ঢাকা বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, ১৮ রজব ১৪৪২ হিজরী

শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম

কত সুধা আছে সেই মধুর আজানে-২

মুনশী আবদুল মাননান | প্রকাশের সময় : ১৯ জানুয়ারি, ২০২১, ১২:০০ এএম

হজরত বেলাল (রা.)-এর প্রথম আজান দেয়া থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আজান চলছে। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত আল্লাহপাক ও রাসূল (সা.)-এর মাহাত্ম্য ও প্রশংসাব্যঞ্জক ঘোষণা এবং নামাজের জন্য আহ্বান ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আজানের প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব ও মহিমা এবং এর জাগতিকতা ও আধ্যাতিকতা বলে শেষ করা যায় না। আজানকে শয়তান অত্যন্ত ভয় পায়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন: যখন নামাজের জন্য আজান হয়, তখন শয়তান পালিয়ে যেতে থাকে। তখন সে এমন জোরে কাজ-কর্ম করতে থাকে, যাতে আজানের ধ্বনি শোনা না যায়। তারপর আজান হয়ে গেলে ফিরে আসে...।

আমাদের দেশে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাতের আলোকেই মুসলিম পরিবারে কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করলে আজান দেয়ার প্রথা প্রচলিত আছে। ভয়ভীতি ও বিপদাপদ থেকে রক্ষার জন্যও আজান দেয়া হয়ে থাকে। বিশেষ করে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় আজান দিতে দেখা যায়। কোনো মারি-মহামারির সময়ও গ্রাম-জনপদে আজান দেয়া হয়। নামাজের জন্য দেয়া আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না।

আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রেরিত রাসূল। নামাজের জন্য এসো, কল্যাণকর্মে এসো। এই হলো আজানের মূলকথা। আজানের বাণীমালা উচ্চস্বরে জানান দেয় মুয়াজ্জিন। উচ্চস্বরে জানান দেয়ার উদ্দেশ্য, যাতে কাছের ও দূরের মানুষ তা শুনতে পায়। এ ক্ষেত্রে স্বর উচ্চ হওয়াই যথেষ্ট নয়, শ্রুতিমধুর, সুরেলা ও হৃদয়গ্রাহী হওয়াও প্রয়োজন। কর্কশ, শ্রুতিকট‚ আজান বাঞ্ছনীয় নয়। আজান ধ্বনিতে এমন প্রভাবক ক্ষমতা থাকা উচিত, যাতে দুনিয়াদারীর খেয়ালে মশগুল মানুষ সব কিছু ফেলে নামাজের জন্য ছুটে আসে। আজান দেয়ার সময় লক্ষ রাখতে হবে, তা যেন কোনোভাবেই মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না ফেলে। শব্দদূষণের কারণ না হয়, যা শ্রুতিহানিসহ শারীরিক বিপর্যয়ের উপলক্ষ হিসেবে গণ্য। একদা, গলার স্বর উচ্চগ্রামে-উন্নীত করে আজান দেয়া হতো। এখন বিশ্বের প্রায় সর্বত্র মাইক ব্যবহার করা হয়। একই এলাকায় দুই বা ততোধিক মসজিদে যখন একই সময় আজান দেয়া হয়, তখন শব্দের একটা উচ্চতরঙ্গ তৈরি হয় এবং অনেক সময় তা শব্দদূষণের পর্যায়ে চলে যায়। যাদের উদ্দেশ্য আজান দেয়া, তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছানোই যথেষ্ট। মাইকে আজান দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। প্রথমত, তা যেন শব্দদূষণ না ঘটায়। মনে রাখতে হবে, মানুষের শব্দসহন ক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবেল। এর বেশি মাত্রায় শব্দ হলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায় এবং এক সময় তা পুরোপুরি লোপ পেতে পারে।

আমাদের রাজধানী ঢাকা মসজিদের শহর হিসেবে খ্যাত। অসংখ্য যানবাহনের শব্দ, যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ, কল-কারখাখার শব্দ, মাইকসহ বিভিন্ন শব্দ যন্ত্রের শব্দ ইত্যাদি এই শহরকে শব্দদূষণের দিক দিয়ে চরম অবস্থায় নিয়ে গেছে। এখানে শব্দ মাত্রা ১২৯ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে দেখা যায়। উপযুক্ত সতর্কতার অভাবে আজান যেন মানুষের অহিতের কারণ না হয়, সেটা অবশ্যই দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, শহরাঞ্চলে যখন একসঙ্গে বহু মসজিদে মাইকে আজান হয়, তখন একটা শব্দঝড় তৈরি হয়, এতে শিশু, বৃদ্ধ, রোগক্রান্ত মানুষের অসুবিধা হতে পারে। সেবাশ্রম ও হাসপাতালে অবস্থানরত রোগীদের ক্ষতি হতে পারে। তৃতীয়ত, অমুসলিমদের কাছে আজানের উচ্চধ্বনি ভালো নাও লাগতে পারে।

মোটকথা উচ্চ নিনাদে আজান দেয়ার কারণে কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, অসুবিধা বা অস্বস্তির সম্মুখীন না হয় কিংবা এ নিয়ে কোনো কথা বলার সুযোগ না পায়, সেটা গুরুত্বসহকারে আমলে নিতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অমুসলিম দেশে মাইকে আজান দেয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের অনেক সময় বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাধা প্রদানও করা হয়, অনুমতি দেয়া হয় না। যে সব দেশে মাইকে আজান প্রচারের অনুমতি আছে, সে সব দেশে শব্দের একটা মাত্রা বেঁধে দেয়া আছে। এ প্রসঙ্গে সুইডেনের কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটিতে ২০১৩ সালে একটি নির্দিষ্ট মসজিদে জুমার নামাজের আজান দেয়ার অনুমতি দেয়া হয় সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রার মধ্যে।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এ যুগে অনেক কিছুই সহজ হয়ে গেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার পরিমিত এবং যথাযথ হলেই কাক্সিক্ষত সুবিধা ও কল্যাণ পাওয়া সম্ভব হয়। প্রযুক্তির অপরিমিত ও যথেচ্ছ ব্যবহার নানামুখী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজানের ক্ষেত্রে শর্ত হলো, তা মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। অতঃপর আজান হতে হবে, কোমল, সুমধুর ও হৃদ্য।

ইসলাম মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণ ও সাফল্য নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দেয়। তার কোনো বিধান ও নির্দেশে মানুষের একটুকু অকল্যাণ, অমঙ্গল ও অহিতের সুযোগ নেই। আজানের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। মাইকে উচ্চস্বরে আজান দেয়া নিয়ে এই আলোচনায় যে অসুবিধা, অস্বস্তি ও ক্ষতির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, তার প্রতিধানে আলেম সমাজ, মসজিদ কমিটি এবং সরকারকে ভাবতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (2)
জাফর ১৯ জানুয়ারি, ২০২১, ৩:৩৮ এএম says : 0
আজান প্রতিনিয়ত শোনা প্রিয় ও মধুর ধ্বনি
Total Reply(0)
Fahim ২৩ জানুয়ারি, ২০২১, ১১:১২ পিএম says : 0
Mone hoi ek Bela na kheye thakte parbo kinto azaan Na shone takte parbo Na.
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন