ঢাকা শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

২২ দিন ইলিশ ধরা-বিক্রি নিষিদ্ধ

সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শ ম রেজাউল করিম

নাছিম উল আলম : | প্রকাশের সময় : ১৩ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০০ এএম

আগামীকাল বুধবার থেকে আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মা- ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২০ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। মন্ত্রী জানান, মা ইলিশ রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজনন সময় বিবেচনা নিয়ে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমাকে ভিত্তি ধরে মৎস্য সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধের এ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। শ ম রেজাউল করিম বলেন, বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশের নদ-নদী মোহনা ও সাগর থেকে আহরিত হয়। অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক সুন্দর ও বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। ইলিশ একসময় দুস্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছিল, এখন মানুষের হাতের নাগালে এসেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন মা ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছি। আমরা সম্মিলিতভাবে ইলিশের মা বা জাটকা ধরার সম্ভাবনা রয়েছে এমন এলাকা চিহ্নিত করেছি।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রায় পাঁচ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০-২৫ লাখ লোক ইলিশ পরিবহন, বিক্রি, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণ এবং জাটকা ধরার নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জীবনধারণের জন্য ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে জাটকা ও ইলিশ সমৃদ্ধ এলাকায়। চলতি বছর ইতোমধ্যে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ সময়ের আগেই দেশের ইলিশ সমৃদ্ধ ৩৬ জেলার ১৫৩ উপজেলায় মোট পাঁচ লাখ ২৮ হাজার ৩৪২টি জেলে পরিবারকে ২০ কেজি হারে মোট ১০ হাজার ৫৬৭ মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কেউ গোপনে বা বিকল্প উপায়ে ইলিশ ধরলে তা সংরক্ষণ করতে হবে, সেজন্য ওইসব অঞ্চলের বরফকল বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা চাই আমাদের সব মানুষ ইলিশ খাবে। বিদেশ থেকে কোনও মৎস্য আহরণের যান্ত্রিক নৌযান আসলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশের জলসীমায় কোনও অবৈধ মৎস্য আহরণের নৌকা বা জলযান, তা দেশি বা বিদেশি যাই হোক আমরা কোনোভাবেই অনুমতি দেবো না।

এ সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব রওনক মাহমুদ, মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইলিশ ধরা বন্ধ ২২ দিন
নাছিম উল আলম : বরিশাল থেকে জানান, এ মূল প্রজননকালের আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে ভারতীয় জেলেরা যাতে বঙ্গোপসাগরে আমাদের নৌসীমা থেকে ইলিশ লুটে নিতে না পারে সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতার দাবি জানিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের মৎসজীবীরা।

মূল প্রজননকালের এ সময়ে ইলিশ আহরণ বন্ধে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরসহ আরো কয়েকটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সবধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মনিটরিং সেল ছাড়াও দেশের উপকূলীয় ৩৬টি জেলার ১৫২টি উপজেলায় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা হয়ে জেলা পর্যায়ে পুলিশ-প্রশাসন ছাড়াও নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও আনসার-ভিডিপি এসব টাস্কফোর্সের সাথে কাজ করবে।

মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশ অনুযায়ী ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার উত্তর তজুমদ্দিন থেকে পশ্চিমে সৈয়দ আউলিয়া পয়েন্ট, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লতাচাপলি পয়েন্ট-এর ধলচর দ্বীপ ও মনপুরা দ্বীপ, চট্টগ্রাম উপকূলের মীরসরাই উপজেলার শাহেরখালী হয়ে হাইতকান্দী-মায়ানী পয়েন্ট এবং কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর কুতুবদিয়া থেকে গন্ডামারা পয়েন্ট এলাকায় মা ইলিশের অত্যাধিক প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। উপকূলের ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের প্রধান ঐ প্রজনন ক্ষেত্রে আগামী ২২ দিন সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। এছাড়া সারাদেশে ইলিশ আহরণ ও পরিবহনসহ বিপণনও বন্ধ থাকবে।

মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, অভিপ্রয়াণী মাছ ইলিশ তার জীবনচক্রে স্বাদু পানি থেকে সমুদ্রের নোনা পানিতে এবং সেখান থেকে পুনরায় স্বাদু পানিতে অভিপ্রয়াণ করে। একটি পরিপক্ব ইলিশ প্রতিদিন স্রোতের বিপরীতে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলতে পারে। উপক‚লের ৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের মূল প্রজনন ক্ষেত্রে মুক্তভাবে ভাসমান ডিম থেকে ফুটে বের হবার পরে ইলিশের লার্ভা, স্বাদু পানি ও নোনা পানির নার্সারী ক্ষেত্রসমূহে বিচরণ করে। এরা খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে। নার্সারী ক্ষেত্রসমূহে ৭-১০ সপ্তাহ ভেসে বেড়াবার পরে জাটকা হিসেবে সমুদ্রে চলে যায় পরিপক্বতা অর্জনের লক্ষ্যে। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় ১২-১৮ মাস অবস্থানের পরে পরিপক্বতা অর্জন করে প্রজননক্ষম হয়ে তারা আবার স্বাদু পানির নার্সারী ক্ষেত্রে ফিরে আসে। সমুদ্রে যাবার সময় পর্যন্ত যেসব এলাকায় জাটকা খাদ্য গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে, সেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নার্সারী ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহিৃত করায় অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, ২০১৮ সালের ৭ থেকে ২৮ অক্টোবর দেশব্যাপী ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকায় উপক‚লের প্রজননস্থলসহ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৪৮% মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়। এ সময়ে প্রজনন সাফল্য ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়। ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধের ফলে দেশে ৭ লাখ ৬ হাজার কেজি উৎপাদিত ডিমের ৫০%-এর সাফল্যজনক পরিস্ফুটন ও ১০% বেঁচে থাকলেও ইলিশ পরিবারে ৩ হাজার কোটি জাটকা যুক্ত হয়। এসময়ে দেশের প্রধান ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রসমূহে পরীক্ষামূলক নমুনায়নে ৮৩% ইলিশের রেণু পাওয়া যায়।

গত দুই দশক ধরে ইলিশ নিয়ে নানামুখি পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন সোয়া দ্’ুলাখ টন থেকে গত বছর ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। যা চলতি অর্থ বছরে ৫.৪০ লাখ টনে ও আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৫ লাখ টনে উন্নীত হবার ব্যাপারে আশাবাদী মৎস্য অধিদপ্তর। আর সারাদেশে মোট উৎপাদনের ৬৬-৭০% ইলিশ উৎপাদন হচ্ছে বরিশাল বিভাগের অভ্যন্তরীণ ও উপকলীয় মুক্ত জলাশয়ে। গত দুই দশকে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ১৫০ শতাংশেরও বেশি।

নিষিদ্ধকালীন ২২ দিনে এবার ইলিশ আহরণ বিরত জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা হিসেবে সরকার দেশের উপক‚লীয় ১৫২টি উপজেলার ৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৮২ জেলে পরিবারের জন্য ২০ কেজি করে ১০ হাজার ৫৬৬ টন চাল সরবারহ করবে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের ২ লাখ ৮২ হাজার ৫শ’ জেলে পরিবারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৬৫০ টন।

‘হিলসা ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্লান’-এর আওতায় ২০০৫ সালেই সর্বপ্রথম প্রধান প্রজনন মৌসুমে ইলিশের আহরণ বন্ধ রাখা হয় ১০ দিন। ২০১১ সালে তা ১১ দিন এবং ২০১৫ সালে ১৫ দিনে ও ২০১৬ সালে থেকে ২২ দিনে উন্নীত করা হয়। আমাদের অর্থনীতিতে জাতীয় মাছ ইলিশের একক অবদান এখন ১ শতাংশের বেশি। আর মৎস্য খাতে অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, সারা বিশ্বে উৎপাদন হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৬০ ভাগ বাংলাদেশে উৎপাদন ও আহরিত হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, দেশের ৪০টি জেলার ১৪৫ উপজেলার দেড় হাজার ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ জেলে পরিবার ইলিশ আহরণে সম্পৃক্ত। যার ৩২ শতাংশ সার্বক্ষণিক এবং ৬৮ শতাংশ খন্ডকালীন। এছাড়া ইলিশ বিপণন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ জাল, নৌকা ও বরফ তৈরি এবং মেরামত কাজেও প্রায় ২০-২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলাতেই প্রায় সোয়া ৩ লাখ জেলে এ পেশার সাথে জড়িত।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
mozibur binkalam ১৩ অক্টোবর, ২০২০, ৭:৩৩ এএম says : 0
ভারতের পুঁজাকে সামনে রেখে ইলিশ ধরার অনুমতি দেবে সরকার।আর পুজার উৎসব বারাতে ইলিশ যাবে ভারতে। হায়রে জনগন.......
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন