বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৬ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

বিদেশি বিনিয়োগ আনতে জোর চেষ্টা চালাতে হবে

মো. মাঈন উদ্দীন | প্রকাশের সময় : ১৫ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৭ এএম

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করতে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করতে হবে। করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্থ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আগ্রহী করতে সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বিজিএমইসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও জোর তৎপরতা থাকা চাই।

এফডিআই বাড়াতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও লজিস্টিক সেবার উন্নতি ঘটাতে হবে। আমাদেরকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও মূল্য মানের সাথে সম্পৃক্ত হতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। বিভিন্ন উন্নত দেশের সাথে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি, পারস্পরিক সমঝতা বৃদ্ধি ও শুল্ক বাধা থাকলে তা দূর কারার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। কারণ এলডিসি উত্তরণের পরে সুরক্ষাবাদী থাকার সুযোগ নেই। শুল্ক বাধা থাকলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যাবে না। আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাণিজ্য বাড়াতে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। আমাদের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের প্রতি জোর দিতে হবে।

বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনার বিভিন্ন খাত যেমন: নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, আইসিটি, অটোমোবাইল, সমুদ্র অর্থনীতি, পর্যটন, হালকা প্রকৌশলী, কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহবান ও এসব খাতে বিনিয়োগ লাভজনক ও অনুকূল পরিবেশের কথা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তুলে ধরা উচিত। অর্থনৈতিতে কূটনীতিতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভিয়েতনাম বিদেশি বিনিয়োগে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় ভিয়েতনাম ২৫ নম্বরে, যেখানে বাংলাদেশ আছে ৫৬ নম্বরে। ভিয়েতনামের রপ্তানি বাজার অনেক বড়। পোশাক রপ্তানিতেও তারা দ্বিতীয় স্থানে। বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। তারা শুধু শ্রম শিল্প নয়, বরং এখন তারা উচ্চ প্রযুক্তি রপ্তানি করছে, যা তাদের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত এফডিআইয়ের কারণে। সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম. এ মান্নান বলেন, ‘আমাদের শিখতে হবে, তারা কীভাবে ভালো করছে, আর আমরা কেন পিছিয়ে আছি।’

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অনেক সুযোগ রয়েছে। এদেশের আছে বিশাল মানব সম্পদ, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় রয়েছে যথেষ্ট শ্রমশক্তি। এ শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে পণ্য উৎপাদনের বড় বাজার রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে চীন ও ভারতের মতো দেশে রপ্তানি করা যায়। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আমাদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো আরও মজবুত করতে হবে। বিরোধী মতকে অবহেলা না করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে পরমতসহিষ্ণু হওয়া উচিত। কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিবেশ থাকলে, দুর্নীতি ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ বিনষ্ট হয়।

জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনে যোগদান করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ইউএস বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফরওয়ার্ড: দ্যা ফ্রন্টিয়ার গ্রোথ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, সম্ভাবনাময় খাতগুলোর কথা উল্লেখ করে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আহবান জানান। অধিবেশন উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী গ্রুপ ও সরকার প্রধানদের সাথে অর্থনৈতিক কূটনীতির যে সুযোগ তা কাজে লাগানো উচিত। বিশেষ করে চীন, সৌদি আরব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশ ও মার্কিন যুক্তিরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা উচিত। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তার পরিবেশ সৃষ্টি ও সক্ষমতার জন্য অর্থনৈতিক কূটনীতি বড় একটি অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, করোনার প্রভাবে বিশ^বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (ফেরেন ডাইরেক্ট ইভেস্টমেন্ট বা এফডিআই) প্রবাহ কমেছে ৩১ কোটি ৪ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ হাজার ৬৭০ কেটি টাকা। শতকরা হিসাবে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছিল ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ২০২০ সালে তা কমে এসেছে ২৫৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। ২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ২১৫ কেটি ১৬ লাখ ডলার। ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৩৬১ কেটি ৩৩ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৬ সালে থেকে ২০২০ সালের পর্যন্ত ১৫ বছরে দেশে মোট ২ হাজার ৫৫০ কোটি ৮৫ লাখ ডলার এফডিআই এসেছে। এর মধ্যে মূলপুঁজি এসেছে ৯১২ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা মোট বিনিয়োগের ৩৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। মুনাফা থেকে ও ঋণ থেকে বিনিয়োগ হয়েছে বাকি ৬৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত বছর (২০২০) দেশে আসা মোট এফডিআইয়ের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ মূল পুঁজি, ৬১ দশমিক ১ শতাংশ মুনাফা থেকে পুনরায় বিনিয়োগ এবং ৬ শতাংশ এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানির ঋণ। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী বিদেশি কোম্পানিগুলো তিনভাবে পুঁজি দেশে আনতে পারে। যেমন: ১। মূলধন হিসেবে নগদ বা শিল্পের যন্ত্রাতি হিসাবে। ২। দেশে ব্যবসা করে অর্জিত মুনাফা বিদেশে না নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করতে পারে। ৩। এক কোম্পানি অন্য কোম্পানি থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারে। এ তিন পদ্ধতির যেকোনভাবে বিনিয়োগ করলে তা এফডিআই হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মোট বিনিয়োগের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সিঙ্গাপুর। তারা মোট বিনিয়োগের ১৬ দশমিক ১ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে আছে নেদারল্যান্ড, তাদের বিনিয়োগ ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

বর্তমানে করোনার প্রকোপ কাটিয়ে উঠার কাজ শুরু করেছে বিশে^র বিভিন্ন দেশে। ফলে এফডিআই বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণ দ্রুত শেষ করা উচিত। চলমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাথে যোগাযোগ আরও বাড়ানো উচিত। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একা বিনিয়োগ করে খুব কম। দেশি বিনিয়োগকারীদের হাত ধরে বিদেশি বিনিয়োগ আসে। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য শুল্ক বাধা দূর করতে হবে। উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন