মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯, ০৫ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

শিশুদের কোলাহলে মুখরিত গ্রন্থমেলা

রাহাদ উদ্দিন : | প্রকাশের সময় : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, ১২:২০ এএম

রাজধানীর আজিমপুর এলাকা থেকে বাবা শহিদুলের হাত ধরে বইমেলায় এসেছে সাড়ে ছয় বছরের শিশু জাকিয়া এবং সাড়ে তিন বছরের শিশু জান্নাত। দুজনেই এবারের বইমেলায় প্রথম। শিশুপ্রহরে জাকিয়ার আবদারে তাকে ‘খোকা মিয়া ও গাইড হালুম’ বইটি কিনে দিয়েছেন বাবা। তবে জান্নাতের কোনো চাওয়া নেই; হালুম, ইকরি আর টুকটুকিদের নাচ আর কথা শুনেই মহাখুশি সে। শুধু জাকিয়া আর জান্নাতই নয় গতকালের বইমেলায় বাবা মায়ের হাত ধরে বইমেলায় এসেছে আরো অসংখ্য শিশু। শিশুদের কোলাহলে মুখরিত ছিল এদিনের মেলা প্রাঙ্গণ।

করোনা বিধিনিষেধের কারণে এবারের বইমেলায় শুরু থেকে ছিল না শিশুপ্রহর। তবে সংক্রমণের নিম্নগতি এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল শুক্রবার থেকে বাংলা একাডেমি ফের উন্মুক্ত করেছে শিশুপ্রহর। শিশুদের নিরাপত্তার সার্থে অধিকতর নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করে আয়োজক কমিটি।

গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেলা শুরু হয় সকাল ১১ টায়। সকাল দশটা থেকেই দেখা যায় শিশুদের নিয়ে বাবা মায়ের মেলায় প্রবেশের অপেক্ষা। শিশুদেরও চোখে মুখে ছিল উচ্ছ¡াস আর উদ্দীপনা। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা কাজল জানান, শুরু থেকেই মেলায় অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়। শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ সকলেই এসে ভিড় করেন মেলায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় মেলায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন কর্তপক্ষ।

মেলা প্রাঙ্গণের মুক্ত মঞ্চের পাশে রাস্তার ধারে ঘাসের উপর বসে বই পড়ছে আরিসা, ফাহাদ, ফালাক তিন ভাই বোন। পাশেই বসে আছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তাদের বাবা জাহিদ। সন্তানরা এখন পড়তে পারে- এটা ভেবেই আনন্দে আত্মহারা জাহিদ। ইনকিলাবকে তিনি বলেন, আমি জীবনে খুব ভালো কিছু করতে পারিনি, তবে সন্তানদের ছোটকাল থেকেই পড়াশোনার প্রতি যে আগ্রহ দেখছি তাতে আমি সত্যিই অভিভ‚ত। স্বপ্ন দেখি তারা একদিন অনেক বড় হবে। কি কি বই কিনে দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, হুমায়ূন আহমেদের সূর্যের দিন, মহাকাশ বিজ্ঞান বিষয়ক আমাদের সৌরজগৎসহ বেশ কয়েকটি বই হাতে তুলে দিয়েছি ওদের। তবে এগুলা তারা নিজেরাই পছন্দ করে নিয়েছে।

ঝিঙেফুল প্রকাশনীর সামনে কথা হয় রাজধানীর মিরপুর থেকে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা জিসানের সাথে। সিজানের কাঁধে ছিল চার বছরের শিশু তাবাসসুম। তাকে কিনে দিল প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল হালিমের লিখা আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ (স.)। স্টলের বিক্রয়কর্মী সাইদ জানায় এ বইটি এখন পর্যন্ত তার দোকানে সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছে। বই তো কিনে দিলেন তা সে কি পড়তে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে জিসান বলেন, এখনো ভালোভাবে পারে না, তবে যখন পারবে তখন পড়বে। আগে থেকেই বইটি কিনে দিয়েছি যাতে শিশুকালেই সে রাসূলের সাথে পরিচিত হতে পারে।

বিকেল সাড়ে তিনটায় শিশু চত্বরের স্টেজে হালুম, ইকরি, শিকু ও টুকটুকির সাথে ‘চলছে গাড়ি সিসিমপুরে’ গানে আপন মনে নাচ মিলিয়েছে শিশুরা। বেলা সাড়ে এগারোটায় সিসিমপুর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ। এসময় উপস্থিত শিশু-কিশোরদের আনন্দ যেন ধরে না। একে একে নিয়ে আসা হয় কার্টুন চরিত্রগুলোকে। মাইকে কার্টুনগুলো নিয়ে সঞ্চালকের প্রশ্নের চিৎকার করে উত্তর দিতে থাকে তারা।

সিসিমপুর কে কে দেখ? আমি দেখি, কোন টিভিতে দেখো? মাছরাঙ্গা, সপ্তাহে কয়দিন দেখো? ৭দিন, করোনার সময় কি পড়া জরুরি? মাস্ক পড়া, আর কি করতে হবে? হাত ধুতে হবে, ইত্যাদি প্রশ্ন উত্তরে শিশু চত্বরের প্রাণচাঞ্চল্য ছিল দেখার মতো। এরপর টুকটুকি এসে গাইলো ‘আমি বই পড়তে ভালোবাসি’, হালুম গাইলো ‘আমি মাছ খাই’ আর ইকরি গাইলো ‘ইকরি, ইকরি, ইকরি আমি প্রশ্ন করতে ভালোবাসি’। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় আবারও জমে উঠে হালুম, শিকু আর টুকটুকিদের ঘিরে শিশুদের কোলাহল।
শিশু চত্বরে চিলড্রেন্স পাবলিকেশন, শিশুরাজ্য, শৈশব প্রকাশ, সিসিমপুর, ঘুড়ি প্রকাশন, মাহি প্রকাশনী, ছোটদের মেলা, শিলা প্রকাশনী, বাবুই, ঘাস ফড়িংসহ প্রায় ৩০টি স্টল দেখা যায়। বিনোদনের পাশাপাশি হরেক রকমের বই কিনতে দেখা যায় শিশুদের। চত্বরে বসে বই পড়ার জন্য আলাদা জায়গা করায় শিশুদের পাশাপাশি সন্তোষ প্রকাশ করে অভিভাবকরা।

শিশুপ্রহরে রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে আগত চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী প্রীতি বলেন, আব্বু আম্মুর সাথে মেলায় এসেছি। টিভিতে দেখা হালুম-শিকু-ইকরিদের এখানে একসাথে দেখতে পেয়ে খুব মজা পাচ্ছি। মেয়েকে নিয়ে শিশু প্রহরে ঘুরতে আসা রাজধানীর মোহাম্মদপুরের দম্পতি শিমুল আর তৃষ্ণা বিশ্বাস বলেন, সিসিমপুরে শিশুদের নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থা সত্যিই প্রশংসনীয়। বয়সের হিসেবে ৩ বছর পার না হওয়া সিয়ামও আব্বু আম্মুর সাথে বই মেলায় এসেছে। সিয়ামের বাবা তানভীর আহমেদ বলেন, সপ্তাহের অন্যদিনে বই মেলায় আসার সুযোগ পাবো না। তাই পরিবার নিয়ে আজই মেলা থেকে ঘুরে যাচ্ছি।

এদিকে, মেলায় বিকাশের আয়োজনে ‘গল্পরা শাখা মেলে বইটি পড়া হলে’ সেøাগানকে ধারণ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে বই সংগ্রহ। কয়েকটা স্টল ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ৩ থেকে ৪শ’ বই সংগ্রহ করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যাদের বই কেনার সামর্থ্য থাকে না তাদেরকে পড়াশোনামুখি করার জন্যই এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের টাকায় কেনা বই দান করে যায়।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps