ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

নাগরিক পঞ্জি বুমেরাং হয়ে বিজেপির দিকেই ফিরে যাচ্ছে

মোবায়েদুর রহমান | প্রকাশের সময় : ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

আসামের চূড়ান্ত নাগরিক পঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে। এ পঞ্জিতে ৩ কোটি ১১ লক্ষ মানুষকে আসাম তথা ভারতের বৈধ নাগরিক এবং ১৯ লক্ষ মানুষকে অবৈধ নাগরিক হিসাবে দেখানো হয়েছে। গত জুলাই মাসে যে খসড়া পঞ্জি প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা দেখানো হয়েছিল ৪১ লাখ। সেই সময় এ বিশাল অংকের অবৈধ তালিকা দেখে আসামে এবং পশ্চিমবাংলায় হৈ চৈ শুরু হয়েছিল এবং বালাদেশে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ এব্যাপারে বাংলাদেশ এবং ভারতের নির্বাচনের আগেই ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি অমিত শাহকে খুব অ্যাগ্রেসিভ মনে হচ্ছিলো। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে এরা সব বাংলাদেশি মুসলমান। চাকরি-বাকরি এবং উন্নত জীবন যাপনের আশায় এসব বাংলাদেশি আসামে প্রবেশ করেছে। এখন এদেরকে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। জুলাই মাসে ঐ খসড়ার বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপিল করলে সুপ্রীম কোর্ট পুনরায় ঐ খসড়া স্ক্রুটিনি করার নির্দেশ দেয় এবং চূড়ান্ত রিপোর্ট ৩১ অগাস্টের মধ্যে প্রকাশ করার নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী ৩১ অগাস্ট চূড়ান্ত নাগরিক পঞ্জি প্রকাশিত হলো। এখন সেই পঞ্জিতে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা ৪১ লাখ থেকে নেমে ১৯ লাখে দাঁড়ালো।

যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকার এবং আসাম সরকার ঘোষণা করেছে যে, যারা অবৈধ হবে তাদেরকে বিদেশি হিসাবে বিবেচনা করা হবে। এখন ১৯ লক্ষ মানুষকে অবৈধ বা ফরেনার হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। এই ১৯ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে কি অ্যাকশন নেওয়া হবে। অ্যাকশন নেওয়ার ব্যাপারে এই বার বিজেপির সুর কিছুটা নরম হয়েছে। তারা বলছে যে, এই মুহূর্তেই তারা ঐ সব অবৈধ ১৯ লক্ষকে ডিটেনশনে পাঠাবে না বা বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না। তারা অবৈধ অভিবাসীদেরকে আর একটি সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগ মোতাবেক অবৈধরা তাদের নাগরিকত্বের দাবিতে প্রথমে ট্রাইব্যুনালে যাবেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই ১৯ লক্ষের আপিল পুনর্বিবেচনা করার জন্য প্রায় ১ হাজার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হচ্ছে।

ট্রাইব্যুনালের বিচারে সন্তুষ্ট না হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা হাইকোর্টে যেতে পারেন। হাইকোর্টের বিচারে সন্তুষ্ট না হলে তারা সুপ্রীম কোর্টে যাবে। সুপ্রীম কোর্টের বিচারে যদি তারা সন্তুষ্ট না হয় তাহলে তারা কোথায় যাবেন? সেই বিষয়টি নাগরিক পঞ্জিতে পরিষ্কার করে বলা হয়নি। তবে ধারণা করা যেতে পারে যে সুপ্রীম কোর্টের রায়ের পরে যারা অবৈধ থেকে যাবেন তাদেরকে হয়তো ডিটেনশন ক্যাম্পে তথা জেলে যেতে হবে। তবে জেলে এত লক্ষ লক্ষ লোক ধরবে কিনা সেটি একটি প্রশ্ন। সেক্ষেত্রে তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

তবে এক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বেশ কিছুটা বিপাকে পড়বেন। তাদের তো টার্গেট ছিল বাঙ্গালী মুসলিম খেদাও। কিন্তু এখন যে ফাইনাল রিপোর্ট বেরিয়েছে সেখানে কারো কারো মতে অবৈধ হিন্দুদের সংখ্যা হলো ১১ লাখ। আবার অন্যদের মতে অবৈধ হিন্দুদের সংখ্যা ৬ লাখ। আর অবৈধ মুসলমানদের সংখ্যা হলো ৪ লাখ। যদি ৬ লাখ এবং ৪ লাখের পরিসংখ্যান সঠিক হয় তাহলে বাকি ৯ লাখ গেলো কোথায়?

এই জন্য এই সর্বশেষ নাগরিক পঞ্জির তথ্য ও পরিসংখ্যানের ওপর কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বাংলাদেশের জনগণের একটি অংশ কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না। বিজেপি তাই আবার রি ভেরিফিকেশনের জন্য সুপ্রীম কোর্টে নাকি আপিল করবে। এখন স্বয়ং বিজেপিসহ ভারতের প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল ও মহল বলছেন যে এনআরসির ফাইনাল রিপোর্ট নির্ভরযোগ্য নয়। তারা বলছেন সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে বসবাসরত মানুষের গণনা সঠিক হয়নি। তাই তারা রি ভেরিফিকেশন চায়। কিন্তু সুপ্রীম কোর্ট ফাইনাল রিপোর্টের পর আর রি ভেরিফিকেশন দিতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলেছেন, যে নাগরিক পঞ্জির পুরো ঘটনাটাই বিজেপির উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এনআরসিকে কার্যত সমর্থন দিয়ে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাবেন। আর নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেবেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশি হিন্দুরা স্বাগত, অনুপ্রবেশকারী মুসলমানদের ঠাঁই নেই। এক্ষেত্রে কোনো রেয়াত করা হবে না।

ভারতের আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে যখন সব মহল থেকে সমালোচনার ঝড় উঠতে শুরু করেছে সেই ধারাবাহিকতায় এবার এনআরসি নিয়ে বিজেপির কড়া সমালোচনা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, এনআরসি বিভ্রাট ওদের মুখোশ খুলে দিয়েছে। একইসঙ্গে নাম বাদ পড়া আসামের বাংলাভাষী মানুষদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যায় জোড়া টুইট করে এই ইস্যুতে বিজেপিকে আক্রমণ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টুইটে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক লাভ তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছে এনআরসি বিপর্যয়। দেশকে জবাব দিতে হবে তাদের। দেশ ও সমাজের স্বার্থ পরিহার করে অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করলে এমনটাই ঘটে। বাংলাভাষী ভাইবোনদের জন্য খারাপ লাগছে। জাঁতাকলে পড়ে ভুগতে হয়েছে তাদের।’

কংগ্রেস বলছে যে, সম্প্রদায় বিশেষের প্রতি অন্ধ বিদ্দেশে বিদ্দিষ্ট হয়ে বিজেপি এই পঞ্জি বানিয়েছে। আর বিজেপি বলছে যে, যে হাজার হাজার কর্মী নাগরিক পঞ্জি প্রণয়নে নিয়োজিত হয়েছিল তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। তাহলে ব্যাপাটা কী দাঁড়াচ্ছে? নাগরিক পঞ্জি ওয়েস্ট পেপার বাক্সে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতো অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ এর মধ্যে আবার বাংলাদেশ বলেছে যে, বাংলাদেশ সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেছেন যে এই নাগরিক পঞ্জির ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সূত্র ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেছেন যে নাগরিক পঞ্জিতে যত লক্ষ মানুষই অবৈধ হোক না কেন তাদের একজনও বাংলাদোশ নয়। সুতরাং নাগরিক পঞ্জি নিয়ে বাংলাদেশের কোনো মাথা ব্যাথা নাই। এই অবস্থায় নাগরিক পঞ্জি প্রণয়ন বিজেপির জন্য হিতে বিপরীত হতে চলেছে।

দুই

ভারতে বিগত নির্বাচনের আগে বিজেপির সভাপতি এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন যে, ভারতে একজনও বিদেশি অবৈধ ব্যক্তি থাকতে পারবেন না। এই উদ্দেশ্যে ভারতের প্রত্যেকটি প্রদেশে নাগরিক পঞ্জি তৈরি করা হবে এবং সেই পঞ্জি তৈরি করার পর যত সংখ্যক ব্যক্তিই অবৈধ হোক না কেন তাদেরকে ভারত ছাড়তে হবে।

শুধু মাত্র নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহকেই নন্দ ঘোষ ঠাওরাবো কেন? আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল যখন ছাত্র ছিলেন তখন তিনি এবং তার সংগঠন আসাম থেকে বাঙ্গাল খেদাও আন্দোলন শুরু করেছিল। সর্বানন্দ যখন আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন এ আন্দোলনটি অত্যন্ত জোরদার হয়। এর পর তিনি ছাত্রত্ব ছেড়ে রাজনৈতিক দলে যোগ দেন। তখন আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়। এর পর তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৫ সাল পর্যন্ত আসামে ছিল কংগ্রেস মন্ত্রী সভা। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তরুণ গগৈ। ২০১৬ সালে আসাম রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হয় এবং সর্বানন্দ সনোয়াল মুখ্যমন্ত্রী হন। আবার বাঙ্গাল খেদাও আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত হয়। এই সময় তিনি সমর্থন লাভ করেন নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহর মত প্রবল ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এবং সেটিই ছিল নাগরিক পঞ্জি তৈরির উৎস।

তবে ১৯৮৪ সালে রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পিতা এবং সোনিয়া গান্ধীর স্বামী রাজীব গান্ধী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন সেই আন্দোলন জোরদার হয়।

তিন

এখানে আর একটি বিষয় সিরিয়াস বিবেচনার দাবি রাখে। ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক পল্লব ভট্টাচার্য্য একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত খবরে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, জুলাই মাসের নাগরিক পঞ্জিতে যে ৪১ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েন তাদের মধ্যে ৭ থেকে ৮ লক্ষ মানুষ পঞ্জিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কোনো আবেদনই করেননি। এবার ঐ ১৯ লক্ষ লোকের বিষয়টি যখন ট্রাইব্যুনাল বা উচ্চ আদালতে পুনর্বিবেচনা করা হবে তখন ঐ ৭/৮ লাখ লোক তাদের দলিল পত্র নিয়ে আবেদন করবেন কিনা, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। পুনর্বিবেচনার পর্ব শেষ হওয়ার পর যারা তালিকার বাইরে থাকবেন তারা কি ভারতে জমি জমা বাড়ি ঘর কিনতে পারবেন? তারা কি সরকারি চাকরি পাবেন? নাকি তাদেরকে ওয়ার্ক পার্মিটের ওপর বেঁচে থাকতে হবে? কারণ সোজা পথ হলো তারা বাংলাদেশি বলে তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ সাফ জানিয়ে দিচ্ছে যে ওরা বাংলাদেশি নয়। তাহলে ওদেরকে নিয়ে বিজেপি সরকার কী করবে? মমতাও তো বলেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেউ আসামে যায়নি। আরও বড় কথা হলো, গত নির্বাচনেও তারা ভোট দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে তারা কি ভোট দিতে পারবেন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যদি একটু দূরদর্শী হন তাহলে তারা দেখবেন যে, বিজেপি সরকার এই নাগরিক পঞ্জি নিয়ে নিজেরাই নিজেদের জন্য গর্ত খুঁড়ে রেখেছে। যেটি করা হয়েছিল সেটি সম্পূর্ণ ধারণার ওপর। তাদের ধারণা ছিল যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ৪০ লাখ বাঙালি মুসলমান আসামে ঢুকে পড়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তারা আর ফিরে যাননি। তারা ভেবেছিলেন, এদের প্রায় সকলেই মুসলমান। তাই তাদেরকে তাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু তারা জানতেন না যে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা আসামে বা ভারতের অন্য কোথাও ঢুকেছিলেন তাদের অধিকাংশ মুসলমান ছিলেন না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা ভারতেই থেকে গেছেন? নাকি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন? সে সম্পর্কে সঠিকভাবে কেউ কিছু জানেন না। এখন বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার দেখছেন যে যাদেরকে তারা অবৈধ বলছেন তাদের অধিকাংশই হিন্দু। এখন তারা কোন দিকে যাবেন? পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সভাপতি তো বলেই ফেলেছেন যে, মুসলমানের সংখ্যা বেশি হলে তাদেরকে তাড়িয়ে দেবেন। আর হিন্দুর সংখ্যা বেশি হলে আইন সংশোধন করে তাদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দিবেন।

সাম্প্রদায়িকতা আর কাকে বলে? নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতার নজির যদি দেখতে হয় তাহলে বিজেপির দিকে তাকান। দেখুন নাগরিক পঞ্জি নিয়ে তাদের ডিগবাজি। দেখুন গেরুয়া রাজনীতির কি নগ্ন আস্ফালন।
journalist15@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন