ঢাকা রোববার, ০৭ মার্চ ২০২১, ২২ ফাল্গুন ১৪২৭, ২২ রজব ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

দেশকে পর্যটনের নিরাপদ ক্ষেত্রে পরিণত করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১২:০১ এএম

চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোসহ সুন্দরবন, কুয়াকাটা প্রভৃতি স্থানে এখন পর্যটকের ঢল নেমেছে। আবহাওয়া অনুকূল, করোনার সংক্রমণ ও ভীতি অপসৃয়মান এবং তিনদিনের টানা অবকাশ মানুষজনকে ঘরের বাইরে ঠেলে দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই মেতেছে ভ্রমণে। পতেঙ্গা সৈকতসহ চট্টগ্রামের পর্যটন স্পটগুলোতে মানুষের অস্বাভাবিক ভীড়। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতেও তাই। কক্সবাজারের দীর্ঘ সৈকতজুড়ে পা ফেলানোর জায়গা নেই। লাবণী পয়েন্ট, ডলফিন পয়েন্টসহ, ইনানী, হিমছড়ি ও টেকনাফে মানুষের অস্বাভাবিক সমাবেশ। সেন্টমার্টিন ও মহেশখালীও পর্যটকের পদচারণায় মুখর। কুয়াকাটা সৈকতের অবস্থা ও ভিন্ন নয়। এখানে সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। সিলেটে এখন হাজার হাজার পর্যটক। ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিময় স্থানসমূহসহ জাফলং, বিছনাকান্দি, লালখান, ভোলাগঞ্জ, রাতারকুল প্রভৃতি দর্শনীয় স্থানে পর্যটকের মিছিল চলছে। সুন্দরবনেও এবার পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি। দৈনিক ইনকিলাবে গত কয়েকদিনে প্রকাশিত খবরাখবর থেকে জানা গেছে, পর্যটনস্থানগুলোকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাগম এত বেশি যে, কোথাও হোটেল-মোটেল খালি নেই। আগেই এগুলো বুক করে রাখা হয়। তবে পর্যটকদের মধ্যে বিদেশির সংখ্যা নিতান্তই কম। করোনাকারণে বিদেশি পর্যটকের আগমন নেই বললেই চলে। তবে দেশি পর্যটকের সংখ্যা অতীতের চেয়ে এবার অনেক বেশি। এর একটা কারণ এই যে, দেশের মানুষের মধ্যে পর্যটনস্পৃহা ক্রমাগত বাড়ছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, করোনাকারণে বিদেশে পর্যটনের সুযোগ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। বাংলাদেশিরা প্রধানত ভারত, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশ পর্যটনে অধিক আগ্রহী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ যায় ভারতে। সেদেশে ভিসা বন্ধ থাকায় তারা যেতে পারছে না। করোনাকারণে পর্যটকরা অধিক সংখ্যায় দেশমুখী হয়েছে। এটা একটা ইতিবাচক লক্ষণ।

দেশে পর্যটনের ভবিষ্যত বরাবরই উজ্জ্বল। এখানে হাজার হাজার বছরের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন রয়েছে, যা সহজেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ও সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। এইসঙ্গে রয়েছে পাহাড়, জঙ্গল ও ঝর্ণাশোভিত দর্শনীয় বহু স্থান। অতীতে শত শত বছর আগেও এ ভূখন্ড পর্যটকদের কাছে ছিল আকর্ষণীয়। এখনো তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু যেভাবে অন্যান্য দেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটেছে আমাদের দেশে সেভাবে ঘটেনি। যাতায়াতের সহজ ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, পর্যটনস্থলগুলোতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, পথঘাট ও পর্যটনস্থানে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যটনশিল্প বিকাশের অপরিহার্য শর্ত। পর্যটকদের সুবিধায় দক্ষ-অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান বা ট্যুর অপারেটর এবং আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল ব্যবস্থাপনা থাকাও অত্যাবশ্যক। এসব ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। ভারত, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশ পর্যটন খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে। সেই তুলনায় আমাদের আয় যৎসামান্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার পর্যটনখাতের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়েছে। রাস্তাঘাট ও হোটেল-মোটেল নির্মাণের কথা এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। পর্যটনশিল্পের বিকাশে নানা ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল খুবই প্রয়োজন। ভ্রমণ-ব্যবস্থাপনা যারা করে সেই ট্যুর অপারেটরদের উপযুক্ত উপকরণ ও দক্ষতা থাকার বিকল্প নেই। তাদের অভিজ্ঞ জনবলও থাকতে হবে। আমাদের দেশে পর্যটকদের সহায়তা দেয়া বা গাইড করার জন্য শিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এদিকেও যথাযথ নজর দিতে হবে।

পর্যটনস্থলগুলোতে পর্যটকদের ভীড় নিসন্দেহে উৎসাহজনক। পর্যটকদের দেশমুখী হওয়ার প্রবণতা যেমন ধরে রাখতে হবে, তেমনি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। পর্যটনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ দ্রুত সুফল এনে দিতে পারে। এ ব্যাপারে বেসরকারি খাতকে উৎসাহদানসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া উচিৎ। রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে শুরু করে হোটেল-মোটেল স্থাপন ইত্যাদি পর্যটনের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য। ভ্রমণ ব্যবস্থাপনাও এর মধ্যে পড়ে। ফলে পর্যটকদের কাছে রাস্তা যেমন নিরাপদ ও সহজ হতে হবে, তেমনি হোটেল-মোটেলের সেবাও হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। ট্যুর অপারেটরদের পুরো কাজটিই অনেকটা সেবামূলক। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সেবাটিই তাদের দিতে হবে। রাস্তাঘাটের ব্যয়, হোটেল-মোটেলের খরচ, ট্যুর অপারেটরদের চাহিদার অর্থ অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তবসম্মত হতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলকে মনে রাখতে হবে, এটা একদিনের কিংবা এক সিজনের ব্যবসা নয়। এটা বছরের পর বছরের ব্যাপার। কাজেই পর্যটকদের কোনো খরচই যাতে বাড়তি বা অতিরিক্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব কিছুই আছে; নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই- এমতাবস্থায় পর্যটক আসবে না, পর্যটন টিকবে না, বিকাশ তো দূরের কথা। তাই প্রশাসন ও পুলিশকে পর্যটকদের জন্য সকল ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এবারের পর্যটন মওসুম প্রায় শেষ। আগামীতে বিশ্বজুড়ে পর্যটনের বন্ধ দুয়ার খুলে যাবে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে, এইসঙ্গে দেশি পর্যটক তো আছেই। সেদিনের কথা মনে রেখেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই পর্যটন শিল্পের বিকাশ দ্রুতায়িত করতে হবে। দেশকে পর্যটনের অভয় ক্ষেত্রে পরিণত করতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন