ঢাকা, শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

সম্পাদকীয়

গণপরিবহনে নৈরাজ্য চলছেই

মো. ওসমান গনি | প্রকাশের সময় : ১৮ জুন, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

শত চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না গণপরিবহনের নৈরাজ্য। দিন যত যায় ততই যেন প্রকট আকার ধারণ করছে গণপরিবহনে নৈরাজ্য। পরিবহন মালিক, ড্রাইভার, কন্ডাক্টর, হেলপারদের কাছে যেন অসহায় সাধারণ মানুষ। সিটিংয়ের নামে চিটিং, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, দুর্ঘটনা সবমিলিয়ে দুর্ভোগের মধ্যে চলছে রাজধানীর জনজীবন। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে বাসে বাসে ধাক্কা লাগানো, যাত্রীদের বাস থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া, গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা- এসব নিত্যদিনের চিত্র। অথচ এ নিয়ে মালিকপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। এসব ছাড়াও ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করে চলছে লক্কড়ঝক্কড় মার্কা বাস। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত আসন, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা না থাকাসহ ভাড়ার নিয়ে চরম অনিয়ম করা হচ্ছে এসব বাসে।

অনেকের মতে, বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন সব সেক্টরে উন্নতি হলেও নগর পরিবহনের ক্ষেত্রে কোনো উন্নতি হয়নি। এখানে যাত্রীদের অভিযোগ শোনার মতো কেউ নেই।

গোটা রাজধানীতে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। কোথাও ফাঁকা নেই। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন এই নগরীতে কমপক্ষে ৩১৭টি গাড়ি নামছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিগত গাড়ি বা প্রাইভেটকার। দেশে নিবন্ধিত প্রাইভেটকারের ৭৫ শতাংশ চলছে রাজধানীতে। অথচ এসব পরিবহনে যাতায়াত করছে মাত্র ৮ ভাগ যাত্রী। বাকি ২৫ ভাগ যানবাহন ৯২ ভাগ যাত্রীকে বহন করছে। যানজটে প্রয়োজনীয় ট্রিপের এক-তৃতীয়াংশ ট্রিপও পূরণ হচ্ছে না প্রতিদিন। এতে করে পরিবহন শ্রমিকরা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। নিত্যনৈমিত্তিক ভোগান্তিতে পড়ছে নগরবাসী। নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রীদের অভিযোগ, সরকারের সঠিক তদারকির অভাবে এতো কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও শৃঙ্খলা ফিরছে না সড়কে।

এদিকে পবিত্র রমজানের শুরু থেকেই ইফতারির পূর্ব মুহূর্তে যানজট, গণপরিবহন সংকটসহ নানা কারণে নগরীর যাত্রী সাধারণ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পরিবর্তিত অফিস সময় অনুযায়ী, বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত নগরীতে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের প্রায় ৯৭ শতাংশ সিটিং সার্ভিসের নামে দরজা বন্ধ করে যাতায়াত করছে। এতে নগরীর মাঝপথের বিভিন্ন স্টপেজের যাত্রীসাধারণ চরম নৈরাজ্যের শিকার হচ্ছেন। যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে এমন চিত্রই ওঠে এসেছে।

এতে বলা হয়, বাসগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার পরিবর্তে কোম্পানি কর্তৃক নির্ধারিত অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। এতে করে নিম্ন আয়ের লোকজনের যাতায়াত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে নগরীতে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশা শতভাগ চুক্তিতে চলাচল করছে। এতে মিটারের প্রায় ৩-৪ গুণ বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া যাত্রীদের পছন্দের গন্তব্যে যেতে রাজি হয় না ৯৩ শতাংশ অটোরিকশা। অনেকটা কাকতালীয়ভাবে ড্রাইভারের পছন্দের গন্তব্যে মিলে গেলে রাজি হয় যাত্রীর গন্তব্যে যেতে।

কমলাপুর, মগবাজার, শনির আখড়া, গুলিস্তান, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, শাহবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর-১০, মহাখালী, আগারগাঁও, ধানমন্ডি, বনানী, বারিধারাসহ নগরীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ট্যাক্সি ক্যাবের দেখা মেলে না। নৈরাজ্যে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে রাইড শেয়ারিংয়ের নামে চলাচল করা মোটরবাইকগুলো। বিকেল ৪টার পর থেকে অ্যাপসের পরিবর্তে খ্যাপে ৩ থেকে ৪ গুণ অতিরিক্ত ভাড়ায় যাত্রী বহন করার চিত্র নগরজুড়ে দেখা গেছে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রয়োজনীয় সংখ্যক যাত্রী ছাউনি না থাকায় বা যাত্রী ছাউনিগুলো বেদখল হয়ে যাওয়ায় তীব্র গরমে নাজুক পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন নগরীর রোজাদার যাত্রীসাধারণ। বিশেষত নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা এ পরিস্থিতিতে ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হলেও রাস্তার কোথাও দাঁড়ানো বা বসে বিশ্রামের সুযোগ মেলে না।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির গপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রীসেবা পর্যবেক্ষণ উপ-কমিটির সদস্যরা রমজানের শুরু থেকে যাত্রীসাধারণের কর্মস্থলে যাতায়াত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এই সময় দেখা গেছে, অফিস ছুটি শেষে ইফতারকে কেন্দ্র করে ঘরমুখী যাত্রীকে টার্গেট করে নগরীতে চলাচলকারী বাসের প্রায় সব কটি রাতারাতি সিটিং সার্ভিস বনে যায়। এসব বাস বিশেষত ইফতারের সময় যাত্রীদের ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দ্রæত গন্তব্যে যাত্রা করে। এই সময়কালে একমাত্র বিআরটিসি ও হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানির বাস লোকাল হিসেবে চলাচল করে। এসব বাসে মাঝপথের যাত্রীরা বাদুরঝোলা হয়ে যাতায়াত করছে।

পর্যবেক্ষণকালে ৯০ শতাংশ যাত্রী রমজানে গণপরিবহন ব্যবস্থার এ কর্মকাÐের ওপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ৯৫ শতাংশ যাত্রী প্রতিদিন যাতায়াতে দুর্ভোগের শিকার হন। ৯৮ শতাংশ যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের শিকার হয়। ৬৮ শতাংশ যাত্রী চলন্তবাসে ওঠানামা করতে বাধ্য হন। সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও ৩৬ শতাংশ যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হন। হয়রানির শিকার হলেও অভিযোগ কোথায় করতে হয় জানে না ৯৩ শতাংশ যাত্রী। তবে ৯০ শতাংশ যাত্রী মনে করেন অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না বলেই তারা অভিযোগ করেন না। যাত্রী ভোগান্তির এ চিত্র জাতীয় দৈনিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় গুরুত্ব পেলেও এসব ভোগান্তি নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন