি কি স্কুলে কারো সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছে? নাকি কোনো শিক্ষকের বকুনি খেয়ে এসেছে? এসব ভেবে সেঁজুতির মা সেঁজুতির উদ্দেশে আবার প্রশ্ন ছুড়েনÑ সেঁজুতি মা আমার, সত্যি করে বল তো, তুই কি কারো সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছিস, না শিক্ষকের বকুনি খেয়ে মন ভার করে আছিস? সেঁজুতি বলল না মা, এসব কিছুই হয়নি। তবে?
এবার সেঁজুতি তার মায়ের কাছে ভাবার পুরো বিষয় খুলে বলল এবং এর প্রতিকার কি তা জানতে চাইল। সেঁজুতির মা বললেনÑ এমন দুঃসংবাদে তো প্রতিবেশী হিসেবে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য। সেঁজুতি বললÑ মা মনি শুধু রীনাদের সমস্যা সমাধানই যথার্থ নয়। রীনাদের মতো হাজারো পরিবারের সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। সেঁজুতির মা বললেনÑ মা মনি এখন হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আসো। তারপর খেয়ে দেয়ে নিশ্চিন্তে সেসব কথা ভাবব।
সেঁজুতি এবার হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে সামান্য খাবার খেয়ে তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বিনয়ের সঙ্গে বললÑ মা মনি এবার ঈদে আমার অত জামাকাপড় লাগবে না। আমার জন্য কম জামাকাপড় কিনে টাকা বাঁচিয়ে সেই টাকা দিয়ে রীনা এবং তার মায়ের জন্য কিছু জামাকাপড় কিনে দিও।
মায়ের হ্যাঁ সূচক জবাব পেয়ে সেঁজুতির মনে একটু হলেও শান্তি ও স্বস্তি ফিরে এলো এবং বিকালে বান্ধবীদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে আলাপ-আলোচনা শেষে একটি সুন্দর সিদ্ধান্তে পৌঁছল। আর সিদ্ধান্ত মতো তার পরদিন দাবির পক্ষে মালিকের সঙ্গে কথা বলার জন্য স্কুল ছুটির পর রীনার বাবা যে কারখানায় চাকরি করেন সে কারখানার গেটে গিয়ে তিন কিশোরী দাঁড়িয়ে রইল। তিন কিশোরীকে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কারখানার সিকিউরিটি অফিসার এসে জিজ্ঞেস করলেনÑ এই মেয়েরা তোমরা কি চাও?
Ñআমরা মালিকের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
Ñকেন?
Ñআমাদের কিছু দাবি-দাওয়া আছে।
Ñতোমরা তো এ কারখানার শ্রমিক বা কর্মচারী নও, তোমাদের কিসের দাবি-দাওয়া?
Ñসে কথা শুধু মালিকের সঙ্গেই বলব। এখন দয়া করে মালিকের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিন।
সিকিউরিটি অফিসার মালিকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলেন। তারপর মালিকের নির্দেশ মতো তিন কিশোরীকে মালিকের অফিস কক্ষে পৌঁছে দিলেন। কারখানার মালিক তিনটি ফুটফুটে সুন্দরী কিশোরীকে দেখে স্ব¯েœহে চেয়ারে বসতে বললেন এবং নাম-পরিচয়সহ কোন বিদ্যালয়ের কোন শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে জানার পর জিজ্ঞেস করলেনÑ তোমরা কি জন্য এখানে এসেছ?
Ñদাবি-দাওয়া নিয়ে আলাপ করতে।
Ñতোমরা তো লেখাপড়া কর। আমার কাছে তোমাদের কিসের দাবি-দাওয়া?
Ñসরাসরি আমাদের না। তবে আমাদের মতো অনেকের।
কারখানার মালিক জাফর সাহেব তিন কিশোরীর বুদ্ধিদীপ্ত ও বিনয়ী ভাব দেখে এবং দৃঢ়তাপূর্ণ ও যুক্তিযুক্ত বক্তব্য শুনে খুবই সন্তুষ্ট হলেন। তাছাড়া ওদের চোখ ও মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা দেশপ্রেম, নারী নেতৃত্ব ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার পরিচয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তার মেয়ে ফারহানাকে ফোন করে ওদের ব্যাপারে কথা বললে, ফারহানা বললÑ বাবা, রীনা আমাদের ক্লাসের ফাস্ট গার্ল। খুবই ভালো ছাত্রী। কিন্তু খুবই গরিব। ওর বাবা পুরো মাসের বেতন আর ঈদ বোনাস না পেলে ঈদ করতে পারবে না। তাই যে করে হোক এই নি¤œ আয়ের মানুষের বেতন-ভাতা আর ঈদ বোনাস দেবার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
জাফর সাহেব তিন কিশোরীর আবেদনের সঙ্গে নিজের মেয়ের অনুরোধ পেয়ে খুবই প্রীত হলেন এবং লেবার অফিসারকে ডেকে তার মাধ্যমে ঘোষণা দিলেনÑ অন্য কাউকে পুরো বেতন বা ঈদ বোনাস না দিতে পারলেও যে করেই হোক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মাসিক বেতন ও পূর্ণ ঈদ বোনাস দেয়া হবে। আর তা দেয়া হবে এ তিন কিশোরী এবং আমার মেয়ে ফারহানার বলিষ্ঠ বক্তব্য ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুপ্রাণিত হয়ে।
পুরো বেতন ও ঈদ বোনাসের ঘোষণা শুনে শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি দল মালিকের নামে স্লোগান দিতে দিতে অফিসের সামনে এলে জাফর সাহেব বললেনÑ এ স্লোগান আমার নামে না দিয়ে এই চার কিশোরীর নামে স্লোগানসহ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলে আমি বরং বেশি খুশি হব। চার কিশোরীর নামে স্লোগান শুনে রীনার বাবাও ছুটে এলেন। চার কিশোরীর সাহসিকতায় মুগ্ধ হলেন। আর ঈদের আগেই পুরো মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস পাবার প্রতিশ্রুতি পেয়ে হাসতে হাসতে কাজে যোগ দিলেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন