ঢাকা, রোববার ২১ জুলাই ২০১৯, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

আদিগন্ত

উচ্চ আদালতে মূর্তি রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের অন্তরায়

| প্রকাশের সময় : ১৮ মার্চ, ২০১৭, ১২:০০ এএম

তৈমূর আলম খন্দকার : জাতি, রাষ্ট্র, সরকার, রাষ্ট্রীয় সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এমনকি গ্রাম/শহর/মহল্লা পর্যায়ের সামাজিক সংগঠনসহ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের পরিচয় বহন করে যার যার জানান দেয়, বিশেষ চিহ্ন সম্বলিত লগো, ফ্লাগ প্রভৃতি ব্যবহার করে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান/সংগঠন/সংস্থা শ্লোগান ব্যবহার করেও তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে প্রচারের পাশাপাশি নিজেদের উদ্দেশ্য ও আদর্শের প্রতি নিজেদের কমিটমেন্টের (হোক যদিও তথাকথিত) প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন- বাস্তবতা যাই হোক, কারাগার কর্তৃপক্ষ তাদের শ্লোগান হিসাবে ব্যবহার করে ‘রাখিবো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’। কারা কর্তৃপক্ষ কয়েদী/আসামীদের কতটুকু নিরাপদ রাখে বা আলোর পথ কতটুকু দেখায় তা একজন ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ বলতে পারে না। তবুও শ্লোগানটি পড়ে মানুষ সান্ত¦না খুঁজে পায় এ আশা ও প্রত্যাশায় যে, এমন যদি হতো, যেমনটি শ্লোগানে লেখা আছে!
দাঁড়িপাল্লা ‘তুলা রাশি’র প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। রাশিচক্র বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, তুলা রাশির লোকেরা নাকি ন্যায় বিচারক হয়। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা ‘ভারসাম্য’ রক্ষার প্রতীক হিসাবেও দৃশ্যমান। এ সব কারণেই হোক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক ‘দাঁড়িপাল্লা’কে বিশ্বব্যাপী বিচার বিভাগ প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও তার অধীনস্থ আদালত ‘দাঁড়িপাল্লা’কে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই। প্রতীকটি মার্জিত, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ, যা সহজ সরল ভাবধারার একটি পরিচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবিও বটে। ‘দাঁড়িপাল্লা’কে শুধুমাত্র বিচার বিভাগের প্রতিচ্ছবি বা প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত এবং ‘দাঁড়িপাল্লা’ শুধুমাত্র বিচার বিভাগই ব্যবহার করার হকদার এ মর্মে একটি নির্দেশনা দিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশন যাতে কোন রাজনৈতিক দল এ প্রতীক’কে ‘মার্কা’ হিসাবে ব্যবহার করতে না পারে এ মর্মে মাননীয় প্রধান বিচারপতি একটি আদেশ দিয়েছেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে হয় যে, এ মার্কাটি ছিল জামায়াতে ইসলামী’র? মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে জামায়াত ইসলামী যেহেতু বেকায়দায় সেহেতু বিনা প্রতিবাদেই এ নির্দেশ কার্যকর হয়েছে এটাও নিশ্চিত।
বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের অন্যতম, যা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও নিরপেক্ষতার ভ‚ষণই যার অহঙ্কার ও পরিচয়। অন্য দুটি বিভাগ যথা আইন ও নির্বাহী বিভাগ (সরকার) পরস্পর সম্পূরক। কারণ যারা আইন প্রণয়ন করেন তারাই সরকার পরিচালনা করেন। ফলে একে অপরের উপর নির্ভরশীল যা বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে (সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে) প্রযোজ্য নয়। ফলে বিচার বিভাগ একক ও একটি ভিন্ন ধরনের ভাবমর্যাদা বহন করে; যা একমাত্র রক্ষা বা ক্ষুণœ করা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয় যদি তারা নিজেরা না করে। সম্প্রতি বাম হাতে দাঁড়িপাল্লা, ডান হাতে খোলা তলোয়ার চোখ বাঁধা অবস্থায় একটি নারী মূর্তি প্রদর্শন করা হয়েছে। পূর্বে সুপ্রিম কোর্ট বলতে মূল ভবনের সামনে ডিম্বাকারের ভিতরে দাঁড়িপাল্লা সহ গুম্বুজটিকে মিডিয়াতে দেখানো হতো, তদস্থলে এখন সুপ্রিম কোর্টের প্রতিচ্ছবি/প্রতীক হিসাবে বর্ণিত ঐ নারী মূর্তিকেই মিডিয়াতে দেখানো হচ্ছে। এ মূর্তি নিয়ে ইতোমধ্যে সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠন ওলামা লীগ প্রতিবাদ করেছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করে মিছিল মিটিং করছে। এমন কি সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করে এমন ৩০০ জন আইনজীবী লিখিতভাবে উক্ত মূর্তি অপসারনের জন্য প্রধান বিচারপতির নিকট আবেদন জানিয়েছেন। পত্রিকা খুললেই কোন না কোন সংগঠনের এ মর্মে বক্তৃতা বিবৃতি পাওয়া যাচ্ছে।
গ্রিক দেবীর আদলে স্থাপিত এই মূর্তির বিরোধিতায় অনেকেই (সংখ্যায় তারা যতই হোক) এখানে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ তালাশ করবে। তা হয়তো তারা করবেন। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এটাই সত্য যে ইসলাম একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্ম। সব দেশেই সংখ্যানুপাতে সংখ্যা গুরু সংখ্যা লঘু রয়েছে। সাংবিধানিকভাবে আমাদের রাষ্ট্রে সংখ্যা গুরু বা সংখ্যা লঘু নাই। বরং সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।’ এ ছাড়াও ইসলাম ধর্মে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, ‘সংখ্যা লঘুরা সংখ্যা গুরুদের আমানত’ এমতাবস্থায় যারা মূর্তি পূজক তাদের মনে আঘাত দেয়ার জন্য মূর্তি স্থাপনের বিষয়টির বিরোধিতা করা হচ্ছে এমনটি মনে করার যুক্তি সংগত কোন কারণ নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশের মানুষ যেমন ধর্মভীরু, তেমনি অসাম্প্রদায়িক। সে কারণেই ৯২% মুসলমানদের রাষ্ট্রে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণসহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি ঘটা করে উৎযাপিত হচ্ছে, যা ধর্ম নিরপেক্ষ(!) ভারতেও সম্ভব হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর চলছে নানা প্রকার নিপীড়ন, নির্যাতন; যার মাত্রা ছাড়িয়ে নৃসংসতার চরম রূপ ধারণ করছে। আমাদের আরেক পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার, যেখানে অহিংস বৌদ্ধরা সহিংস হামলা চালাচ্ছে নিরস্ত্র নিরীহ মুসলমানদের উপর এবং সেটাও হচ্ছে সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়, যার বিরুদ্ধে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতকে একটি ‘রা’ করতেও দেখা যায়নি কখনও। বাংলাদেশ প্রতিবাদ করেছে দায়সাড়া গোছের, যা তামাশার নামান্তর।
মূর্তিটি সুপ্রিম কোর্টের মূল প্রবেশ পথ থেকে সরানোর দাবি সাম্প্রদায়িক কোন চিন্তা চেতনা থেকে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যকে রক্ষার প্রয়োজনেই করা হচ্ছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, যে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৯২% নাগরিক মুসলমান সে দেশের উচ্চতর বিচার বিভাগের প্রতিচ্ছবি হিসেবে একটি মূর্তিকে প্রধান্য দিয়ে হতে পারে না, বরং শুধুমাত্র দাঁড়িপাল্লা ও তলোয়ারের মাধ্যমে যা হতে পারে।
বিচার বিভাগের সকল স্থাপনা ও চাহিদাপূরণ সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে করা হয়। মাননীয় বিচারপতিদের বেতন-ভাতা আনুসাঙ্গিক ব্যয়ও সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। বিচার বিভাগের প্রতিটি ভবনের নকশা, ডিজাইন, টেন্ডার, নির্মাণকার্য ও ব্যয় সব কিছুই সরকার বহন করে থাকে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজার এলাকাটি জাতীয় সংসদের অন্তর্ভুক্ত কিনা তা নিয়ে দেশবাসীর কোন কৌতূহল না থাকলেও সেটা খতিয়ে দেখার জন্য সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ও মন্ত্রীরা লুই কানের নকশা খতিয়ে দেখার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অথচ, যে নারী মূর্তিটি নিয়ে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে সেটা সুপ্রিম কোর্ট ভবনের মূল ডিজাইন বা নকশাভুক্ত ছিলো কি না তাও জনসম্মুখে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। নতুবা সন্দেহ থেকেই যায় যে, কার মনোবাঞ্চনা পূরণের জন্য মূল ভবন নির্মিত হওয়ার ৬০ বছর পর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান প্রবেশস্থলে এই মূর্তি স্থাপন করা হলো?
জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে দুইটি ঈদের জামাত ছাড়াও জাতীয় নেতাদের জানাযা হয়ে থাকে। সুপ্রিম কোর্ট নিয়ন্ত্রণাধীন সমজিদ ও মাজার (হাই কোর্ট মসজিদ ও মাজার নামে দেশব্যাপী পরিচিত) ছাড়াও জাতীয় ঈদগাহ ময়দান সংলগ্ন স্থানটি মূর্তি স্থাপনের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। যারা মূর্তি পূজক নয় তাদের মনে যদি এতে পীড়া দেয় তবে বিষয়টি কি অমূলক হবে? স্থাপনের পূর্বে কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন? পুলিশ র‌্যাব এবং বন্ধুকের গুলি দিয়ে সব করা যায় কিন্তু মানুষের মন বাঁধা যায় না। মনের বিস্ফোরণ যে কোন বিস্ফোরণের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, একথাও কর্তৃপক্ষের মনে রাখা দরকার।
তাছাড়া, স্ফুলিঙ্গ থেকেই দাবানলের সৃষ্টি। প্রতিবাদের ঝড় যেভাবে বইতে শুরু করছে তা যদি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় তবে এর দায়-দায়িত্ব কে বহন করবে? সরকার না বিচার বিভাগ?
জনগণকে দিয়েই রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য অর্থাৎ জনগণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের মূল তিন বিভাগের উপরই বর্তায়। রাষ্ট্রের এমন কোন কাজ করা উচিৎ নয় যাতে জনগণ ব্যথিত হয়। যে কাজ করলে জনমনে ভারসাম্য বিশেষ করে বিশ্বাসগত ভারসাম্য নষ্ট হয় বা চ্যালেঞ্জের মুড়ে পরে তা থেকে দূরত্ব রক্ষা করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অনেক রথী-মহারথীরা তাদের নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু করেছেন যা পরবর্তীতে হিতে বিপরীত হওয়ায় জনমনে দাবানল সৃষ্টি হওয়াতে কোথাও অনুশোচনা, কোথাও ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হয়েছেন।
আমাদের গ্রামাঞ্চলে একটি প্রবাদ চালু রয়েছে- ‘নেই কাজ তো খৈ ভাজ’। রাষ্ট্রের দায়িত্ব খৈ ভাজা নয়, প্রয়োজনীয় ও অতিপ্রয়োজনীয় এবং সরাসরি জনকল্যাণে কাজ করাই রাষ্ট্রীয় একমাত্র দায়িত্ব। ফ্যাশন্যাবল যে কাজ রাষ্ট্রের মালিক জনগণের (সংবিধানের ৭নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী) মধ্যে বির্তক সৃষ্টি করে তা পরিহার করাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। রাষ্ট্র কারো মনোরঞ্জনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে না, রাষ্ট্র কোন ব্যক্তি বা কর্ণধারের সম্পদ নয়, রাষ্ট্র গোটা জনসমষ্টির। তাছাড়া বাংলাদেশ কোন রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, এটা স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
 লেখক : কলামিস্ট ও বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন