ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

মৃত্যুমুখে নদ-নদী

ভারতের পানি আগ্রাসন

| প্রকাশের সময় : ২ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

মিজানুর রহমান তোতা : ‘মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে কিছু বলতেও পারছি না, সইতেও পারছি না। রীতিমতো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ভারতের আগ্রাসনে দিনে দিনে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছেছে গঙ্গানির্ভর সব নদ-নদী’। কথাগুলো বললেন একসময়ের প্রমত্তা কুমার নদপাড়ের বাসিন্দা ঝিনাইদহের শৈলকুপার গাড়াগঞ্জের ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম। পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার আরাফাত আলী ও যশোরের ভৈরবপাড়ের আব্দুল মান্নানসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের নদীপাড়ের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের একই ধরণের কথা, ফারাক্কার ধাক্কা আর সহ্য করাতে পারছে না নদ-নদী। বছরের পর বছর ধরে ধাক্কা খেয়ে এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। নদ-নদীর কাহিল অবস্থার কারণে মারমুখী ও বিপজ্জনক হচ্ছে সার্বিক পরিবেশ। পরিবেশবিদগণ বলেছেন, আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে দ্রæত। পরিবর্তন ঘটছে ষড়ঋতুর। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন আরো হুমকির মুখে। দেশের বৃহত্তম গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের (জিকে প্রজেক্ট) অস্তিত্ব বিপন্ন। মাইলের পর মাইল ক্যানেল পানিশূণ্য, খাঁ খাঁ করছে- দেখলে যে কারোর চোখ দিয়ে পানি আসবে। মংলা সমুদ্রবন্দর ও নওয়াপাড়া নদী বন্দর মারাত্মক সংকটে। যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, উদ্ভিদ, প্রাণীকুল, জলজ, বনজ ও মৎস্য সম্পদের অপুরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। লবনাক্ততা গ্রাস করায় ক্রমেই উপকুলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা হচ্ছে বিরাণভূমি। মরুকরণ প্রক্রিয়া হচ্ছে মারাত্মক। নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় পলি জমে ভরাট হয়ে জলবায়ুর পরিবর্তন ছাড়াও ভূমি গঠনের পরিবর্তন ঘটছে। বাড়ছে ক্রমাগতভাবে সমুদ্রে পানির উচ্চতা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সুত্র জানায়, নদ-নদীতে পানি প্রবাহ না থাকায় পলি জমে ভরাট হচ্ছে। প্রতিমুহূর্তে খেসারত দিতে হচ্ছে নানাভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে। ভূপৃষ্ঠের পানি স্বল্পতায় মাটিরতলার পানি সম্পদ হচ্ছে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এসব কিছুই মরণ বাঁধ ফারাক্কার ধাক্কায় ঘটছে। কৃষি ও নদী বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্র এই তথ্য চরম উদ্বেগ করে বলেছে, ভারত ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করে মাত্র ৪০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে। পরবর্তীতে ওই বাঁধ স্থায়ী হয়। দিনে দিনে তা পরিণত হয় মরণ বাঁধে। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি প্রত্যাহার করে ভাগীরথী নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি করে কলকতা বন্দরকে রক্ষা করে। আন্তর্জাতিক নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার নীতি ও আইন বিরুদ্ধ। অনেক দেন দরবারের পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেব গৌড়ার মধ্যে দীর্ঘ প্রত্যাশিত ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারপরেও দেশ ন্যায়্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। শুধু ফারাক্কা নয়, মিনি ফারাক্কার ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না ইছামতি, কোদলা ও বেতনাসহ অভিন্ন নদীগুলো।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সুত্র জানায়, মানুষের জীবন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সাথে বলিষ্ঠ ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে নদ-নদীর। রক্তের শিরা-উপশিরার মতো বাংলাদেশের নদী ধাবমান। নদীই জীবন। নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার পানি প্রাপ্তি। নদ-নদী বাঁচানো, জীবন-জীবিকার সমস্যার সমাধান এবং সামগ্রিক উন্নয়নে নদ-নদী বাঁচানোর বিকল্প নেই। কিন্তু সেটি সম্ভব হচ্ছে না ফারাক্কা ও মিনি ফারাক্কার কারণে। দেশের ৩৭ শতাংশ এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নির্ভরশীল পদ্মা ও গড়াইএর শাখা নদী মাথাভাঙ্গা, গড়াই, ইছামতি, ভৈরব, আপার ভৈরব, কুমার, মধুমতি, ফটকি, বেতাই, চিত্রা, কপোতাক্ষ, নবগঙ্গা ও অভিন্ন নদী ইছামতি ও কোদলাসহ অর্ধ শতাধিক নদ-নদীর অবস্থা শোচনীয়। শুকিয়ে মুমূর্ষ খালে পরিণত হয়েছে। কোথাও স্রোতহীন, কোথাও পানিশূন্য অবস্থা। নদ-নদীর পানি বঙ্গোপসাগরে পড়ার স্বাভাবিক ধারা হয়েছে অস্বাভাবিক। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের মতে, নদ-নদীর প্রবাহ বিঘ্নতা ও সমুদ্রের পানির উচ্চতা জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায়। জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবছর উপকুলীয় অঞ্চলে জানমালের ক্ষতি হচ্ছে।
পৃথিবীর অনন্য সম্পদ সুন্দরবনের বনভূমি বিপদের আশংকা কাটছে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলসহ বিশাল এলাকার অপুরণীয় ক্ষতি হচ্ছে অভিন্ন নদী শাসনে। বাস্তব অবস্থাটা হচ্ছে, স্রোতহীন নদীর পানি একরকম চুইয়ে পড়ার মতো অবস্থার কারণে সামগ্রিক ক্ষতি হচ্ছে। বেশ আগে থেকেই বঙ্গোপসাগরের সাথে যুক্ত সুন্দরবনের নদ-নদীর পানির প্রবল তোড় নেই। ভাটি অঞ্চলের নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে দ্রæত একথাটি সবাই স্বীকার করলেও ফারাক্কার মরণ বাঁধের কারণে যে এটি ঘটছে তা ভারতের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়ার মতো ভুমিকা রাখার ক্ষেত্রে বরাবরই অনুপস্থিত থাকছে।
নদীদেহের অন্যতম হৃদপিন্ড পদ্মা এখন স্পন্দনহীন। পদ্মার বুকে শুরু হয়েছে হাহাকার। পদ্মার শাখা-প্রশাখার উৎসমুখ গড়াইয়ে পানি গড়িয়ে আসছে না পদ্মা থেকে। অনেক প্রমত্তা ও ¯্রােতস্বিনি নদীর পানি কমে গেছে, কোন ঢেউ নেই, পানি নড়াচড়া নেই, একরকম নিথর হয়ে আছে। ফারাক্কা বাঁধের পাশাপাশি অভিন্ন নদ-নদীর উজানে বাঁধ, পাকা সড়ক নির্মাণ, গ্রোয়েন ও পাথর ফেলে পানি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ভারত। চলতি শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই গঙ্গানির্ভর নদ-নদীর কাহিল অবস্থা দেখে নদপাড়ের লোকজন বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। গতবারের চেয়ে এবার ভরা শুষ্ক মৌসুমে ভয়াবহ অবস্থার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মরণ ফাঁদ ফারাক্কার কারণে প্রতিমুহূর্তে খেসারত দিতে হচ্ছে নানাভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিলের প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, অধিকাংশ নদ-নদী একবারেই শুকিয়ে গেছে। খাল-বিলের পানিশূন্য অবস্থা। এতে সৃষ্টি হচ্ছে জীবন-জীবিকায় মারাত্মক সংকট।
সরেজমিনে ঝিনাইদহের গাড়াগঞ্জ পয়েন্ট থেকে শৈলকুপা পর্যন্ত রাস্তার ধার দিয়ে প্রবাহিত কুমার নদীর চেহারা দেখা গেল করুণ। নদপাড়ের বাসিন্দারা আফসোস করলেন, ভারত এভাবে নদ-নদী গলা টিপে মারছে অথচ কোন বাদ-প্রতিবাদ নেই। একসময় কুমার নদীতে ঢেউ খেলতো। এখন পায়ে হেটে পার হওয়া যায়। নদীর বুকে চাষাবাদ হয়। ঝিনাইদহ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদীরও একই অবস্থা। ক্যাসেলব্রিজ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আরাপপুরের বাসিন্দা তকব্বর জানালেন, নদীর কথা কি জিজ্ঞাসা করবেন আর কি বলবো, নদী কি আর নদী আছে প্রায় সব নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে নরেন্দ্রপুর গ্রামে যেতে হাসপাতালের সামনে চিত্রা উপর ব্রিজ পার হওয়ার সময় দেখা গেল নদীর অস্তিত্ব প্রায় মুছে যাবার উপক্রম হয়েছে। যশোরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদেও চেহারা দেখলে সবার কষ্ট হবে। শিল্পশহর নওয়াপাড়ায় ভৈরব নদে যে পানি আছে তা কালো হয়ে গেছে। শিল্পবর্জ্য ফেলার কারণে নদেও মাছ মরে যাচ্ছে। ভৈরব নদের খুলনা অংশেও যশোরের মতো দখলের পর দখল হয়েছে। যশোরের শার্শার বেতনা নদী, যশোরের মুক্তেশ্বরী, বেনাপোলের হাকরখাল, নড়াইলের মধুমতি, মাগুরার নবগঙ্গা ও চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ নদ-নদী শুকিয়ে দিনে দিনে খাল হয়ে যাচ্ছে।
ঝিনাইদহের নবগঙ্গা, কালীগঞ্জের চিত্রা, নড়াইলের মধুমতি, যশোরের ভৈরব, মুক্তেশ্বরী, ইছামতি ও মাগুরার নবগঙ্গাসহ সব নদ-নদী প্রায় পানিশূন্য অবস্থা। মানচিত্র থেকে অনেক নদীর নাম মুছে যাবার উপক্রম হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও হাইড্রোলজি বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য জানতে চাইলে বলা হয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সকল নদ-নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। নদীগুলো প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ছে দ্রুত। নদ-নদীর বর্তমান চেহারায় দেখা গেছে গত বছরের চেয়ে এবার আরো করুণ। নদ-নদীর চেহারা জানান দিচ্ছে ভরা শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট হবে তীব্র । সামনে সেচনির্ভর বোরো আবাদ নিয়ে কৃষকরা মহাদুশ্চিন্তায়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন