ঢাকা, বুধবার ২৪ জুলাই ২০১৯, ০৯ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

ডিআইজি মিজান কারাগারে

আদালতে হাস্যোজ্জ্বল, কথা বললেন মোবাইলে ষ থানাহাজতে নয়, ওসির এসি কক্ষেই কেটেছে ১৫ ঘণ্টা

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ৩ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় সাময়িক বরখাস্ত ডিআইজি মিজানুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ কেএম ইমরুল কায়েস শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৪ জুলাই দিন নির্ধারণ করেন আদালত। গতকাল দুপুরে আদালতের নির্দেশের পর মিজানকে পুলিশের জিপে করে কেরানীগঞ্জ কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে ওই কারাগারে রাখা হয়েছে।

আদালতে হাসোজ্জল মিজান মোবাইল ফোনের কথা বলেন। সোমবার বিকালে হাইকোর্ট থেকে গ্রেফতারের পর সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর মঙ্গলবার সকাল ১০টায় আদালতে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ১৫ ঘণ্টা ওসির এসি কক্ষেই ছিলেন পুলিশের সদ্য সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই ডিআইজি। গতকাল আদালতে ঢোকার পর স্বাভাবিকই ছিলেন তিনি। কনস্টেবল, এসআই ও ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছিলেন। এর পরপরই নিজের পকেট থেকে মোবাইল বের করলেন। সামনে থাকা আইনজীবীকে ফোন দেন। চারপাশ থেকে গুঞ্জন মুরু হলে ফোন পকেটে রেখে দেন। কিছুক্ষণ পর আবার বের করে কথা বলছেন।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় ডিআইজি মিজানুর রহমানকে ব্যাপক পুলিশ প্রহরায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। এজলাসের পেছনের একটি কক্ষে তাকে বসতে দেওয়া হয়। আসামিপক্ষে আইনজীবী এহসানুল হকসহ আরও অনেকে জামিনের শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল ও জাহাঙ্গীর আলম জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালতে শুনানি শুরু হয় বেলা ১১টা ৩১ মিনিট, আর শেষ হয় ১২টা ৩৪ মিনিটে। শুনানির এই একঘণ্টা আদালতের ডকে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিজান। শুনানি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

শুনানির শুরুতে আসামিপক্ষের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী আদালতকে বলেন, ওকালতনামায় (আইনজীবী নিয়োগের ফরম) আসামির স্বাক্ষর করানোর জন্য আদালতের অনুমতি চাচ্ছি।

তখন বিচারক বলেন, এখানে স্বাক্ষর করার সুযোগ নাই। আপনারা কারাগার থেকে আসামির ওকালতনামায় (আইনজীবী নিয়োগের ফরম) স্বাক্ষর করে নিয়ে আসালে জামিন শুনানি করতে পারবেন।
আসামির আইনজীবী সমাজী বলেন, সোমবার আসামিকে হাইকোর্টের নির্দেশে গ্রেফতার করে শাহবাগ থানায় রাখা হয়েছিল। ওখানে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করানোর সুযোগ ছিল না। দয়া করে আপনি অনুমতি দিলে এবং আসামি স্বাক্ষর করলে আমরা জামিন শুনানি করবো।

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের আইনজীবী মোশারফ কাজলও ‘অনুমতি দেওয়া যেতে পারে’ বলে আদালতকে জানান। তখন বিচারক অনুমতি দিলে আসামি ডিআইজি মিজান আদালতের ডকে দাঁড়িয়ে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন। এরপরই জামিনের জন্য শুনানি শুরু করেন ডিআইজির নিয়োজিত আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী। শুনানিতে তিনি বলেন, দুদকের দায়ের করা এই মামলাটি স্পেশাল একটি মামলা। এই আইনে আসামি জামিন পাওয়ার হকদার। তার বিরুদ্ধে এজাহারে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনও ডকুমেন্টস আপনার (বিচারক) কাছে নেই। দুদকও এরকম কোনও কিছু আদালতে দাখিল করেনি। ডকুমেন্ট ছাড়া আপনি কীভাবে বুঝবেন আসামির এ সম্পদ অবৈধ? কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন?

তিনি আরও বলেন, আসামি বয়স্ক ও অসুস্থ। যদিও আমাদের কাছে এখন কোনও অসুস্থতার সার্টিফিকেট নেই। এ বয়সে মানুষ তো অসুস্থ থাকে। আসামি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের উচ্চপদে কর্মরত থেকে অনেক কাজ করেছেন। দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিদের নির্মূলে তার অনেক অবদান রয়েছে। আসামি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন। সার্বিক দিক বিবেচনা করে যেকোনও শর্তে তার জামিন চাচ্ছি।

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, এজাহারে আসামির বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির যে অভিযোগ আছে, দুদকের আইনে ও মানি লন্ডারিংয়ের আইনে তিনি জামিন পান না। যদিও এটি স্পেশাল মামলা, তারপরও আইনের বিধান অনুযায়ী এই আসামি জামিন পান না। এরপর বিচারক আসামির আইনজীবীকে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজলের শুনানির ওপর কাউন্টার শুনানি করতে বলেন।

তখন আসামির আইনজীবী এহসানুল সমাজী বলেন, স্যার, এখন এ মামলার জন্য আপনি স্পেশাল কোর্ট। সেহেতু আমার এই মামলাটি স্পেশাল আইনের মামলা। তাই স্পেশাল আইন অনুযায়ী, আমার আসামি জামিন পাওয়ার হকদার। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে ডিআইজি মিজানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ওসির এসি কক্ষে ১৫ ঘণ্টা
সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করে শাহবাগ থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। ডিএমপি রমনা জোনের এডিসি আজিমুল হকের গাড়িতে করে তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে আসা হয়। পুলিশি পাহারায় গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় থানার ওসি আবুল হাসানের কক্ষে। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। ডিআইজি মিজান ওসির কক্ষে প্রবেশের পর থেকে কক্ষটি ভেতর থেকে লক করে দেয়া হয়। ভেতর থেকে অনুমতি সাপেক্ষে পুলিশ সদস্যরা প্রবেশ করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, ওসির কক্ষে মিজানুর রহমান ছাড়াও আরও দুজন কর্মকর্তা ছিলেন। দুজনই এসআই পদমর্যাদার। তাদের একজন পোশাকে ও অন্যজন সাদা পোশাকে ছিলেন। এই দুজনের বাইরে ওসির কক্ষে নিয়মিত আনাগোনা করছেন আরও দুজন এসআই।
ডিআইজি মিজান আসার পর নিজ কক্ষ ছেড়ে পাশের পরিদর্শকের (তদন্ত) কক্ষে বসে দাফতরিক কাজ সারছেন ওসি আবুল হাসান। থানায় ওসির কাছে আসা সাহায্যপ্রার্থীরাও তার সঙ্গে দেখা করছেন ওই কক্ষে।

রাত ৮টার দিকে ডিআইজি মিজানের জন্য খাবার নিয়ে আসেন ওসির বডি গার্ড কামরুল। একই ব্যক্তি রাত সাড়ে আটটার দিকে বাইরে থেকে পুলিশের এই কর্মকর্তার জন্য ওষুধ নিয়ে আসেন। অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে আসা হয় রাত ৯টা ১৫ মিনিটে। রাত ১১টায় তার খোঁজখবর নিতে থানায় আসেন ডিএমপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। শাহবাগ থানায় ওসির কক্ষে ২০ মিনিট সময় কাটান তিনি।

ওই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, সৌজন্যতার খাতিরে এসেছি। এর বেশি কিছু নয়। রাতের খাবারে মিজানকে কী দেওয়া হয়েছে তা সরাসরি বলতে রাজি হননি থানার কোনও কর্মকর্তা। তবে, ওসি আবুল হাসান বলেন, রাতের খাবার বাইরে থেকে আনা হয়েছে। অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে আসার পর তিনি ড্রেস পাল্টান। এরপর রাতে ওসির কক্ষের ভেতরে থাকা বিশ্রাম কক্ষে ঘুমান ডিআইজি মিজান।

সূত্র জানায়, মিজানুর রহমান খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছেন। সকাল ৮টার দিকে নাস্তা খান তিনি, যা বাইরে থেকে আলাদাভাবে আনা হয়। নাস্তা শেষে আদালতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন মিজানুর রহমান। এরপর বেলা ১০টার দিকে শাহবাগ থানার গাড়িতে করে তাকে আদালতে নেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে তার সঙ্গে বাইরে থেকে কেউ দেখা করতে আসেননি।

আদালতে হাস্যোজ্জ্বল মিজান, কথা বলেন মোবাইলে
প্রত্যক্ষদর্শী ও আইনজীবীরা বললেন, একজন আসামি কোনোভাবেই পুলিশের হেফাজতে থেকে কথা বলতে পারেন না। অথচ ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা আদালতে বসে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। আদালতে তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ডিআইজি মিজানের পকেটে থাকা ফোনটি তার বাড়িতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কনস্টেবলের। গতকাল রাত থেকেই তাকে দেয়া হয়েছে ফোনটি। এতেই যোগাযোগ করছেন তিনি।

এদিকে আদালতের ভেতর স্বাভাবিক ছিলেন ডিআইজি মিজান। অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার আদালতে ঢুকেই দেখা করেন তার সঙ্গে। জিজ্ঞেস করেন, কী মিজান সাহেব, খবর কী? কেমন চলছে সব। মিজান উত্তর দিলেন, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট ওকে (ঠিক) আছি। এরপর শুরু হয় জামিন শুনানি। কাঠগড়ায় ওঠেন ডিআইজি মিজান। সেখানেও হাসিমুখ ছিল তার, ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। ঘণ্টাব্যাপী শুনানি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন তিনি। একসময় বাম দিকে কাঠের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন।

উল্লেখ্য, মিজানুর রহমান ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্ত্রীকে গ্রেফতার করানোর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। এছাড়া এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে মিজানুরের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) হয়। নারী নির্যাতনের অভিযোগে গত বছরের জানুয়ারির শুরুর দিকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়।

দুদক কর্মকর্তার সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিজানকে সাময়িক বরখাস্তের একটি প্রস্তাব প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। পরে ২৫ জুন মিজানুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করার প্রস্তাবে অনুমোদন দেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ।

অন্যদিকে মিজানের ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে পুলিশ প্রশাসন। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। যদিও নারী নির্যাতন, ঘুষ প্রদান, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অপকর্মের অভিযোগে দুই বছর ধরে মিজানুরের নাম আলোচনায় এলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

গত ২৪ জুন ডিআইজি মিজান, তার স্ত্রী রত্মা রহমান, ভাই মাহবুবুর রহমান ও ভাগ্নে মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা অবৈধ সম্পদের মামলার তদন্ত শুরু হলে ডিআইজি মিজান গত সোমবার হাইকোর্টে আগাম জামিনের জন্য চেষ্টা চালান। হাইকোর্টে আগাম জামিনের জন্য গেলে ডিআইজি মিজানকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন হাইকোর্টের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। এ সময় মিজানকে তাৎক্ষণিক হাইকোর্ট পুলিশের হাতে তুলে দেন আদালত। গ্রেফতারের পর তাকে শাহবাগ থানায় নেয়া হয়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
Amir ৩ জুলাই, ২০১৯, ১০:১৯ এএম says : 0
"আসামি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন।" অপরাধ করে ঢা,বি, তে মাস্টার্স করার সুবাদে মামলায় জামিন পেতে পারে বলে আইন জীবি যুক্তি দিলেন- কি হাস্যকর!
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন