সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৩ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

নিবন্ধ

উন্নয়নে ইসলামী বন্ড সুকুক

মো. মাঈন উদ্দীন | প্রকাশের সময় : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১২:০৬ এএম

বাংলাদেশ সরকার প্রথম বারের মতো দেশে শরীয়াহ ভিত্তিক ইসলামী বন্ড সুকুক চালু করতে যাচ্ছে। সুকুক আরবি শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে সিল মহর লাগিয়ে কাউকে অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়ার আইনি দলিল। চলতি বন্ড ও সুকুক বন্ডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সুকুকে ইসলামী রীতি অনুসরণ করা হয়। এখানে সুদের ব্যবস্থা নেই, আছে মুনাফা, যা আগে থেকে নির্ধারণের উপায় নেই। যেটি বাৎসরিক কর্মকান্ডের আয়-ব্যায়ের উপর নির্ধারিত হয়। বিশ্বের অনেক দেশে এই বন্ড চালু আছে। সুকুক ছাড়ার দিক থেকে বর্তমানে মালয়েশিয়া বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) সুকুক ছেড়েছে। এছাড়া বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রে সুকুক প্রচলিত রয়েছে। মুসলিম দেশের পাশাপাশি অনেক অমুসলিম দেশেও এখন সুকুক চালু রয়েছে। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর শরীয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় সরকার কর্তৃক সুকুক ইস্যু ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত গাইড লাইন জারি করা হয়েছে প্রজ্ঞাপন আকারে। এতে করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ক্ষেত্র ও পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে।

অবকাঠামো খাতে সরকারের বিনিয়োগ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বেশি, যা বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আশা করা যায় না। এ কাজে ঘাটতি অর্থায়নে সরকার এখন পর্যন্ত প্রচলিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তা গ্রহণ করে আসছে। অথচ, দেশে বিদ্যমান ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শরীয়াহভিত্তিক হওয়ার কারণে প্রকল্প উন্নয়ন ভূমিকা পালন করতে পারছে না। সুকুক চালুর মাধ্যমে এসব ইসলামী প্রতিষ্ঠান এখন থেকে সরকারের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবে। ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক সুকুক বন্ড ইস্যু করবে। পত্রিকান্তরে জানা গেছে উন্নয়ন প্রকল্পে সুকুকের মাধ্যমে অর্থায়নের জন্য সরকারের অর্থ বিভাগ ৬৮টি প্রকল্পের একটি তালিকা তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৫টি প্রকল্পের জন্য লাগবে ১২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ৭০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা ৫টি, ৪০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার ১২টি এবং ২০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার ৪৬টি প্রকল্প চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশে বন্ড দুই ধরনের: একটি ট্রেজারি বিল এবং অন্যটি ট্রেজারি বন্ড। ট্রেজারি বিল স্বল্প মেয়াদী আর ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘমেয়াদী অর্থাৎ ২ থেকে ১০ বছর। বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ে সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসাবে বিভিন্ন সরকারি বন্ড সঞ্চয়পত্র এবং প্রাইজ বন্ড প্রচলিত ও জনপ্রিয়। এখন সাধারণভাবে বলা যায়, ইসলামী বন্ড সুকুকও এক ধরনের সরকারি বন্ড।

সুকুক ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক একটি প্রডাক্ট। এখানে প্রচলিত বন্ডের মতো সুদের ব্যবহার থাকে না। বন্ডের সুদের হার আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। সুকুকে মুনাফা নির্ধারিত হয় বাৎসরিক আয়-ব্যায়ের উপর। প্রচলিত বন্ড বা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীরা যে অর্থ বিনিয়োগ করে তার উপর একটি নির্দিশ হারে অর্থ লাভ করে। কিন্তু সুকুকের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা পূর্ব থেকে নির্ধারিত হারে কোন অর্থ পায় না। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা যখন যেমন হয় তার অংশীদারিত্ব লাভ করে। ইসলামী বন্ড হবে ইজারাভিত্তিক মানে নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক। কিন্তু সাধারণ বন্ডের ক্ষেত্রে তা হয় না। ঋণগ্রহিতা ও ঋণদাতার মধ্যে যে চুক্তি হয়ে থাকে তাহল প্রচলিত বন্ড। এতে ঋণের পরিমাণ, ঋণ পরিশোধের সময় ও সুদের হার নির্ধারিত থাকে। এ প্রচলিত বন্ডে সুদ, ফটকা ইত্যাদি থাকায় তা শরীয়াহসম্মত নয়। সুকুক হচ্ছে এমন একটি বিনিয়োগ সনদ, যেখানে সম্পদের উপর মালিকানা দেওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। সাধারণ সুকুককারীরা সম্পদের মালিকানা লাভ করে এবং শরীয়াহ সম্মত ভাবে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মুনাফা লাভ করে।

সরকারের অর্থমন্ত্রণালয় কর্তৃক সুকুক সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে ‘শরীয়াহ’ অর্থ কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস এ বর্ণিত ইসলামীক বিধি-বিধান। প্রজ্ঞাপনের ৯নং পয়েন্টে সুকুককে যেভাবে বুঝানো হয়েছে তাহলো বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (Bangladesh Government Investment Sukuk) (অতঃপর সুকুক নামে অভিহিত) অর্থ সমমূল্যের এইরূপ- অনুমোদিত সম্পত্তি-নিদর্শনপত্র যা কোনো শরীয়াহসম্মত বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট প্রকল্পের অথবা বিশেষ বিনিয়োগের বিদ্যমান সম্পদের (Tangible Assets) উপর অথবা/এবং ভবিষ্যতে উৎপাদনে বা প্রস্তুতের মাধ্যমে উক্ত চুক্তির অধীনে অন্তর্ভুক্ত হবে এইরূপ সম্পদের উপর অথবা/এবং ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভবিষ্যতে ক্রয় করা হবে বা ইতোমধ্যে ক্রয় করা হয়েছে এমন কোন শরীয়াহসম্মত পণ্যদ্রব্যের উপর অবিভক্ত মালিকানা অথবা অংশীদারিত্ব (ঝযধৎব) নিদের্শ করবে। সুকুকে অংশীদারিত্বের কথা বলা হয়েছে। তার মানে ইসলামী অর্থনীতিতে সুদের কোন স্থান নেই। এখানে মালিকানায় অংশীদারিত্ব করার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় শেষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় হিসাবের উপর মুনাফা নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ‘সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ এর সম্পদের বিপরীতে প্রথম ছাড়া হচ্ছে সুকুক। যিনি এতে বিনিয়োগ করবেন তিনি এই প্রকল্পের মালিকানায় মানে ওই প্রকল্পের যাবতীয় সম্পত্তির অংশীদার হয়ে যাবেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

অর্থ বিভাগসূত্রে জানা যায় বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ হাজার কোটি টাকা করে দুই দফায় বিনিয়োগকারীদের কাছে সুকুকের সার্টিফিকেট বিক্রি করবে। বিপরীতে তারা মুনাফা পাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষনায় দেখা গেছে, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দেশে মোট সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কারীদের ২৮ শতাংশ ইসলামী ধারায় বিনিয়োগে আগ্রহী। অর্থাৎ প্রচলিত ব্যবস্থায় সুদ গ্রহণ ও প্রদানে তারা আগ্রহী নয়। তাছাড়া দেশে ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত, বিনিয়োগ রেমিট্যান্স ও আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে ভাল অবস্থানে রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এইসব ইসলামী প্রতিষ্ঠান অবদান রেখে যাচ্ছে। তাছাড়া সরকারের অর্থ মন্ত্রনালয়ের বিভাগের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, পুরো ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অংশীদারিত্ব প্রায় ২৫ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংক ও শরীয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ঝোঁক দিনদিন আরো বাড়ছে। এছাড়া আর্ন্তজাতিক গবেষণা সংস্থা থমসনের ২০১৬-১৭ সময়ে প্রকাশ করা বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বৈশ্বিক ইসলামি অর্থায়নে সম্পদের পরিমাণ ছিল ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ মার্কিন ডলার। বলা হয়, ইসলামী অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এতই ইতিবাচক যে চলতি ২০২১ সালেই তা সাড়ে তিন ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। সরকারের ঘাটতি অর্থায়নে দেশে শরীয়াহভিত্তিক কোনো উপকরণ নেই। সুকুক চালু হলে ইসলামি ব্যাংকসমূহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবে এবং সরকারও ঘাটতি অর্থায়নে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। সরকারের সুদের ব্যয়ও কমবে। বাংলাদেশের নাগরিক যেকোন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন রাষ্ট্রায়াত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকসমূহ সুকুক কিনতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক একজন বিনিয়োগকারী সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে। বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ নেই। সুকুক ৫ বছর মেয়াদী এবং বিনিয়োগকারীরা ৬ মাস পরপর মুনাফা পাবেন।

দেশে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর স্কিম যেমন, ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ড, যার মুনাফার হার ৩.৬৯ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে সুকুকের প্রাক্কলিত মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪.৬৯ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, সুকুকে প্রাইমারী ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রসপেকটাস অনুযায়ী (স্পেশাল পারপাস ভেহিকল) এসপিভি প্রাইভেট প্লেসমেন্ট অথবা অকসানের মাধ্যমে অভিহিত মূল্যে সুকুক ইস্যু করা যাবে। ইনভেস্টমেন্ট ডিলারসহ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সুকুক অকসানে নিজেদের জন্য বিড দাখিল করতে পারবে। প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ক্রয়কৃত সুকুক সেকেন্ডারি মার্কেটেও ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। নিবাসী অথবা অনিবাসী বিনিয়োগকারী উভয়ই সেকেন্ডারি মার্কেটে ক্রয়-বিক্রয়ে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তারল্য ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সুকুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এছাড়া সমাজের বৈষম্য নিরসনে সম্পদের ইনসাফভিত্তিক বণ্টন ও মালিকানার জন্য সুকুক একটি উত্তম ও শরীয়াহসম্মত প্রডাক্ট। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুকুক ইস্যু একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সরকার অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ প্রডাক্ট সুকুক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ইসলামী বিধি-বিধান কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস এর বিধানসমূহ শরীয়াহ এডভাইজারী কমিটির মাধ্যমে কতটুকু প্রতিফলন ঘটবে সেটা দেখার বিষয় রয়েছে। সুকুক প্রডাক্ট সফল বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ব্যবস্থাপকদের ও বিনিয়োগকারীদের শরীয়াহ নীতিমালা বিষয়ক জ্ঞান অর্জন অতীব জরুরী। বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে সুকুক ব্যাপক অবদান রাখতে পারবে। সরকরের প্রাথমিক ভাবে লাভজনক প্রকল্পসমূহে সুকুক ইস্যু করা উচিত এবং পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে বড় প্রজক্টে না নিয়ে স্বল্প ব্যয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে সুকুক ইস্যু করতে পারে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন