ঢাকা, মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০১৯, ০১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১২ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

ইসলামী জীবন

ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘিত হলে করণীয়

মো. আখতার হোসেন আজাদ | প্রকাশের সময় : ২৮ জুন, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

একজন নাগরিকের বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন। এর কিছু প্রদান করে থাকে পরিবার, কিছু করে রাষ্ট্র। তবে অন্যান্য অধিকারের থেকে ভোক্তা অধিকার কিছুটা ভিন্ন। যিনি উৎপাদিত পণ্য ও সেবা চূড়ান্ত ভোগের জন্য ক্রয় করেন, অর্থনীতির ভাষায় তাকে ভোক্তা বলে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে যিনি কোন পণ্য ক্রয় করেন কেবলমাত্র নিজে ভোগ করার জন্য তিনিই ভোক্তা। একজন ব্যক্তি যখন কোন পণ্য ক্রয় করেন তখন তার জানার অধিকার রয়েছে পণ্যটি কবে উৎপাদিত হয়েছে, কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, এর কাঁচামাল কি কি, মূল্য কত, প্রভৃতি। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে একজন বিক্রেতা বাধ্য। যদি কোন বিক্রেতা এসব প্রশ্নের উত্তর না দেন বা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তখন আইন অনুযায়ী তাতে ভোক্তা অধিকার ক্ষুন্ন হয়। জাতিসংঘ স্বীকৃত ভোক্তা অধিকার ৮ টি। সেগুলো হলো- মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়ার অধিকার, পছন্দের অধিকার, জানার অধিকার, অভিযোগ করা ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার, ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভের অধিকার, সুস্থ পরিবেশের অধিকার।

পণ্য ক্রয়ে প্রতারণার হাত থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে বহুল প্রতিক্ষীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের ফলে কোন ভোক্তা পণ্য ক্রয়ে পণ্যের ওজন, পরিমান, উপাদান, মূল্যসহ কোন বিষয়ে প্রতারিত হলে তার প্রতিকার পেয়ে থাকেন। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ আইনটি সম্পর্কে অবগত নয়। এমনকি শিক্ষিত সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তির মধ্যেও এই আইন নিয়ে তেমন কোন ধারণায় নেই। এই আইন সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকার দরুণ তাদের প্রতারিত হবার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে অনলাইনে কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কিন্তু ওয়েবসাইটে পণ্যের যে মান উল্লেখ করা থাকে, মূল্য পরিশোধ করার পর পণ্য হাতে পেয়ে দেখা যায় বর্ণিত গুনাগুণ সেই পণ্যের মধ্যে নেই। তাই ভোক্তাকেই এই আইন সম্পর্কে জানতে হবে এবং নির্ধারিত পন্থায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে। তাহলেই অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম কমবে এবং ভোক্তার প্রতারিত হবার সংখ্যাও কমে আসবে।

কিছুদিন আগে আমি পাবনার ঈশ্বরদী স্টেশনে কোহিনুর বেকারীর একটি পাউরুটি কিনি। তা খেয়ে পেটব্যাথা অনুভব করলে মোড়ক লক্ষ্য করে দেখতে পাই তাতে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ এবং মূল্য উল্লেখ করা নাই। এরপর আমি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ইমেইলের মাধ্যমে অভিযোগ করি। এক সপ্তাহ পরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাবনা কার্যালয়ে আমার ও উক্ত বেকারীর মালিকের উপস্থিতিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং এরপর থেকে পণ্যে সকল তথ্য সংযোজন করবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ৪ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী অভিযোগকারীকে মোট জরিমানার ২৫ শতাংশ প্রদান করার বিধি থাকায় আমাকে ১ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।

২০০৯ সালে প্রণীত ভোক্তা অধিকার আইনের মোট ৮২ টি ধারা রয়েছে। এছাড়াও কয়েকটি ধারার উপধারা রয়েছে। আমি ভোক্তা অধিকার আইনে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। ৩৭ ধারা মোতাবেক, পণ্যের মোড়ক না থাকলে বা মোড়কে পণ্যের তথ্য না থাকলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৩৮ ধারায় পণ্যের দাম সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে না রাখলে ১ বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবার বিধান রয়েছে। ৩৯ ধারায় উল্লেখ করা আছে, সেবার দাম সংরক্ষণ এবং সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে না রাখলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪০ ধারা অনুযায়ী, ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে পণ্য, সেবা বা ঔষধ বিক্রি করলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪১ ধারা অনুযায়ী, ভেজাল পণ্য বা ঔষধ বিক্রি করলে বিক্রেতা অনধিক ৩ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪২ ধারা অনুযায়ী, খাদ্য পণ্যে স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর কোন নিষিদ্ধ দ্রব্য মিশিয়ে বিক্রি করলে বিক্রেতা অনধিক ৩ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪৩ ধারায় উল্লেখ আছে, জীবন বা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর এমন পণ্য অবৈধ উপায়ে বিক্রি করলে বিক্রেতা অনধিক ২ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪৪ ধারায় উল্লেখ আছে, পণ্যের মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতার সাথে প্রতারণা করলে অনধিক ১ বছর কারাদন্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪৫ ধারা অনুযায়ী, ক্রেতার সাথে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা সরবরাহ না করলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪৬ ধারা অনুযায়ী, পণ্য বিক্রির সময় ওজনে কারচুপি করলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪৭ ধারায় বলা হয়েছে, ওজন পরিমাপক যন্ত্রের মাধ্যমে জালিয়াতি করে ওজনে কম দিলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪৮ ধারায় বলা আছে, কোন পণ্য পরিমাপে কারচুপি করলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৪৯ ধারা অনুযায়ী, পণ্যের দৈর্ঘ্য পরিমাপে কারচুপি করলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৫০ ধারা অনুযায়ী, কোন পণ্যের নকল উৎপাদন এবং বিক্রি করলে বিক্রেতা অনধিক ৩ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৫১ ধারা অনুযায়ী, মেয়াদ উত্তীর্ণ কোন পণ্য বা ঔষধ বিক্রি করলে বিক্রেতা অনধিক ১ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৫২ ধারা অনুযায়ী, কোন বিক্রেতা সেবা গ্রহীতার জীবন বিপন্নকারী কোন কাজ করলে তিনি অনধিক ৩ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। ৫৩ ধারা অনুযায়ী, কোন সেবা প্রদানকারী অবহেলা করে সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য, জীবনহানি ঘটালে অনধিক ৩ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।

কোন ক্ষেত্রে পণ্য কিনে প্রতারিত হলে অভিযোগ দায়ের করার পদ্ধতি খুবই সহজ। বর্তমানে প্রত্যেকের হাতে হাতে স্মার্টফোন। গুগোল প্লে-স্টোরে সংরক্ষিত ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ অ্যাপসটির মাধ্যমে খুব সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ দিয়ে অভিযোগ করা যায়। এছাড়াও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে সরাসরি ইমেইলের (nccc@dncrp.gov.bd) মাধ্যমেও অভিযোগ করা যায়। ইমেইলে অভিযোগকারীর নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও ঘটনার বিবরণ এবং প্রমাণস্বরূপ পণ্য ক্রয়ের রশিদের ছবি সংযুক্ত করতে হবে। এছাড়াও ০১৭৭৭৭৫৩৬৬৮ ও ০৩১-৭৪১২১২ নাম্বারে কল দিয়েও অভিযোগ জানানো যাবে। এরপর তদন্ত শেষে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে যে আর্থিক জরিমানা করা হবে তার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী ভোক্তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ দেওয়া হবে। তবে অভিযোগটি পণ্য কেনার ৩০ দিনের মধ্যে দায়ের করতে হবে।
ভোক্তা অধিকার আইন নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। সবাই সচেতন হলেই আইনটির সঠিক বাস্তবায়ন হবে। আমাদের একটুখানি সচেতনতায় পারে নিরাপদ খাদ্যের ও ভেজালমুক্ত পণ্যের বাংলাদেশ গড়তে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন