ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬, ৩০ জামাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম

আচরণে ইসলাম প্রচার

মুফতি আব্দুল্লাহ | প্রকাশের সময় : ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বেড়াতে গেছেন রুমানিয়ান এক দম্পতি। একদিন একটি নির্জন বরফে ঢাকা পাহাড়ি এলাকা ঘুরতে যান তারা। হাঁটতে হাঁটতে একসময় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় পথ হারিয়ে গেলেন ওই দম্পতি। পথ খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা নামলে দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। দ্রুত অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে চারদিক।
কনকনে শীত, সঙ্গে হিমেল হাওয়া আর অদ্ভুত একটা ভয় গ্রাস করে তাদের। চারদিকে পিনপতন নিরবতা। মাঝে মাঝে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকে পরিবেশটাকে আরো ভারি করে তুলছে।

হঠাৎ দেখতে পেলেন দূরে কোথাও হালকা একটা আলো জ্বলছে। মনে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে তারা সেদিকে হাঁটতে লাগলেন। কাছে গিয়ে দেখলেন, একটি কুঁড়েঘর। দরজায় টোকা দিতেই একজন জীর্ণ-শীর্ণ মধ্য বয়স্ক লোক দরজা খুলে দিলেন। অসময়ে অপরিচিত মানুষ দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন গৃহকর্তা। আগন্তুক বিস্তারিত জানিয়ে লোকটির কাছ থেকে সহযোগিতা চাইলেন। অতি বিনয়ের সঙ্গে গৃহকর্তা তাদের ভেতরে এসে বসতে বললেন। কুঁড়েঘরে আরো ছিলেন লোকটির বৃদ্ধা মা, স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়ে।

আগন্তুক গৃহকর্তাকে হোটেলের কার্ড দেখিয়ে যাওয়ার উপায় জানতে চাইলেন। অন্ধকারে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হোটেলে যাওয়া এই মুহূর্তে নিরাপদ নয় বললেন গৃহকর্তা। রুমানিয়ান দম্পতি মহা পেরেশানিতে পড়ে গেলেন। গৃহকর্তা তাদেরকে কুঁড়েঘরে রাত যাপনের জন্য বিনীত অনুরোধ করলেন। গরিব লোকটি আগন্তুকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা এবং ঘুমানোর জন্য সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব ভালো ব্যবস্থা করলেন।

সকালে ঘুম থেকে উঠে রুমানিয়ান দম্পতি দেখেন, কুঁড়েঘরে একটি মাত্র রুম যাতে তারা ছিলেন। ‘তাহলে ৫ সদস্যের পরিবারটি গেলেন কোথায়’? ...আগন্তুকদের মনে প্রশ্ন জাগে। তারা কুঁড়েঘরের আশেপাশে খুঁজতে লাগলেন।
একপর্যায়ে রুমানিয়ান স্বামী-স্ত্রী দেখেন, দূরে একটি গাছের গোড়ায় কারা যেন শুয়ে আছে। কাছে গিয়ে দখেন, গরিব লোকটি বৃদ্ধা মা, স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে জবুথবু হয়ে শুয়ে আছে।

সারা রাত এখানেই ছিলেন? গৃহকর্তার কাছে আগন্তুকের প্রশ্ন। হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন তিনি। আর কোথাও থাকার জায়গা নাই বলে এখানেই ছিলেন, জানালেন লোকটি। খ্রিস্টান দম্পতির চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময়!!!
স্বামী-স্ত্রী কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। রাজ্যের নিরবতা যেন গ্রাস করেছে চারিদিক। কেন আমাদের জন্য সব ছেড়ে দিয়ে কনকনে ঠান্ডায়, বরফে ঢাকা গাছের গোড়ায় আশ্রয় নিলেন? আমরা তো আপনাদের আত্মীয় কিংবা পাড়া-প্রতিবেশী না। এমনকি আপনাদের ইসলাম ধর্মের অনুসারীও না। তাহলে কেন এই অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করলেন?

লোকটির ঝটপট উত্তর, পবিত্র গ্রন্থ কোরআন মাজীদে মহান আল্লাহ বলেছেন মানুষের সেবা করতে এবং কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করার জন্য কোরআনে বার বার বলা হয়েছে। আমরা আল্লাহর আদেশ পালন করেছি মাত্র।
রুমানিয়ান দম্পতির চোখে পানি। কৃতজ্ঞতায় তাদের বুক ভরে গেল। কৌত‚হলী হয়ে তারা জানতে চাইলেন, কোরআন শরীফে আর কী কী আছে?

আমি মুর্খ মানুষ। খুব বেশি জানি না। আপনারা কোরআন কিনে পড়ে জেনে নিতে পারেন। লোকটির সরল স্বীকারোক্তি। রুমানিয়ান দম্পতি তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে যাওয়ার আগেই লাইব্রেরিতে গিয়ে কোরআন সংগ্রহ করলেন। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় অল্প ক’দিনে তারা পবিত্র কোরআন পড়া শেষ করলেন।

সউদী আরবের ‘হুদা’ চ্যানেলে এক সাক্ষাৎকারে রুমানিয়ান দম্পতি বলেন, ‘কোরআনের প্রতিটি পাতা পড়া শেষে মনের মধ্যে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হতো। সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিজের অজান্তে মাথা নুয়ে পড়ত। ভাবতাম, কতই না ভুলের মধ্যে ছিলাম এতদিন! এ এক অনন্য অনুভ‚তি ছিল, যা বলে বোঝানোর ভাষা নাই। প্রতিটি সূরা শেষ করে আকাশের দিকে তাকাতাম আর সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজতাম! কান্নায় বুক ভেসে যেত। তবুও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম আকাশ পানে।’

কোরআন পড়া শেষে কালক্ষেপণ না করে স্বামী-স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা বলেন, কোরআনের মর্মবাণী যারাই উপলব্ধি করবেন, সে যে-ই হোক তার চেতনায় পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। রুমানিয়ায় ফিরে গিয়ে তারা একটি ইসলামিক সেন্টার খোলেন। পরিচিত, অপরিচিতদের মাঝে পবিত্র কোরআনের বাণী পৌঁছে দেবার ব্রতে স্বামী-স্ত্রী মানুষের দোরগোড়ায় গেলেন। ব্যাপক সাড়া পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ইসলামিক সেন্টারের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলেন। তাদের অল্প কয়েকদিনের প্রচারণায় প্রায় চার হাজার রুমানিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন।

একটি দরিদ্র পরিবারের এক রাতের ত্যাগের বিনিময়ে কেবল একটি দম্পতি ইসলাম গ্রহণ করেননি, হাজার হাজার রুমানিয়ান মুসলমান হয়েছেন। এটাই নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা।

আসুন, আমরা কোরআনের মর্মার্থ অনুধাবনের চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ এবং রাসূল (সা.)-এর নির্দেশনা মেনে জীবন পরিচালিত করি এবং মানুষের সেবা করি। সত্যিকারের ঈমানদার হই। তাহলে ওই গরিব লোকটির মতো আমরাও কামিয়াব হব। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।
(সউদী আরবের ‘হুদা’ চ্যানেলে দেয়া ওই রুমানিয়ান দম্পতির সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (7)
Abul Hasan ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১:৩৫ এএম says : 0
আল্লাহ নিজে নম্র। তিনি চান বান্দাও তার স্রষ্টার গুণে গুণান্বিত হোক। নিজেরা একে অন্যের প্রতি বিনম্র আচরণ করুক। তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্যরে পরিবেশ গড়ে উঠুক।
Total Reply(0)
মোহাম্মদ মোশাররফ ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১:৩৫ এএম says : 0
আল কোরআনে মুমিনদের আচার-ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত তা উল্লেখ করা হয়েছে ‘আর তোমরা সবাই আল্লাহর বন্দনা কর। তার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। মাতা -পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। আত্মীয়, এতিম ও মিসকিনদের সঙ্গে সদাচরণ কর। আত্মীয়, প্রতিবেশী, নিকটবর্তীজন, পার্শ্ববর্তী লোকজন, সহচর, মুসাফির ও তোমার অধীন দাস-দাসীসহ সবার প্রতি ইহসান ও ভালো ব্যবহার কর। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না, যে অহংকারী ও গর্বকারী।’ সূরা আন নিসা, আয়াত ৩৬।
Total Reply(0)
সত্য বলবো ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১:৩৬ এএম says : 0
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় ও নম্রতার নীতি অবলম্বন করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ মুসলিম।
Total Reply(0)
মোহাম্মদ কাজী নুর আলম ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১:৩৬ এএম says : 0
আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরস্পরের সঙ্গে নম্র আচরণের তাওফিক দান করুন।
Total Reply(0)
তোফাজ্জল হোসেন ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১:৩৭ এএম says : 0
মানুষের একটি ভালো কথা যেমন একজনের মন জয় করে নিতে পারে, তেমনি একটু খারাপ বা অশোভন আচরণ মানুষের মনে কষ্ট আসে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে আমাদের উচিৎ সর্বদা মানুষের সঙ্গে ভালো ও সুন্দরভাবে কথা বলা।
Total Reply(0)
মশিউর ইসলাম ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১:৩৭ এএম says : 0
সুন্দর আচরণ আমরা সবাই প্রত্যাশা করি। কিন্তু আমরা প্রায়ই অন্যের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করতে ভুলে যাই। সামান্য একটু অসতর্কতার কারণে আমাদের আচরণে একজন মানুষ অনেক কষ্ট পেতে পারে। তাই আমাদের সবসময় সচেতন থাকা উচিত; যাতে আমাদের আচরণে কেউ বিন্দুমাত্র কষ্ট না পায়।
Total Reply(0)
Zakiul Islam ১৯ জানুয়ারি, ২০২০, ১০:০১ এএম says : 0
Islam is a religion that teaches love for each others. The hospitality of Nabi Karim sallallahoalihissallam was like a legend. Islam came to establish humanity in world. Islam is the religion of humanity.
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন