ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, ২০ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

কর্মসংস্থানের ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৪ জুলাই, ২০২০, ১২:০১ এএম

পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এদের মধ্যে যুগের পর যুগ বসবাস করা মানুষও রয়েছে। করোনা মহামারিতে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাকরিচ্যুত হওয়া, বেতন কমে যাওয়া এবং উপার্জিত আয় দিয়ে ঢাকায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ায় মানুষ গ্রামে চলে যাচ্ছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত অনেক মানুষের পক্ষে এখন রাজধানীতে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় মালসামান নিয়ে মানুষের ঢাকা ছাড়ার চিত্র প্রকাশিত হচ্ছে। কেউ কেউ দোকান ও ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করে ঢাকা ছাড়ছে। এসব চিত্রের মধ্য দিয়ে করোনার ভয়াল থাবা যে মানুষকে দরিদ্র ও বেকার করে দিচ্ছে, তার চিত্রই ফুটে উঠছে। বেকার হওয়া এবং মানুষের আয় কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর সম্প্রতি করা এক জরিপে। এতে দেখা যায়, ১৯.২৩ শতাংশ মানুষ আয়হীন, পাঁচ হাজার টাকার কম আয়কারীর ৭৫ শতাংশ এবং পাঁচ থেকে পনের হাজার আয়কারীর আয় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। তবে এর বাইরেও যে আরও অসংখ্য মানুষের বেকার হওয়া এবং উপার্জন কমে যাওয়ার মধ্যে রয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাধ্য হয়ে এসব মানুষকে পরিবার নিয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামমুখী হতে হচ্ছে। তবে গ্রামে গিয়েও যে তাদের কর্মসংস্থান হবে, এর নিশ্চয়তা নেই।

দেশে বেকারের হার বৃদ্ধি নতুন না হলেও করোনা এ হারকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। কর্মজীবীকে ক্রমাগত কর্মহীন করে দিচ্ছে। করোনাকালে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেড় কোটি মানুষ বেকার হয়েছে বলে বলা হয়েছে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তাদের হিসাবে স্বাভাবিক সময়ে বেকারের সংখ্যা ছিল চার-পাঁচ কোটির মতো। করোনায় এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থাৎ দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই বেকার হয়ে পড়েছে। করোনায় কত লোক বেকার হয়েছে, তা পরিসংখ্যান না করলেও বোঝা যায়। কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বৃহৎ খাত গার্মেন্টে মার্চ থেকে ছাঁটাই শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। এতে কয়েক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রয়াত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে ২৫ হাজার শ্রমিক বেকার হওয়ার পাশাপাশি এ খাত সংশ্লিষ্ট মৌসুমী অনেক শ্রমিক বেকার হবে। করোনার কারণে রপ্তানির দুই বড় খাত গার্মেন্ট ও প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গার্মেন্ট খাতে অর্ডার বন্ধ হওয় যাওয়ায় অনেক কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো টিকে আছে, খরচ কমাতে বাধ্য হয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে লাখ লাখ শ্রমিক দেশে ফিরছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ১০ লাখ শ্রমিক ফিরছে বলে ইতোমধ্যে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব দেশ নতুন শ্রমিক নেয়া বন্ধ বা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যান্য শিল্পখাতে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় জনবল কমাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লোকবল ছাঁটাই কিংবা বেতন কমিয়ে দেয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে সামগ্রিক কর্মসংস্থানের ওপর এক ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এর ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ায় দরিদ্র অতি দরিদ্র, নিম্নবিত্ত দরিদ্র, মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তে পরিণত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি কতদিন থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি আগামী দুই-তিন বছরও চলতে পারে। যদি তাই হয়, তবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য তা অশনি সংকেত। এতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নেতিবাচকের দিকে ধাবিত হবে। উন্নয়ন-অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। যে কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে আছে এবং বেকার হচ্ছে, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তা কমাতে না পারলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশে এই ভয়াবহ বেকারত্ব সৃষ্টির অন্যতম কারণ, কর্মসংস্থানের প্রায় সব খাতকে রাজধানী কেন্দ্রিক করা। ফলে দেশের সব এলাকার মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকামুখী হয়। এই এক কেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের কারণেই করোনার বিপর্যয়ের শিকার হয়ে অনেক মানুষ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। যদি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জেলা পার্যায়ে স্থানান্তর বা সেখানে গড়ে তোলা হতো, তবে বেকারত্বের হার অনেকাংশেই সামাল দেয়া যেত।

বেকারত্ব কমাতে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কর্মকান্ড দ্রুত শুরুর বিকল্প নেই। করোনাকালীন পরিস্থিতি সমাল দিতে সরকারের এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনামূলক প্যাকেজ প্রশংসনীয় হলেও, তা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়। আর্থিক সহায়তা ও ত্রাণের মাধ্যমে বেকার হয়ে পড়া মানুষকে সবসময় টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেই উন্নয়নমূলক মেগাপ্রকল্পের কাজ জোরেসোরে শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকল্পগুলো পুরোদমে চালু হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সড়ক-মহাসড়ক এবং নদ-নদী সংস্কারের কাজ দ্রুত শুরু করা হলে সেখানেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার বেশ কিছু সুবিধা ঘোষণা করেছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ নিজ দেশে সহজে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং সুবিধার কথা বলেছে। এটি একটি ভাল উদ্যোগ। বিনিয়োগের ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ দ্রুত শেষ করা অপরিহার্য। এ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। দেশে রিজার্ভের রেকর্ড অর্থ রয়েছে। দ্রুত এ অর্থের অংশবিশেষ যথাযথভাবে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে বিনিয়োগের ক্ষেত্র যেমন প্রশস্ত হবে, তেমনি কর্মসংস্থানের সুযোগও হবে। করোনার কারণে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী দেশের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে দেশে নিয়ে আসার জন্য জোর তৎপরতা চালাতে হবে। ইতোমধ্যে ভারত ও ভিয়েতনাম কোম্পানিগুলোর সাথে যোগাযোগ করে এ চেষ্টা শুরু করেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য বিকল্প বাজারের সন্ধান করতে হবে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে শ্রমিকের ব্যপক চাহিদা রয়েছে। সেসব দেশে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যত ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যায়, এখন তাই নিতে হবে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন