ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

মুজিব শতবর্ষ সংখ্যা

শিল্পায়নে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা

মীর আব্দুল আলীম | প্রকাশের সময় : ১৭ মার্চ, ২০২০, ১২:০২ এএম

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে আসেন দেশে। ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জনগণের মাঝে। নিজেকে সঁপে দেন দেশ গড়ার কাজে। শুরু হয় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তিলাভের সংগ্রাম। সেটা যেন আরেক সংগ্রাম। দেশের মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সংগ্রাম।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন, অর্থনৈতিক সংগ্রামে সফল না হলে দেশের মানুষের মুখে কখনই হাসি ফোটানো যাবে না। বঙ্গবন্ধু তাঁর দূরদর্শিতা দিয়ে কৃষি প্রধান দেশে কৃষিপণ্যকে সামনে নিয়ে যেতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জাতি গঠন ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য কৃষি ও শিল্প বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতিক উন্নয়নে শিল্প নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আলাদা ভাবনা ছিল। সেই ভাবনা থেকে কৃষি ও শিল্পখাতকে শক্তিশালী করতে শিল্প ও কৃষিতে গবেষণায় মনেনিবেশ করতে বলেন অর্থনীতিবিদ এবং কৃষিবিদদের।
আমরা জানি যে, পৃথিবীতে কৃষির পরই শিল্পের স্থান। এ দু’টি খাত দেশকে এগিয়ে নিতে পারে অতি দ্রুত। বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিজ্ঞানমনস্ক। তিনি বুঝতে পারতেন, কী করতে হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ একটি সোনার বাংলা গড়তে কৃষি এবং শিল্প বিপ্লবের বিকল্প নেই। গতানুগতিক কৃষিব্যবস্থা দ্বারা দ্রুত ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতির খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এটা তিনি বুঝতেন। তাইতো তিনি কৃষি গবেষকদের কৃষিবিপ্লব ঘটাতে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে বলেন। সে মোতাবেক কাজও শুরু করেন। একদিকে কৃষি অন্যদিকে শিল্প-এই দু’য়ে দেশ হবে সমৃদ্ধ। তার স্বপ্ন ছিল এরকমই।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়নি। খুনিরা তাঁর দেহ নিথর করে দিলেও, তাঁর স্বপ্নগুলো ছিলো একেবারে সচল। অধিক শক্তি নিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। কৃষিতে, শিল্পকারখানায় সমৃদ্ধ হয়েছে দেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছেন। ভাবা যায় কি, আমাদের দেশে এখন টিভি-ফ্রিজ, এমনকি গাড়ি পর্যন্ত তৈরি হয়! ঔষধ শিল্পে আমরা বহু এগিয়ে গেছি। বিশে^র অনেক উন্নত দেশেও আমাদের ঔষধ রপ্তানি হচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষিতে ব্যাপক আধুনিকীকরণ হয়েছে। সব প্রতিক‚লতা সত্তে¡ও আত্মমর্যাদাশীল শিল্পমালিক এবং কৃষিবিদরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে দেশের বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠির খাদ্য, বস্ত্রসহ শিল্পপণ্য যোগানে নিয়োজিত রয়েছেন। শিল্প এবং কৃষিবিদদের চিন্তাচেতনা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত ধারণা ও প্রগতিশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বিপুল জনগোষ্ঠির ভাগ্যের পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ উপহার দিতে সক্ষম হবেন বলে আমরা আশাবাদী। বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সমৃদ্ধ একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলার মানুষ যেন পেট ভরে খেতে পায়, পরনে কাপড় পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’ সে কারণেই কৃষি এবং শিল্পে দেশকে এগিয়ে নিতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেন।
সন্দেহাতীতভাবেই বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল তার দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়ন ঘটানো। বঙ্গবন্ধু একটা সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন, যে সোনার বাংলার উপমা তিনি পেয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে, ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু সেই সোনার বাংলার স্বপ্নকে তার দেশের জাতীয় সংগীত নির্বাচন করেছিলেন। আজ শেখ মুজিবের সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বাংলাদেশকে যিনি এরই মধ্যে নিয়ে এসেছেন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে।
বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনসহ সব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। এর মধ্যে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিল্পকে। শিল্পে বিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর এ দর্শন বাস্তবায়নে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন, ইতিবাচক চিন্তার বিকাশ এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রয়োগ। বঙ্গবন্ধুর শিল্প ভাবনাকে পাথেয় করে ইতিবাচক মানসিকতায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে তাই সবার আগে শিল্প বিপ্লব সম্পন্ন করা জরুরি। বলা বাহুল্য, তার দেখানো সেই পথ ধরেই এদেশে শিল্পের উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক। দেশকে এগিয়ে নেয়ার অগ্রনায়ক। তার ভাবনা ছিলো কেবল বাংলাদেশ। তিনি শোষণহীন সমাজ গঠনের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনি বাংলার প্রত্যেক মানুষের জীবনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন আহার, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের সুযোগ সৃষ্টির জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন আপসহীন। বিপন্ন জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জনগণের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন।
বিশে^র বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এশিয়া মহাদেশে যে স্বল্প সংখ্যক ক্ষণজম্মা ও প্রকৃত অর্থে মানবপ্রেমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সক্রিয় ও সফল ভূমিকা এবং অসামান্য অবদান লক্ষ করা যায়, তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল অন্যতমই ছিলেন না, সম্ভবত তাঁর অবস্থান সবার শীর্ষে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর মতো এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিরল। তাইতো তাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয়। তাঁর জীবন ও রাজনীতি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও ক্রমবিকাশমান ধারায় ভৌগোলিক সীমারেখায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
শুরুতে যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পায়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করলেও ধীরে ধীরে তিনি ব্যক্তিখাতের বিকাশের জন্য অনুক‚ল পরিবেশ সৃষ্টির দিকে মনোযোগী হন। তাই ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিক উল্লেখ করেন যে, ‘পুঁজি বিনিয়োগে বেসরকারি উদ্যোক্তাদিগকে যথাযথ ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করিবার জন্য এবং বৈদেশিক পুঁজি বিনিয়োগের অনুক‚ল পরিবেশ সৃষ্টিকল্পে, সরকার চলতি অর্থবৎসরের শুরুতে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা ২৫ লক্ষ হইতে ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করেন এবং বেসরকারি খাতে কয়েকটি নতুন শিল্প গড়িয়া তোলার অনুমতি দেওয়া হইয়াছে।’ (বাজেট বক্তৃতা, ১৯৭৫-৭৬, পৃ: ৫)। তাছাড়া ১৩৩টি পরিত্যক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান মালিকদের ফিরিয়ে দেয়া হয়, ৮২টি ব্যক্তিমালিকানায় ও ৫১টি কর্মচারী সমবায়ের নিকট বিক্রি করা হয়। এভাবেই তাঁর জীবদ্দশাতেই শিল্পায়নকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই প্রক্রিয়া বেগবান হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত ব্যক্তিখাত নির্ভর হলেও তাকে সহায়তার জন্যে জ্বালানিসহ মেগা অবকাঠামো খাত সরকারি বিনিয়োগেই গড়ে উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ ঘিরেই দেশে উল্লেখ করার মতো প্রবৃদ্ধির হার অর্জিত হচ্ছে। সর্বশেষ অর্থবছরে আমরা ৮.১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। চলতি অর্থবছরে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮.২০ শতাংশ। শুধু প্রবৃদ্ধি নয় এদেশের বঞ্চিতজনদের জন্য বড় অংকের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। অতিদারিদ্র্যের হার আগামী কয়েক বছরেই কমিয়ে পাঁচ শতাংশের আশেপাশে আনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সবার জন্য পেনশন কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এটাই স্পস্ট।
শেষে একটা কথা বলতেই হয়, বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু জাতিকে যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন, তা সফল হতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ এখন তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। তাঁর যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা, সময়োপযোগী পদক্ষেপেই বাংলাদেশ বিশ্বের বিস্ময় হয়ে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে, মধ্যম আয়ের দেশটি এখন উন্নয়নের রোল মডেল।
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন