ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮, ১২ যিলক্বদ ১৪৪২ হিজরী

শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম

রমজানের দান সদকায় এতিমদের স্মরণ রাখুন

উবায়দুর রহমান খান নদভী | প্রকাশের সময় : ৮ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম

পিতৃহীন নাবালেগ শিশু-কিশোরদের বলা হয় ইয়াতিম। প্রচলিত বাংলায় এতিম। পিতা থেকেও নেই এমন শিশুকেও ব্যবহারিক অর্থে এতিম বলা হয়। জন্ম দেয়ার পর মাসহ শিশু সন্তানকে ফেলে চলে যায়, অসুস্থ বেকার ও অসহায় অনেক পিতা এমনিতেও শিশুকে এতিম বলে ছেড়ে দেয়। প্রকৃত এতিম বা ব্যবহারিক অর্থে এতিম অসহায় শিশু সমাজে কম নয়। দরিদ্র অসহায় দুঃস্থ ও এতিমদের জন্য ইসলাম সমাজের ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, যাকাত সদকা এতিম মিসকিন গরিবদের অধিকার। যাকাতের আটটি খাতের মধ্যেও অসহায় দরিদ্র এতিম শামিল রয়েছে।

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আনা ওয়াকাফিলুল ইয়াতিমি ফিল জান্নাতি হা কাযা’। নবী (সা.) হাতের শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল দেখিয়ে বলেছেন, আমি এবং এতিমের লালনকারী জান্নাতে এ দু’টি আঙ্গুলের মতোই পাশাপাশি থাকব। (বুখারী : ৫৩০৪)। এ রহমত ও বরকত লাভের জন্য মুসলিম সমাজ দেড় হাজার বছর যাবত এতিমের লালন, তার প্রতি আদর স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন করে এসেছে। মানুষ নিজের আত্মীয় এতিমকে বরকত, সওয়াব ও পরকালে নাজাতের আশায় নিজ পরিবারের সদস্যরূপে লালন করে। পবিত্র রমজানে এতিমদের সাহায্য সহযোগিতা করার সওয়াব শত শত গুণ বৃদ্ধি পায়।

এতিমদের মধ্যে যারা দীনি ইলম শিখে তাদের সহায়তা দেয়ার মধ্যে দু’টি প্রতিদান পাওয়া যায়। এক. এতিমের খেদমত। দুই. দীনি ইলমের প্রসার। এতিমের দায়িত্ব গ্রহণের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘তারা তোমাকে ইয়াতীমদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; বল, ‘তাদের উপকার করা উত্তম’ এবং যদি তাদের সঙ্গে তোমরা একত্রে থাক, তবে তারা তো তোমাদেরই ভাই’। (সুরা : বাকারা : ২২০)।
এতিমের মর্যাদা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেন, বিধবা, এতিম ও গরিবের সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে মুজাহিদের সমতুল্য। অথবা তার মর্যাদা সেই (নামাজের জন্য) রাত জাগরণকারীর মতো, যে কখনো ক্লান্ত হয় না। অথবা তার মর্যাদা সেই রোজাদারের মতো, যে কখনো ইফতার (রোজা ভঙ্গ) করে না। (মুসলিম : ৫২৯৫)।
ইসলামের দৃষ্টিতে এতিমের প্রতিপালন জান্নাতে যাওয়ার পথ। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো এতিমকে আপন মাতা-পিতার সঙ্গে নিজেদের (পারিবারিক) খাবারের আয়োজনে বসায় এবং (তাকে এই পরিমাণ আহার্য দান করে যে) সে পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৮২৫২)।

দেশে দেশে হাজার হাজার এতিম আশ্রয় পেয়ে থাকে মকতব, মাদরাসা ও হিফজখানায়। কওমী মাদরাসার প্রায় সবগুলোতেই এতিমখানা থাকে। হিফজখানার ছাত্ররা ২৪ ঘণ্টাই একটি বিশেষ রুটিন মাফিক চলে। তারা শেষ রাতে কোরআন শরীফ মুখস্থ করে। চলতি রমজানে লকডাউনের জন্য দেশের হিফজখানাগুলো বাধার সম্মুখীন হয়েছে। ছাত্রদের পড়ার ব্যাঘাত ঘটছে। লকডাউনে থেকেও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের শর্তে হিফজখানাগুলো চালু করা বিশেষ জরুরি। এতে ২৪ ঘণ্টা কোরআন তেলাওয়াতের ফলে দেশ ও জাতির জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত পাওয়া যাবে।

অধিকাংশ হিফজখানা ও এতিমখানা রমজানে অধিক দান সাহায্য পেয়ে থাকে। এসব আয় দিয়েই মূলত হিফজখানা ও এতিমখানা চলে। চলতি বছর রমজানে এতিমদের এসব আশ্রয় চালু নেই বললেই চলে। মানুষের যাকাত সদকা ও দানের প্রবাহও বন্ধ প্রায়। এমন সময়ে দান সদকা ও যাকাত প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি।

রমজান দানের শ্রেষ্ঠ মওসুম। সওয়াবের পরিমাণ এসময় আল্লাহ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। বহু মাদরাসা লকডাউনে বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের কর্মচারীরা এতে এতিমদের থাকতে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ বহু মাদরাসায় এমন এতিম ছাত্রও পাওয়া যায়, যাদের যাওয়ার জায়গা নেই। ঈদেও তারা বাড়ি না গিয়ে মাদরাসায় ঈদ করে। তাদের মা বাবা কেউ বেঁচে নেই। যাওয়ার মতো কোনো আশ্রয়ও নেই। এমন হাজার হাজার এতিম দেশের এতিমখানা, মাদরাসা ও হিফজখানায় রয়েছে। লকডাউনকরোনা সঙ্কটে তাদের ব্যয় নির্বাহ করতে কষ্ট হচ্ছে। ধার কর্জ করে মাদরাসাগুলো চলছে। এমতাবস্থায় কোরআন-সুন্নাহর আহ্বান মনে রেখে ধর্মপ্রাণ প্রতিটি মানুষের কর্তব্য এতিমদের মুক্তহস্তে সাহায্য করা।

সমাজের বিত্তবান, ধনী ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও শিল্পপতিদের উচিত আল্লাহর রহমত ও নাজাত লাভের উদ্দেশ্যে এতিমদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। অশান্তি, দুর্ঘটনা, মহামারি, রোগব্যাধি থেকে নিরাপদ থাকার জন্য দান সদকার বিকল্প নেই। ঈমানের সাথে মৃত্যু এবং দোজখ থেকে মুক্তির জন্যও দান সদাকার পথ অবলম্বন অবশ্য কর্তব্য।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (11)
Abdullah Abu Noman ৮ মে, ২০২১, ১:৪৬ এএম says : 0
ইসলামে দান-সদকা ও অন্যকে সহযোগিতার গুরুত্ব অনেক বেশি।
Total Reply(0)
তোফাজ্জল হোসেন ৮ মে, ২০২১, ১:৪৭ এএম says : 0
রমজানে দানের গুরুত্ব আরও বেশি। এ মাসকে দানের মাস বলা হয়, কেননা এ মাসে একটি নফল ইবাদত করলে একটি ফরজের সমান সওয়াব। আর একটি ফরজ ইবাদত করলে ৭০টি ফরজের সওয়াব দেওয়া হয়।
Total Reply(0)
সাইফ আহমেদ ৮ মে, ২০২১, ১:৪৭ এএম says : 0
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে পানাহার করিয়ে ইফতার করাবে, সে তার অনুরূপ সওয়াব লাভ করবে।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৯০৬)
Total Reply(0)
নুর নাহার আক্তার নিহার ৮ মে, ২০২১, ১:৪৮ এএম says : 0
সাহায্য-সহযোগিতা ও দান-সদকা ইত্যাদি বলতে সাধারণত দীন-দরিদ্র, ফকির-মিসকিন, এতিম, অন্ধ ও অসহায় শ্রেণীর লোকদের দান করা বোঝায়।
Total Reply(0)
ক্ষণিকের মুসাফির ৮ মে, ২০২১, ১:৪৮ এএম says : 0
হাদিস শরীফে দেখা যায়, রমজান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মাসসমূহের তুলনায় অত্যধিক পরিমাণে দান-সদকা করতেন। আর এই দান-সদকার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, বাতাসের গতিবেগের চেয়েও তা দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হতো!
Total Reply(0)
হাজী গহর আলী শিকদার ৮ মে, ২০২১, ১:৪৯ এএম says : 0
সমাজে সকল শ্রেণী সমভাবে রমজান কাটাতে পারবে আমাদের মুক্তহস্তে দানের মাধ্যমে। চলুন, দান-সদকায় অগ্রগামী হই। হই একজন অসহায় মানুষের চলন্ত সহযোগী।
Total Reply(0)
সৈকত ফকির ৮ মে, ২০২১, ১:৪৯ এএম says : 0
সামর্থ্য থাকলে, কোনো এক হতদরিদ্র পরিবারের এক মাসের সাহরি ও ইফতারের দায়িত্ব নেই। এতে অঢেল সাওয়াব অর্জনের পাশাপাশি রমজান মাসের পবিত্র ভাব-গাম্ভীর্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে
Total Reply(0)
রুহুল আমীন যাক্কার ৮ মে, ২০২১, ২:১২ এএম says : 0
দিকনির্দেশনামূলক এবং সময় উপযোগী লেখা। আল্লাহ পাক আমাদের সামর্থ অনুযায়ী এতিম, গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন। আমীন
Total Reply(0)
Mahbubul Alam ৮ মে, ২০২১, ৯:৫৭ এএম says : 0
রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেন, ‘বিধবা, এতিম ও গরিবের সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীর সমতুল্য বা তার মর্যাদা রাতভর জাগ্রত থেকে নামাজ আদায়কারীর মতো, যে কখনো ক্লান্ত হয় না। অথবা তার মর্যাদা সেই রোজাদারের মতো, যে কখনো ইফতার (রোজা ভঙ্গ) করে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫২৯৫)
Total Reply(0)
Nadia Zahan ৮ মে, ২০২১, ৯:৫৮ এএম says : 0
এতিমদের ভালোবাসা, আহার দান করা নেককারদের গুণ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আল্লাহর ভালোবাসায় আহার দান করে।’ (সুরা ইনসান, হাদিস : ০৮)
Total Reply(0)
Ibrahim ৮ মে, ২০২১, ৯:৫৯ এএম says : 0
এতিমদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে অন্তর কোমল হয়, আত্মার প্রশান্তি লাভ হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে তার কঠিন হৃদয়ের ব্যাপারে অভিযোগ করলে রাসুল (সা.) বলেন, ‘এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও (ভালোবাসা ও সহমর্মিতায় কাছে টেনে নাও) এবং অভাবীকে আহার দাও।’ (মুসনাদ আহমদ)
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন