ঢাকা, সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ২২ জামাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি : ভারতের ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ২২ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

বিশ্বসম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে কোনো দেশের বিশেষ কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠির রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অধিকার হরণের বিষয়কে অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ খুবই কম। বাণিজ্য ও প্রযুক্তির বিশ্বায়ণ ছাড়াও ধর্ম-বর্ণ ও সাংস্কৃতিক বিভাজন-বৈষম্যকে দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা প্রায় অসম্ভব। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টানসহ মূল ধারার কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় কোনো দেশের একক ভূ-খন্ডে সীমাবদ্ধ নেই। অতএব, এসব ধর্ম ও জাতিগত সংকটের বিষয়গুলোকে কোনো দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মেনে নেয়া যায় না, নিয়ন্ত্রণও করা যায় না। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ায় যে ধরনের সরকার বা শাসকই থাক না কেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নিরীখে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার এসব দেশের জনগণের হলেও বিশ্ব ব্যবস্থা, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদীরা এসব দেশের উপর কি ধরণের হস্তক্ষেপ, আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে তা দৃশ্যমান। একইভাবে যুদ্ধের কারনে এসব দেশ থেকে উদ্বাস্তু লাখ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেয়ার নৈতিক-মানবিক দায়ও পশ্চিমা দেশগুলো এড়াতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে লাখ লাখ উদ্বাস্তুর চাপ চলতি শতকের সবচেয়ে বড় রিফিউজি ক্রাইসিস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি জমানো লাখ লাখ শরনার্থীকে মধ্যপ্রাচ্যের আভ্যন্তরীণ সংকট বলে আখ্যা দিয়ে নিজেদের সীমান্ত-দরজা বন্ধ করে রাখতে পারেনি ইউরোপ। একইভাবে অধিক জনসংখ্যার চাপ আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের প্রধান জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যা ও সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের মত কঠোর নীতি গ্রহণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। কৌশলগত কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে গণ্য হলেও লাখ লাখ রোহিঙ্গা রিফিউজি প্রতিবেশী বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে তা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণে গাম্বিয়ার মত অন্য মহাদেশের একটি দেশ রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হতে পেরেছে। ইতিপূর্বে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনাকে ‘ অ্যা টেক্স্টবুক এগজাম্পল অব এথনিক ক্লিনজিং’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। এখন হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে সে সবের তথ্যপ্রমাণাদি তুলে ধরে মিয়ানমার শাসকদের বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে যে সব দেশের শাসকদের এ ধরনের আন্তর্জাতিক বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের প্রায় সবই ছিল পশ্চিমা বিরাগভাজন ও কৌশলগত আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ। উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় নির্বিচার বোমা বর্ষণ ও সামরিক আগ্রাসনে লাখ লাখ মানুষ হতাহতের ঘটনায় সরাসরি পশ্চিমা নেতৃত্ব ও সামরিক কমান্ডাররা দায়ী হলেও তাদের বিরুদ্ধে বিচারের কোনো দৃষ্টান্ত এখনো তৈরি হয়নি। এখন রোহিঙ্গা গণহত্যা ও এথনিক ক্লিনজিংয়ের বিচার শুরু হলেও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও অন্যতম সামরিক পরাশক্তি চীনের পক্ষপাতিত্বের কারণে এই বিচারের রায়ের সুফল নিয়ে বড় ধরণের সংশয় দেখা দিয়েছে। চীন-মার্কিন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতা ও বৈরিতা ইতিমধ্যে একটি রাজনৈতিক- বাণিজ্যিক সমঝোতায় উপনীত হওয়ায় ছোট দেশগুলোর আঞ্চলিক সংকট বৃহৎ শক্তির স্বার্থের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

ভারতের বিজেপি সরকার যখন সংবিধান থেকে ৩৭০ ধারা রদ করে কাশ্মিরের স্বায়ত্ত¡শাসন ও জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের বিলোপ ঘটালো তখন পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশ থেকে মৃদু প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও ভারতের পক্ষ থেকে এটি তার আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করে আসছে। ভারতের স্বাধীনতার শুরু থেকেই কাশ্মির সমস্যার উদ্ভব। এ সমস্যাকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে এবং বেশ কয়েকবার দেশ দুটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই কাশ্মির সমস্যার সাথে জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ও রেজুলেশন যুক্ত হয়েছে। সেই সাথে পাকিস্তানের সাথে একাধিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিও রয়েছে। এরপরও কাশ্মির ইস্যুকে অনবরত নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবী করছে ভারত। পক্ষান্তরে পশ্চিমাবিশ্বসহ মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইন্টারনেটসহ সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও উষ্মা প্রকাশ করলেও বাংলাদেশ আগ বাড়িয়ে কাশ্মির ইস্যু ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখের পাশাপাশি কাশ্মির ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে থাকবে বলে আগাম জানিয়েছিল। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’, এমন প্রত্যয়কে আন্তর্জাতিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল বাংলাদেশ। সার্কের প্রস্তাবক ও প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান প্রত্যাশা করবে, এমনটাই স্বাভাবিক ছিল। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারত যে ভূমিকা রেখেছিল, ততোধিক নিপীড়িত নিস্পেষিত কাশ্মিরীদের মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ একই ভ’মিকা পালন করতে না পারলেও এ দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ কাশ্মিরিদের প্রতি সমর্থন করাকে তাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব বলে মনে করে। কাশ্মির, ফিলিস্তিনসহ নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভুলে যাওয়া সমীচিন নয়। আমরা যেভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছি একইভাবে কাশ্মিরীদের পাশে নৈতিক-মানবিক সমর্থন নিয়ে দাঁড়াবো এটাই এ দেশের মানুষের আন্তরিক প্রত্যাশা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর মিয়ানমারের গণহত্যা এবং বাংলাদেশের উপর লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা চেপে বসার পরও ভারত যদি মিয়ানমারের প্রতি সমর্থন জানায় এবং তাতে যদি বাংলাদেশের সাথে ভারতের বন্ধুত্বে কোনো প্রভাব না পড়ে, তার বিপরীতে বাংলাদেশ যদি কাশ্মির প্রশ্নে তার নিরপেক্ষতার নীতি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতি অনড় থাকে তাহলে ভারতের সাথে তথাকথিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে প্রভাব পড়ার কথা নয়। বন্ধুত্ব কোনো একপাক্ষিক বিষয় নয়। এটি পারস্পরিক সুসম্পর্ক, দায়বদ্ধতা ও লেনদেনের বিষয়। মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী হওয়ার পরও ভারতের সাথে একপাক্ষিক বন্ধুত্ব রক্ষায় কাশ্মির প্রশ্নে বাংলাদেশ তার সব ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভুলে যেতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ইসলামি সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ ও জোরদারের উপর তাগিদ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত মুসলিম দেশ সমুহের বিশেষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসলিম দেশসমূহের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরকালে গালফ নিউজের কাছে দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারটি গত সোমবার ইনকিলাবে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারে ভারতের সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট(সিএএ) সম্পর্কে শেখ হাসিনার দেয়ার বক্তব্যের একটি মন্তব্য শিরোনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সিএএ ভারতের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল না। সেই সাথে তিনি এও বলেছেন যে, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে ভারতের পার্লামেন্টে সিএএ প্রস্তাব ও আইনের খসড়া উপস্থাপন করতে গিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সরাসরি বাংলাদেশের উপর মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন করা হয়। ধর্মীয় সহিংসতার কারণে বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকেও হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান ও শিখরা নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। অতএব, এসব ধর্মাবলম্বী মানুষদের ভারতের নাগরিকত্ব দিতেই এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনা হয়েছে। সাতচল্লিশের দেশভাগের আগে কলিকাতা, বোম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রক্তাক্ত রাজনৈতিক সংঘাতে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর আগে এবং পরবর্তীতেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও অর্থনৈতিক কারণে এ উপমহাদেশের ডেমোগ্রাফিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ও একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র হলেও সংখ্যালঘু হিসেবে ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠির বসবাস। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বিজেপি শাসকরা সে বাস্তবতা ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র মুসলমানদের বাদ রেখে ভারতের নাগরিকত্ব আইনে একটি সাম্প্রদায়িক বৈষম্যনীতি আরোপের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন। ভারতের এই মুসলিম বিদ্বেষী আইনকে সেখানে একটি মুসলিম এথনিক ক্লিনজিংয়ের প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন কোনো কোনো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জামার্নীর নাজি পার্টি ইহুদিদের প্রশ্নে অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, অতঃপর তারা ইহুদি নিধনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। একইভাবে রাখাইনের মুসলমানদের মুসলমানদের সেখানকার রাজনৈতিক ও জাতিগত মূলধারা থেকে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্ন করতে কনসেনশাস ও আইনগত বøাকআউট সৃষ্টির তৎপরতা চালায় সেখানকার জান্তা সরকার। বৃটিশ আমল থেকেই রোহিঙ্গারা শাসক শ্রেণির দ্বারা নিপীড়নের শিকার হলেও ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাস হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন জাতিতে পরিনত হলেও তারা শত শত বছরের আবাসভ’মি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষায় সেখানকার মাটি আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বিভিন্ন সময়ে উগ্র সহিংস বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সেনা বাহিনীর জাতিগত নির্মূল অভিযান থেকে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বর্হিবিশ্বে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে জাতিগত নির্মূলের চুড়ান্ত অভিযানের সময় প্রাণ বাঁচাতে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নাফ নদী পেরিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও রামুতে আশ্রয় গ্রহণ করে। মিয়ানমার বাহিনীর এই অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায় ও বিশ্ববিবেক সোচ্চার হলেও শুধুমাত্র বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থে চীনের ভূমিকা স্পষ্টতই মিয়ানমারের পক্ষে। আঞ্চলিক আধিপত্য ও সীমান্ত বিরোধের প্রশ্নে চীনের সাথে ভারতের সাংঘর্ষিক অবস্থান, রোহিঙ্গা প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নীতি, মুসলিম দেশসমূহ এবং জাতিসংঘের অবস্থান জেনেও ভারত কেন মিয়ানমারের পক্ষ নিল তা এখন কিছুটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করে কাশ্মিরের স্বায়ত্ত¡শাসন হরণ, সেখানে অনির্দ্দিষ্টকালের কারফিউ, ইন্টারনেটসহ সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধের পাশাপাশি টার্গেট কিলিং, ফোর্স ডিজঅ্যাপিয়ারিংয়ের ঘটনা অব্যাহত রাখার মধ্যেই ভারতের নাগরিত্ব আইনে সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সারা ভারতে কোটি কোটি মুসলমান নাগরিককে রাষ্ট্রহীন নাগরিকে পরিনত করার কুবুদ্ধি তারা নাজি জার্মানী, জায়নবাদি ইসরাইল ও মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে। কাশ্মিরকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেখানে এখন এথনিক ক্লিনজিং চালানো হচ্ছে বলে যে সন্দেহ রয়েছে তা দূর করার দায়িত্ব ভারত সরকারের। এ বিষয়ে তাদের নিরবতা ও বø্যাকআউট অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়ে আশঙ্কা আরো দৃঢ় হচ্ছে।

ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থানের কথা ভুলে গিয়ে হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম বিদ্বেষী ভ’মিকা ভারতকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা ক্রমে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় মানুষের কর্মসংস্থান, বৈষম্যসহ সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা, অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা সব অর্জন ও অগ্রগতিকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়। শতকোটি মানুষের উন্নয়নশীল দেশ ভারত এখনো বিশ্বের বৃহত্তম দরিদ্র জনগোষ্ঠির দেশ। এখনো ভারতের প্রায় অর্ধেক মানুষ সৌচাগার ব্যবহার করতে শিখেনি। যে দেশ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি বলে দাবী করে, যে দেশ পারমানবিক বোমা নিয়ে গর্ব করে এবং মহাকাশে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে, সে দেশেরই অর্ধেক মানুষ মাঠে-ঘাটে উন্মুক্ত স্থানে পায়খানা করে, ফসলের মূল্য না পেয়ে প্রতি মাসে হাজার হাজার কৃষক আত্মহত্যা করে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সৌচাগার নির্মাণ ও ব্যবহারকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিনত করেছিল। এটি অবশ্যই প্রয়োজনীয় ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে বিজেপি অশিক্ষিত মানুষের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে উস্কে দিয়েছিল। সেই সাম্প্রদায়িকতার উন্মাদনায় বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বিজেপি শাসকরা তাল হারিয়ে ফেলেছেন। গত চার দশকের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি সবদিক থেকে খারাপ অবস্থায় পড়েছে। সেখানে দরিদ্র মানুষের সম্পদ গুটি কয়েক কর্পোরেট ধনকুবের ও তাদের পরিবারের মধ্যে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। তা ক্রমে আরো গন্ডিবদ্ধ হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের সর্বসাম্প্রতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভারতের ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ দেশের মোট জনগোষ্ঠির ৭০ শতাংশ মানুষের মোট সম্পদের চারগুণ। দেশের ৬৩জন ধনকুবেরের সম্পদের পরিমান ২০১৮-১৯ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেটের বরাদ্দ অর্থ ২৪,৪২,২০০ কোটির বেশি। এ এক ভয়াবহ বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। এহেন বাস্তবতায় সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জনগোষ্ঠি মুসলমানদের নানাভাবে কোনঠাসা করার যে রাজনৈতিক খেলা চলছে তার খেসারত ভারতকে দিতে হচ্ছে। অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ও অন্ধকার জিইয়ে রেখে কোনো সমাজকে উন্নয়ন অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। চারমাসের বেশি সময় ধরে ভূ-স্বর্গ কাশ্মিরকে কার্যত নরকের বন্দিশালায় পরিনত করে রাখা হয়েছে। এনআরসি, সিএএ নিয়ে সারা ভারতজুড়ে এখন এক বিস্ফোরন্মুখ অবস্থা দেখা দিয়েছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক গলাবাজি বা পুলিশি ব্যবস্থায় এ অবস্থার পরিবর্তন হয়তো সম্ভব হবে না। অন্যদিকে ভারতের প্রতিপক্ষ চীন তার অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা কাটিয়ে বিশ্বের অপ্রতিদ্ব›দ্বী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে। ভারতের নিকটতম প্রতিবেশীরা একে একে চীনের বিশাল কৌশলগত বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক ছত্রছায়া ও সামরিক সহযোগিতা নিয়ে চীনের প্রভাব বলয়ে ঢুকে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভ’টানের মত প্রতিবেশীরাও ইতিমধ্যে ভারতের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। ভারতের চরম দুর্দিনে শতকরা ৯০ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের সরকার ভারতের পাশে থাকার ঘোষণা থেকে এখনো সরে যায়নি। ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার বাংলাদেশের এ অবস্থানের মূল্যায়ণ করতে ব্যর্থ হলে এটা হবে তাদের জন্য বড় ধরনের দুর্ভাগ্য। ভারতের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের চরম মন্দার সময়ে ভারতীয় কর্মীরা বাংলাদেশ থেকে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। আর সিএএ’র প্রভাবে ভারত থেকে অনুপ্রবেশ বেড়েই চলেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দেশের সম্পদ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
bari_zamal@yahoo.com

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন