ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২১, ০৭ মাঘ ১৪২৭, ০৭ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বেপরোয়া ফুটপাতের চাঁদাবাজরা

| প্রকাশের সময় : ১৮ জুলাই, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মতিঝিল থানার মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামী ১৫ : বাকীদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে : অধিকাংশ জামিনে আছে
নূরুল ইসলাম : চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিটও দাখিল করেছে। তবু বেপরোয়া রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান ও পল্টন এলাকার ফুটপাতের লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজরা। তাদের কাছে অর্ধলক্ষাধিক হকার জিম্মি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও ডিএমপি কমিশনারের কঠোর নির্দেশনা সত্তে¡ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে জোর করে চাঁদা আদায় করে চলেছে চিহ্নিত চাঁদাবাজরা। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনের ফুটপাতের চাঁদাবাজ সাইফুল মোল্লা বাছের মোল্লা নামে এক হকারকে বেধড়ক মারধর করেছে। এ ব্যাপারে বাছের মোল্লা বাদী হয়ে মামলাও করেছেন। অথচ সাইফুল মোল্লা মতিঝিল থানায় দায়েরকৃত চাঁদাবাজি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামী। হকারদের অভিযোগ, আগাম জামিন নিয়ে সাইফুল মোল্লা আগের মতোই হকারদের কাছে থেকে জোর করে টাকা আদায় করে চলেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অধীনে গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিলসহ আশপাশের এলাকার ফুটপাত রমজানের আগে কিছুটা হকারমুক্ত ছিল। বিকাল ৫টার আগে হকারদের ফুটপাত দখল করে বসতে দেয়া হতো না। কিন্তু রমজান আসার সাথে সাথে হকাররা সব বাধা উপেক্ষা করে ফুটপাত দখল করে বসতে থাকে। সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে হকারদের প্রতি একটু সহানুভূতি প্রকাশ করে বলা হয়, সামনে ঈদ তাই ওদেরকে একটু সুযোগ দেয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগিদের মতে, পুরো রমজান মাস গুলিস্তান, মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় সৃষ্ট যানজটে মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অন্যদিকে, হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রমজানে ফুটপাতের চাঁদা দ্বিগুণ করেছিল চাঁদাবাজরা। দ্বিগুণ চাঁদা দিয়েই হকারদের ফুটপাতে ব্যবসা করতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকার রাস্তা ও ফুটপাত দখলের নেপথ্যে রয়েছে সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় মাস্তান বাহিনী। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই দিনের পর দিন প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে চিহ্নিত চাঁদাবাজরা। লাইনম্যান নামধারী এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলাও হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি মাসে রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও শাহবাগ থানায় ৭২ চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা করেন ডিএসসিসির সহকারী সম্পত্তি কর্মকর্তা সামছুল আলম। মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলায় ১৬, শাহবাগ থানার মামলায় ৭ এবং পল্টন থানায় ৪৯ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলায় (নং-১৬/ তাং ০৯/০২/ ২০১৭ ইং) পুলিশ আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার এসআই মো. সফিকুল ইসলাম আকন্দ গত ১০ জুলাই আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। চার্জশিটে মামলার এজাহারভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে ১৫জনকে আসামী করা হয়েছে। এরা হলেন, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনের ফুটপাতের চাঁদাবাজ সাইফুল ইসলাম মোল্লা, তার ছেলে শিবলু, শাজাহান মৃধা, মকবুল, মতিঝিল রুপালী ব্যাংকের সামনের রাস্তার নুরুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম ও তার ছেলে বাবলু, সাদেক, পবণ, সাইজুদ্দিন, আবুল কালাম জুয়েল, আজাদ, কালা কাসেম, শহীদ রেজা বাচ্চু ও ফারুক। পুলিশ সূত্র জানায়, এজাহারভুক্ত একজন স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়েছে। হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদাবাজি মামলার চার্জশিটভুক্ত এসব আসামী আগের মতোই হকারদের কাছে থেকে জোর করে চাঁদা আদায় করে চলেছে। এর সাথে যাদের বিরুদ্ধে পল্টন ও শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত মামলার চার্জশিট প্রক্রিয়াধীন আছে তারাও সক্রিয় রয়েছে। হকাররা জানায়, মামলা হওয়ার পর হাতেগোনা ৪/৫জন মাত্র গ্রেফতার হয়েছিল। বাকীরা সে সময় ফেরারী থাকা অবস্থায় চাঁদাবাজি করেছে। এখন অধিকাংশই উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিনে আছে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনের হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মামলা হওয়ার আগে ও পরে সাইফুল মোল্লা ও তার তিন ছেলে বেপরোয়া ছিল। এখনও তারা বেপরোয়া। থানা পুলিশের কতিপয় সদস্যকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে সাইফুল মোল্লা আগের মতোই হকারদের মারধর করে, মালামাল নষ্ট করে, হুমকী দিয়ে চাঁদা আদায় করে থাকে। এজন্য তার পৃথক মাস্তান বাহিনী আছে। সেই মাস্তান বাহিনীর কাছে হকাররা অসহায়। বাছের মোল্লা নামে এক হকার চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় সাইফুল মোল্লা ও তার মাস্তান বাহিনী বাছেরকে বেধড়ক মারপিট করে আহত করে। এ ঘটনায় বাছের মোল্লা বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের (নং ৪০৪, তাং ০৭-০৩-১৭ ইং) করেন। ওই মামলায় সাইফুল মোল্লা ছাড়াও তার তিন ছেলে হোসাইন, জাফর, শিবলী আসামী। আরও আছেন, শামীম, মোহর আলী, শাজাহন মৃধা, নাছির উদ্দিন, আব্দুর রশিদ, আব্দুল গফুর ও আব্দুল ওয়াদুদ। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বাছের মোল্লা মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। ওই মামলায়ও চার্জশিট দাখিল করা হতে পারে।
জানা গেছে, শুধুমাত্র ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ফুটপাতের চিহ্নিত চাঁদাবাজ আছে শতাধিক। এর মধ্যে গুলিস্তান, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার মাত্র ৭২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে আরও কমপক্ষে ৫০ জন। এর মধ্যে ফুলবাড়িয়া, জুরাইন, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের চাঁদাবাজরাও আছে। অভিযোগ রয়েছে, জুরাইন এলাকায় সড়ক ও জনপথের জায়গা দখল করে বসানো দোকান তুলে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অথছ জুরাইনের চিহ্নিত চাঁদাবাজচক্র দোকান অপসারণ না করে উল্টো তদবির করে চলেছে। খায়রুল নামে এক চাঁদাবাজ হাবিবউল্যাহ ও সেতু মার্কেটের সামনে ফুটপাত টিকিয়ে রাখার জন্যতদবির করে চলেছে। তবে সড়ক ও জনপথের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তদবির করে কোনো লাভ হবে না। পদ্মা সেতু থেকে চাল লেনের মহাসড়ক সোজা যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত আসবে। শিগগিরি ফুটপাত থেকে সব ধরণের দোকানপাট উচ্ছেদ করা হবে।
হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগের মতোই রাজধানীর সব এলাকার ফুটপাত থেকে দোকান ভেদে মাথাপিছু দৈনিক ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। অগ্রিম বাবদ নেওয়া হচ্ছে এক থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। মামলা হওয়ার পরেও চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়ায় এবং চিহ্নিত চাঁদাবাজরা বেপরোয়া হয়ে ওঠায় সাধারণ হকাররা শঙ্কিত। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, আমরা বরাবরই চিহ্নিত চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছি। এখন তো তারা মামলার আসামী। আসামী হয়েও তারা কিভাবে চাঁদাবাজি করে?

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন