ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

দুর্যোগে সহমর্মিতা ও সমবেদনা

মোহাম্মদ আবু নোমান | প্রকাশের সময় : ২৩ মে, ২০২০, ১২:০৮ এএম

যে কোনো ক্রান্তিকালে ব্যক্তি কি পরিবারের মানসিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতা যেমন প্রকাশিত হয়; বিপরীত দিকে বিভাজন, অমানবিকতা, অসহযোগিতাও প্রকাশ হয়ে থাকে। ভয়ঙ্কর করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এক বৈশ্বিক যুদ্ধের আকারে। করোনা আমাদের জাতীয় জীবনে বিপদ। দুঃখ-কষ্ট ও অনিশ্চয়তার আঘাত হানা ছাড়াও বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের জীবনধারণের সমস্যা প্রকটতর করে তুলেছে। সর্বোপরি এই জাতীয় মহাদুর্যোগ সরকারের একার পক্ষে সামাল দেয়া মোটেই সম্ভব নয়। এ জন্য পূর্ণমাত্রায় দরকার সামাজিক সংহতি, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত ও ছোট ছোট দলগত উদ্যোগে বিপন্ন মানুষের মধ্যে ত্রাণ সহযোগিতাসহ নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক তৎপরতা চলছে। অনেকে একেবারে নিভৃতেও সহযোগিতা করছেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে লাখ লাখ মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করোনা-দুর্যোগে কোনো না কোনো প্রতিকারমূলক কাজে নেমেছে। বিপন্ন মানুষের সহযোগিতায় ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় বলে মনে করি। কারণ, এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে একটি সমাজের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা, মানবতাবোধ ও পরার্থপরতার প্রকাশ ঘটে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে হেলাফেলা, বাগাড়ম্বর, বিভাজন প্রকট আকার ধারণ করছে। এ সময় তারা সহমর্মিতা ও সহযোগিতার তেমন বড় উদাহরণ রাখতে পারছে না। রাজনৈতিক নেতাদের বাগাড়ম্বর, অতিকথন, একজন আরেকজনকে মশকরা, ঠাট্টা-তামাশার প্রতিযোগিতা কাম্য নয়। করোনার মহাদুর্যোগকালে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রলাপ, বালখিল্য আচরণ, প্রকৃত পক্ষে তাদের চিন্তার দৌড় ও মন-মানসিকতার ছাপই প্রতিফলিত করছে। বিপদের সময়, দুর্যোগকালে যাদের পথ দেখানোর কথা, যারা জনসাধারণের পাশে থেকে সাহস যোগাবেন, তাদের থেকে বালকসুলভ মন্তব্য একেবারেই বেমানান।

মহামারীতে আক্রান্তদের সেবায় পুরো বিশ্বে এক নম্বরের যোদ্ধা হলেন চিকিৎসক ও নার্স। করোনা-আক্রান্ত প্রতিটি দেশেই তাদের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এই গুরুতর সঙ্কটকালে তারাই আমাদের অন্যতম ভরসা। বড় রকমের ঝুঁকির মধ্যেও তারা রোগীদের চিকিৎসার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছেন। সব দেশেই করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের অভিযোগ, পিপিইর ব্যাপক ঘাটতি রয়ে গেছে। আর যেসব পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলোর সিংহভাগই মানসম্মত নয়। এন-৯৫ মাস্ক ছাড়া করোনা রোগীর সামনে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও চিকিৎসকদের এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করা হয়নি। বিদেশ থেকে এন-৯৫ মাস্ক আমদানির খরচ দেখিয়ে সরবরাহ করা হয়েছে দেশে তৈরি নিম্নমানের মাস্ক, এমন অভিযোগও উঠেছে।

রমযানের শিক্ষা ধৈর্য ও সংযম। রমযানের একটি নাম হচ্ছে ‘শাহরুল মুওয়াসাত’। এর অর্থ ‘পারস্পরিক সহমর্মিতার মাস’। একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, সমবেদনা ও সহমর্মিতা রমযানের প্রকৃত শিক্ষা। এ মাসে আমাদের দান-খয়রাত, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে আলাদা গুরুত্ব দেয়া কর্তব্য। দেশে বর্তমানে করোনা সঙ্কটে অগণিত মানুষের আয়-উপার্জন বন্ধ থাকায়, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। সর্বোপরি বিশ্ববাসীকে এক কঠিন পরিস্থিতিতে পবিত্র রমযান পালন করতে হচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলাম উদার ও মানবিক বার্তা নিয়ে বিশ্বময় এক ইতিবাচক সম্প্রদায় হিসেবে সুপ্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত। রমযানে শিক্ষা নিতে হবে সংযমের উৎকর্ষ থেকে। এটি পরস্পর আপোস-মীমাংসার মাস। তাই এ মাসে ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকার বিশেষ হুকুম আছে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কেউ যদি তোমার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাহলে তুমি তাকে বল, আমি রোযাদার (মুসলিম শরিফ : ১১৫১)। অর্থাৎ, আমি তোমার কথার প্রতিউত্তর করবো না। যেকোনো পরিস্থিতিতে উস্কানিতে সাড়া না দিয়ে সংযম প্রদর্শন করাই রমযানের শিক্ষা।

সহমর্মিতার প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও ক্রেতা-ভোক্তাসাধারণের হাতের নাগালে রাখা। খাদ্যে ভেজাল না মেশানো এবং ওজনে কমবেশি না করা। মুসলিম বিশ্ব তো বটেই বহু অমুসলিম দেশেও রমযানের সময় ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দেন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও রমযান ডিস্কাউন্ট বা রমযান অফার ঘোষণা করে। বাংলাদেশে দেখা যায় এর বিপরীত প্রবণতা। অধিক বিক্রি হওয়ার এ মওসুমে মুসলিম নাগরিকদের সিয়াম সাধনার সুবিধার্থে ব্যবসায়ীরা যদি সওয়াব ও কল্যাণের আশায় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দেয়, মুনাফা কম করে বা সম্ভব হলে সহায়তামূলক স্বল্পমূল্য নির্ধারণ করে তাহলে রমযান ও সিয়াম সাধনার মূল লক্ষ্য বাস্তবায়িত হতে পারে। যারা বস্তাপঁচা খাদ্যসামগ্রীতে বারবার নকল তারিখ লাগিয়ে কিংবা রমযানের সুযোগে রোযাদারদের পকেট কাটার ধান্ধা করে তারা রোযার অর্থই বোঝে না। বরং রমযানের কোনো উৎকর্ষ তাদের জীবনকে স্পর্শ তো করবেই না, বরং রমযান তাদের জন্য আসবে কঠিন পরীক্ষা হয়ে। ইসলাম শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়, এর মূল বাণীই হচ্ছে মানবতার উৎকর্ষ। আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য আর মানুষসহ সকল সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা। পবিত্র রমযানে মুসলমানের জীবন-জীবিকার সর্বত্র সততা, সংযম ও পবিত্রতার ছোঁয়া লাগবে এটাই স্বাভাবিক।

ইসলাম চায় দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী, দারিদ্রমুক্ত সমাজ। আর এ দারিদ্রমুক্ত পৃথিবী ও সমাজ গঠনে যাকাত অনবদ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদের প্রবাহ গতিশীল এবং সম্পদের পরিশুদ্ধি অর্জিত হয়, রাষ্ট্রের অর্থনীতি সচল হয়, উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, সমাজে এবং রাষ্ট্রে বেকারত্ব হ্রাস পায়। আল্লাহ নির্ধারিত নিয়মে যাকাত প্রদান করার ফলে সামাজিক সম্প্রীতি এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এ মাসে প্রতিটি ফরজের সওয়াব ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই রমযানে মানুষ যাকাত প্রদান করেন। সম্পদের যাকাত দেয়া নেয়ামতের শোকর আদায়ে আল্লাহর বিশেষ নির্দেশ। এটি কোনো ট্যাক্স নয়। আল্লাহর বিধান ও অন্যতম ফরজ ইবাদত। রমযানে যাকাত সাদকা ও ফিতরার মাধ্যমে মানবতার সেবার বিশাল সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এতিম, বিধবা ও গরিব মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি। এ মাসে যাকাত দেয়া উত্তম। কেননা রাসূল (সা) এ মাসে বেশি বেশি দান খয়রাত করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত- রাসুলুল্ল­াহ ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল, আর রমযানে তার এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত (বুখারি শরিফ : ১৯০২)।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে লাখ লাখ মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করোনা-দুর্যোগে কোনো না কোনো প্রতিকারমূলক কাজে নেমেছে। বিপন্ন মানুষের সহযোগিতায় ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় বলে মনে করি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন