ঢাকা, সোমবার , ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম

আমানতের যেন খেয়ানত না হয়

মুনশী আবদুল মাননান | প্রকাশের সময় : ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

গচ্ছিত অর্থ বা বস্তুকে আমানত বলা হয়। যার কাছে অর্থ বা বস্তু গচ্ছিত রাখা হয় তাকে বলা হয় আমানতদার। যে রাখে, সে আমানতকারী। আমানত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা আমানতদারের অপরিহার্য কর্তব্য, এটাও ওয়াজিব। আমানত অবশ্যই ফেরতযোগ্য। মালিক যখনই চাইবেন, ফেরৎ দিতে হবে, এটাও ওয়াজিব। আমানতকৃত অর্থ বা বস্তু সুরক্ষা এবং চাইবামাত্র ফেরৎ দেয়া আমানতদারির পরিচয় বহন করে।

আমাদের সমাজে সুপ্রাচীনকাল থেকে একের অর্থ বা বস্তু অন্যের কাছে গচ্ছিত রাখার প্রথা প্রচলিত আছে। অন্যান্য সমাজেও ছিল; এখনো আছে। আমরা জানি, আমানতদার হিসাবে রাসূলুল্লাহ সা.-এর বিপুল খ্যাতি ছিল। মুসলমানরাই নয়, অমুসলিমরাও তার কাছে অর্থ বা সম্পদ গচ্ছিত রাখতেন। তিনি যখন রাতে সংগোপনে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন, তখন গচ্ছিত অর্থ-সম্পদের মালিকদের কাছে তা ফেরৎ দেয়ার জন্য আলী রা. কে রেখে যান। তিনি যথারীতি আমানত ফেরৎ দেন।

সব সমাজে সব মানুষ একই রকম নয়। প্রকৃত আমানতদার যেমন সব সমাজেই আছে, তেমনি আমানতের খেয়ানতকারীও আছে। অনেক সময় অনেকে লোক না চিনে কারো কারো কাছে আমানত রাখে। ওই অবিশ্বস্ত আমানতদার আমানতদারির পরিচয় না দিয়ে আমানতের অর্থ বা সম্পদ মেরে দেয় বা ফেরৎ দিতে গড়িমসি করে। আল্লাহপাক এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছেন: তোমরা আমানত তার মালিককে ফেরৎ দেবে। (সূরা নিসা : ৫৮)। কিছু মানুষের সৎ ও কিছু মানুষের অসৎ স্বভাবের কথা উল্লেখ করে আল্লাহপাক অন্য এক আয়াতে বলেছেন: কিতাবীদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে, যে বিপুল আমানত রাখলেও ফেরৎ দেবে। আর এমন লোকও আছে, যার কাছে একটি দিনারও আমানত রাখলে তার পেছনে লেগে না থাকলে সে ফেরৎ দেবে না। এ জন্য যে, তারা বলে ‘এই অশিক্ষিতদের প্রতি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই। আর তারা জেনে-শুনে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে।’ (সূরা আল ইমরান : ৭৫)।

প্রকৃত আমানতদারদের আল্লাহপাক সুসংবাদ দিয়েছেন। বলেছেন: আর যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, যারা সাক্ষ্য দানে অটল এবং নিজেদের নামাজে যত্মবান, তারাই সম্মানিত হবে জান্নাতে। (সূরা মা’আরিজ : ৩২-৩৫)। আল্লাহপাক আল্লাহ ও রাসূলের সা. সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করতে যেমন বারণ করেছেন আমানতের খেয়ানত করতেও না করেছেন। বলেছেন : হে বিশ্বাসীগণ, জেনে-শুনে আল্লাহ ও তার রাসূলের সা. সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না। আর তোমাদের পরস্পরের গচ্ছিত দ্রব্য সম্পর্কেও নয়। (সূরা আনফাল : ২৭)।

আমানত আত্মসাৎ করাকে রাসূল সা. মুনাফিকের অন্যতম চিহ্ন হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত এই হাদীসে তিনি বলেছেন : মুনাফিকের চিহ্ন হলো তিনটি- সে যখন কথা বলে, তখন মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা-চুক্তি করে, তখন ভঙ্গ করে তার বিপরীত কাজ করে এবং কোনো কিছু আমানত রাখা হলে আত্মসাৎ করে। বলা বাহুল্য, মুনাফিকের শেষ পরিণতি ও অবস্থান কোথায় হবে, কারো অজানা নেই।

নিজের গোপনীয় কথা নিজের কাছে আমানতস্বরূপ। তা অন্যের গোপন কথাও, যা সে বিশ্বাস করে বলেছে এবং কারো কাছে বলতে নিষেধ করেছে, সরকারি পদ-পদবীর দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ইত্যাদিও আমানতের পর্যায়ভুক্ত। এসব ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ভঙ্গ হলে, সরকারি দয়িত্ব পালনে অবহেলা-উপেক্ষা, দুর্নীতি, অপচয়, ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হলে, আমানতের খেয়ানত হিসাবে গণ্য হবে। এর প্রতিফলও সংশ্লিষ্টদের ভোগ করতে হবে। কাজেই, আমাদের সকলের আমানতের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে এবং কোনোভাবেই যেন তার খেয়ানত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমানতদারী ঈমানদারীরই অংশ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (8)
মোহাম্মদ কাজী নুর আলম ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৫ এএম says : 0
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘যার আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই, আর যে ওয়াদা পালন করে না তার মধ্যে দ্বীন নেই।’ (বায়হাকি)
Total Reply(0)
জোহেব শাহরিয়ার ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৫ এএম says : 0
যিনি গচ্ছিত বস্তুকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংরক্ষণ করেন, যথাযথভাবে হেফাজত করেন এবং মালিক চাওয়া মাত্রই কোনো টালবাহানা ছাড়া ফেরত দেন তাকে আল-আমিন তথা বিশ্বস্ত সত্যবাদী আমানতদার বলা হয়।
Total Reply(0)
মিনহাজ উদ্দিন রিমন ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৬ এএম says : 0
কারও কাছে কিছু জমা রাখা হলো। কিছুদিন পর জমা জিনিস চাইলে সে দিতে অস্বীকার করল। বলেই বসল, এমন কিছু রাখেননি। সরল বিশ্বাসে যিনি জমা রেখেছিলেন, তিনি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আবার জমা রাখা হলো দশ ভরি স্বর্ণ। জমাকৃত জিনিস আনতে গেলে বলা হলো, ৯ ভরি রেখেছেন। দু'ভাবেই আমানতের খেয়ানত হচ্ছে। দুনিয়ার সামান্য জিনিস। যার স্থায়িত্ব, মালিকানা ক্ষণিকের, তা নিয়েও খেয়ানত করা হচ্ছে। মহামারী আকারে এটা ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
Total Reply(0)
মোহাম্মদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৬ এএম says : 0
আমানতের প্রচলন জীবনের সর্ব ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিটি স্তরে প্রতিটি বিষয়ে আমানত রক্ষা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
Total Reply(0)
সাইফুল ইসলাম চঞ্চল ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৭ এএম says : 0
লেনদেনের আমানত, কথার আমানতÑ যেসব বিষয় প্রকাশিত হলে বা যেসব কথা বললে পারস্পরিক সম্পর্ক অবনতি ঘটবে, মনোমালিন্য ও সংঘাত সৃষ্টি হবে, এমন বিষয় প্রকাশ না করা এবং না বলাও আমানত। সর্বক্ষেত্রে আমানত রক্ষা করা একজন মোমিনের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।
Total Reply(0)
মোঃ তোফায়েল হোসেন ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৭ এএম says : 0
কথা দিয়ে কথা না রাখা। মিথ্যা কথা বলা। সত্য অস্বীকার করা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যাবর্তন করতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদের যে উপদেশ দিচ্ছেন, তা কত উৎকৃষ্ট, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, আল্লাহ সর্বস্রষ্টা (সুরা নিসা, আয়াত ৪৮)। আল্লাহ বলেন, হে ইমানদারগণ, তোমরা জেনে-শুনে আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে এবং নিজেদের পারস্পরিক আমানতের খেয়ানত করো না (আনফাল, আয়াত ২৭)।
Total Reply(0)
সত্য বলবো ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৭ এএম says : 0
আমানতদারিতাকে আলল্গাহতায়ালা মুমিনের অন্যতম গুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন
Total Reply(0)
মশিউর ইসলাম ৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১:১৮ এএম says : 0
হকদারের প্রাপ্য হকও আমানতের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী হকদারের যে কোনো হক আমাদের ওপর রয়েছে, তা আদায় করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। এসব হকের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর হক, বান্দার হক।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন