সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯, ২৬ যিলক্বদ ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

যানজটে পরিত্যক্ত নগরী

শব্দদুষণ ও বায়ুদুষণে শীর্ষে ঢাকা

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৭ মার্চ, ২০২২, ১২:২৬ এএম

বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউ এয়ার ভিজ্যুয়ালের তথ্যমতে পৃথিবীর দুষিত শহরগুলোর অন্যতম হচ্ছে ঢাকা মহানগর। বায়ুর মান মাপার আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠান প্রতিদিনই বিশ্বের মেগা সিটিগুলোর বায়ুর মান পরীক্ষা করে ফলাফল জানিয়ে দেয়। এতে প্রায়ই দেখা যায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা পৃথিবীর দুষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে থাকে। বায়ু দুষণের মতো শব্দ দুষণেও ঢাকার অবস্থান বিশ্বের বড় শহরগুলোর তালিকার প্রথম সারিতে। এই বায়ূ দুষণ, শব্দ দুষণের সঙ্গে যোগ হয়েছে যানজট। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু রাজধানী ঢাকার যানজটের কারণেই প্রতি বছর প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় আড়াই শতাংশ। কিছুদিন আগে রাজধানীর খামারবাড়ির বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘দ্য ফিউচার প্ল্যানিং আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয় যানজটের কারণে ঢাকা মহানগরীতে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে কর্মজীবীদের; যার আর্থিক ক্ষতির পরিমান বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
৪’শ বছরের পুরনো ঢাকা শহরের বিস্তার চারদিকে হয়েছে। ঢাকা শহরের মোট আয়োতন ১৩৫৩ বর্গকিলোমিটার; আর বর্তমান রাস্তার আয়তন ২,২০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২১০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক। একটি আধুনিক নগরীতে মোট আয়তনের ২০ থেকে ২৫ ভাগ রাস্তা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ ভাগ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শহরের মোট যাত্রীর ৫ থেকে ৬ ভাগ পরিবহন হয় ব্যক্তিগত গাড়িতে; কিন্তু তা সড়কের ৭০ ভাগ অংশ দখল করে রাখে। অন্যদিকে ২৮ ভাগ যাত্রী চলাচল করে গণপরিবহনে। একটি বাস যে সংখ্যক যাত্রী বহন করতে পারে, তার জন্য কমপক্ষে ৫০টি ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজন। কিন্তু একটি বাস সড়কে যে জায়গা নেয় তা দুটি ব্যক্তিগত গাড়ির চেয়েও কম। এ ছাড়া অব্যবস্থাপনা, দখল দুষণতো রয়েছে। আগে মতিঝিল থেকে উত্তরা যেতে এক ঘন্টা সময় লাগতো। এখন যেতে সময় লাগে কমবেশি ৩ ঘন্টা। ঢাকা মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার হচ্ছে। কিন্তু যানবাহনের গতি কমছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরে যানবাহনের গতি মানুষের হাঁটার গতির মতো ঘণ্টায় প্রায় ৫ কিলোমিটারে চলে এসেছে। ১২ বছর আগেও ঢাকায় যানবাহনের এ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। দায়িত্বশীলদের অব্যবস্থাপনা, খামখেয়ালি এবং দখলদারিত্বে রাজধানী ঢাকা কার্যত ক্রমান্বয়ে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। পুরানা ঢাকার পথ ধরে গোটা শহর পরিত্যাক্ত শহরে রুপ নিতে যাচ্ছে।
এআরআই’র এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৫ সালের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী ঢাকায় যানবাহনের দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ট্রিপ হয়। কোন মানুষ একটি বাহনে উঠে নির্ধারিত গন্তব্যে নামলে একটি ট্রিপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে যানজটে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ২০১৬ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গবর্নেন্স এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, পিক আওয়ারে ঢাকায় গাড়ির গতিসীমা থাকে ঘণ্টায় ৯ কিলোমিটার। এই ধীরগতির কারণে প্রতিবার যাতায়াতে একজন যাত্রীর যে সময় নষ্ট হয়, যার আর্থিক পরিমাণ দিনে আনুমানিক ৫৩ টাকা। এছাড়া যানজটে নষ্ট হওয়া সময়ের আর্থিক মূল্য ও জ্বালানি খরচ সার্বিকভাবে মাসে ২২৭ কোটি টাকা দাঁড়ায়। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম। গবেষকদের মতে, যানজটের কারণে যাত্রীদের ৯ ধরনের মানসিক আচরণকে প্রভাবিত করে। যানজটে বসে থাকলে মানসিক চাপ তৈরি হয়। নানা রকম দুশ্চিন্তা ভর করে। এই মানসিক চাপ সব ধরনের রোগের উৎস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার নগরায়ণ পুরোপুরি অপরিকল্পিতভাবে ঘটেছে। নগরের জনসংখ্যাও বেড়েছে দ্রæতগতিতে। অথচ নগরের পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে হয়নি। ফলে যানজট পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। ঘর থেকে বের হলে গন্তব্যে কখন পৌঁছাবেন বলা মুশকিল। ১০ মিনিটের রাস্তা ২০ মিনিটও লাগতে পারে আবার এক ঘন্টাও লাগতে পারে।
অনুসন্ধান করে দেখা যায়, বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে মানুষ এবং বিভিন্ন গতির যানবাহনের জন্য আলাদা আলাদা লেন থাকে। কিন্তু প্রায় আড়াই কোটি জনসংখ্যার ঢাকা শহরে পৃথক কোনো লেন নেই। একই রাস্তায় একই সময়ে একাধিক পরিবহন অবাধে চলাচল করে। যাত্রীবাহী ছোটবড় বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি, এ্যাম্বুলেন্স, রিক্সা, ব্যাটারির রিক্সা, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, মালবাহী ভ্যান, কাভার্ডভ্যান, ঠেলাগাড়ি, ট্রাক এবং মানুষ পায়ে হেঁটে একই সময়ে একই রাস্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত চলাচল করে থাকে। কম গতি ও বেশি গতির বিভিন্ন যানবাহনের অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক চলাচলে রাজধানী ঢাকার সড়কগুলো অনিয়ন্ত্রিত যানজট লেগে যাচ্ছে। তাছাড়া পার্কিং, ট্রাফিক সিস্টেম ও সড়ক অব্যবস্থাপনার কারণে যানজট হচ্ছে। আইন শৃংখলা বাহিনী ট্রাফিক সিস্টেম চালু রাখার নামে এবং যানবাহনের ফিটনেস দেখার নামে রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে টাকা আদায়ের কারণে যানজট লেগে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তা কম হওয়ায়, একই রাস্তায় দ্রæতগতির ও ধীরগতির পরিবহন চলাচল, শহরের মধ্যে রেল ক্রসিং, ভিআইপি মুভমেন্টের কারণেও রাজধানীর যানজট ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সেই সঙ্গে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতায় সড়কে অব্যাহত খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।
পুরান ঢাকার অনেক এলাকা কার্যত পরিত্যাক্ত হয়ে গেছে। ঘিঞ্জি এলাকায় অনেক রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে। যানজটের কারণে ঢাকার সব এলাকাই কার্যত পরিত্যাক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এক সময় ধানমÐিকে অভিজাত শ্রেণির এলাকা ধরা হতো। গত ৫০ থেকে ৬০ বছরে ধানমÐির অনেক এলাকা পরিত্যাক্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কয়েক বছর আগেও রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা অভিজাত শ্রেণির মানুষের বাস। নতুন রুপে গড়ে উঠে উত্তরা। কিন্তু প্রতিটি এলাকায় প্রতিদিন যানজট ভয়ঙ্কর রুপ নেয়। ৫ মিনিটের পায়ে হাটা পথ বাসে ও প্রাইভেট কারে পার হতে আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা লেগে যায়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, পরিস্থিতি উন্নতি করার জন্য বাস সিস্টেম উন্নত করা, পথচারী সিস্টেম উন্নত করা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা উন্নীত করার কথা ছিল, সেটিও হয়নি। জরুরী ব্যবস্থাপনা উন্নতি করা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূলত আমাদের পরিকল্পনার অভাব। কলকাতায় যেমন ২০ বছর আগেই আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে সিস্টেম করেছে, আমাদের কেন হয়নি? ম্যাস ট্রানজিট সিস্টেমটা আমরা ডেভলপ করতে পারিনি ঢাকা শহরে। এটা একটা বিশাল ব্যর্থতা। আর দু নম্বর ব্যর্থতা হচ্ছে, মাল্টি মডেল ট্রান্সপোর্টেশন। একদিকে ঠেলাগাড়ি, ভ্যানগাড়ি চলছে অন্যদিকে দামিদামি গাড়ি চলছে আরেকদিকে বাস, ট্রাক, মাল্টি মডেল রিক্সা চলছে ইত্যাদি। এই মাল্টি মডেল ট্রান্সপোর্টেশন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমকে এক্সটেন্ড করতে দেয় না। তার সাথে ফুটপাত দখল করে রাখা, সেজন্য মানুষকে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়। মোড়ে মোড়ে রিক্সা, বাস দাঁড়িয়ে থেকে বিশাল যানযট সৃষ্টি করে। নগর পরিকল্পনা মানে শুধু আবাসন না। রোড ট্রান্সপোর্টেশনও। এখানে রাজউক, সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মধ্যে যে সমন্বয় থাকা দরকার তা নেই। ফলে এই অরাজকতা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Google Apps