বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৫ বৈশাখ ১৪৩১, ০৮ শাওয়াল ১৪৪৫ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

আলোচনায় বিচার বিভাগ

ফিরে দেখা ২০১৬

| প্রকাশের সময় : ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

দুই মন্ত্রীকে আপিল বিভাগের দন্ড : গেজেট নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে তলব : ট্রাইব্যুনাল সরানো নিয়ে মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের চিঠি চালাচালি
মালেক মল্লিক : গেল বছরে প্রথম থেকেই সবার দৃষ্টি ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দিকে। প্রধান বিচারপতির দেয়া একাধিক বক্তব্য, বিবৃতি, অবসরে রায় লেখা নিয়ে বিতর্ক, দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ফাঁসির রায় কার্যকর নিয়ে নজর থাকে সুপ্রিম কোর্টের দিকে। প্রধান বিচারপতির অবসরে যাওয়ার পর বিচারপতিদের রায় লেখা নিয়ে বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলতে থাকে সর্বত্র। সরকারের একাধিক মন্ত্রীও বক্তব্য দেন। রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয় প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের আলোচনা-সমালোচনা। সর্বশেষ নিম্নআদালত বিচারকদের শৃঙ্খলার গেজেট প্রকাশ ও হাইকোর্ট এলাকা থেকে ট্রাইব্যুনাল সরানো নিয়েও আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের মতানৈক্য সবার দৃষ্টি কাড়ে। শুরু হয় নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন।
এছাড়াও বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার বিষয়ে আপিল বিভাগের নীতিমালা, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা নিয়ে রায় প্রকাশ, বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটকদের মুক্তির উদ্যোগ নিয়েও বছরের শেষ দিকেও ফের আলোচনায় আসে উচ্চ আদালত।
২০১৫ সালের প্রথমদিক প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন অবসরে পর আপিল বিভাগের বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি একই বছরের ১৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তিতে প্রধান বিচারপতির এক বাণীতে সরগরম হয়ে ওঠে বিচারাঙ্গন। প্রধান বিচারপতি বলেন, কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থী। এই বক্তব্যের পক্ষে তার যুক্তি, অবসরের পর তাদের শপথ বহাল থাকে না। আদালতের নথি সরকারি দলিল। একজন বিচারপতি তাই অবসরগ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান।
অবশ্য প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আইনমন্ত্রী সংসদে বলেন, আমাদের যে সংবিধান, তার কোনো আর্টিকেলে এ কথা লেখা নেই যে বিচারপতি তার অবসর গ্রহণের পর রায় লিখতে পারবেন না। তা যদি হয়, তাহলে এটা আর যাই হোক অসাংবিধানিক হতে পারে না। এছাড়াও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেন, এটা (অবসরের পর রায় লেখা) অসাংবিধানিক হলে রাষ্ট্রের ভিত্তিগুলো অসাংবিধানিক হয়ে যায়। এমনকি প্রধান বিচারপতি নিজেও। সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেন, এভাবে কথা বলা তার (প্রধান বিচারপতি) ঠিক হয়নি। একই কথা তিনি বার বার বলে যাচ্ছেন। তিনি যা ইচ্ছা তা বলতে পারেন না।
প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্যে নড়েচড়ে বসে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। অবসরের পর সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ১৬ মাস পর লেখা রায়কে অসাংবিধানিক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তৎকালিন সভাপতি ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।
দুই মন্ত্রীকে আপিল বিভাগের দ- : জামায়াত নেতা মীর কাসেমের আপিলের রায়ের আগে গত ৫ মার্চ ঢাকায় এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে বেঞ্চ গঠন করে আপিল পুনঃশুনানির দাবি করেন খাদ্যমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও প্রধান বিচারপতির মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। দুই মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে আদালত অবমাননার অভিযোগে তাদের তলব করা হয়। গত ২৭ মার্চ দুই মন্ত্রীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে রায় প্রদান করেন। অনাদায়ে সাতদিনের বিনাশ্রম কারাদ- দেন আদালত।
গত ১ সেপ্টেম্বর এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, তারা (দুই মন্ত্রী) আইন লঙ্ঘন করেছেন এবং সংবিধান সমুন্নত রাখার যে শপথ নিয়েছেন তা লঙ্ঘন করেছেন। এই রায়ের পর দুই মন্ত্রীর পদে থাকা নিয়ে নানামুখি বিতর্ক তৈরি হলেও এখনও তারা দায়িত্বে বহাল আছেন।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল : ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাত থেকে সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ওই বছরের নয়জন আইনজীবী সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করলে তার শুনানির পর হাইকোর্ট ওই সংশোধনী কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। এরপর ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা রায় দিলে সংসদে এই রায় নিয়ে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা।
বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারে আপিলের নীতিমালা : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৫৪ ধারায় গ্রেফতার হয়ে পুলিশ হেফাজতে মারা গিয়েছিলেন। মৃত্যু ঘটনায় করা রিটের প্রেক্ষিতে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট এক রায়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রচলিত বিধান সংশোধন করতে সরকারকে নির্দেশ দেন। রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল চলতি বছর ২৪ মে আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন। যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। আপিল বিভাগের রায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য ২৬ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার রায় প্রকাশ : দেশের রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার ক্রম (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) তালিকা বাতিল সংক্রান্ত আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল কিছু সংশোধনসহ নিষ্পত্তি করেন। রায়ে প্রজাতন্ত্রের সচিবদের সমমর্যাদা দেয়া জেলা জজদের। এতে জেলা জজরা বর্তমান ক্রম থেকে আট ধাপ উপরে ওঠছেন। প্রধান বিচারপতিকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সমমর্যাদায় তৃতীয় নিতে বলা হয়েছে। কারণ ১৯৭৫ সালের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে এ দুটি পদ একসঙ্গে ৪ নম্বর তালিকায় ছিল। ২ নম্বরে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ৩ নম্বরে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ বিলুপ্ত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে দুইয়ে নেয়া হয়। স্পিকারকে এক ধাপ উপরে তিনে নেয়া হলেও প্রধান বিচারপতি থেকে যান চারে।
বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়ন নিয়ে জটিলতা : অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশে আদালত থেকে সময় নিয়েও প্রজ্ঞাপন জারি করেনি আইন মন্ত্রণালয়। এর প্রেক্ষিতে ১২ ডিসেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে তলব করা হয়। মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে বলা হয়, অধস্তন আদালতের বিচারকগণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট প্রস্তাবিত আচরণ বিধি ও শৃঙ্খলা বিধির খসড়া গেজেটে প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তা নেই মর্মে প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। এমন সিদ্ধান্তের পরদিনই আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ জানিয়ে দিন, প্রেসিডেন্ট ভুল বুঝানো হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা কোনো আপোষ করবেন না। প্রেসিডেন্টকে দিয়ে যারা পরিপত্র জারি করিয়েছে তাদের সম্পর্কে আদালত বলেন, মিনিস্ট্রিতে যারা আছে তাদের সামান্যতম জ্ঞান থাকলে এ ধরনের চিঠি ইস্যু করত না।
ট্রাইব্যুনাল সরানো প্রসঙ্গ : হাইকোর্ট এলাকায় থেকে ট্রাইব্যুনাল সরানো নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের চিঠি চালাচালি শুরু হয়। গত ১৮ আগস্ট ৩১ অক্টোবরে মধ্যে ট্রাইব্যুনাল সরিয়ে নিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় সুপ্রিম কোর্ট। দীর্ঘ আড়াই মাস পর গত ৩০ অক্টোবর সরানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচেনা করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠায়। চলতি মাসের ৪ তারিখে মন্ত্রণালয় বরাবর ফের চিঠি দেন সুপ্রিম কোর্ট। গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল না সরাতে সুপ্রিম কোর্টের চিঠি পুনর্বিবেচনা করতে আবারও অনুরোধ জানায় মন্ত্রণালয়। আইনজ্ঞনা মনে করেন, এতে বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন মনোভাব দেখা যায়। গত ২৪ ডিসেম্বর বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্টের স্থান সংকটের কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল সরিয়ে নিতে মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি।
প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন যুগান্তকারী রায়কে স্বাগত জানিয়েছে দেশের আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, সারা বিশ্বের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয় বলে তারা মন্তব্য করেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
ফারুক ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১২:৪৭ পিএম says : 0
কোর্ট যেটা বলে সেটাই ঠিক
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন